জানার আছে অনেক কিছু লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
জানার আছে অনেক কিছু লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
১৬ মে, ২০১৩
২৬ মে, ২০১২
যে ১১টি পাখির নামের সাথে বাংলাদেশ জড়িত
•
বহু গুণে গুণান্বিত বিশ্বখ্যাত সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়ের (Carl Linnaeus) আবিস্কার করলেন সমস্ত প্রাণীর নামকরণের এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যাতে প্রাণীটির পরিবার, প্রজাতি, গণ সম্পর্কে নামের মাধ্যমেই প্রাণীজগতে এর অবস্থান বোঝা যায়। ১৭০৭ সালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি জীবনের একটি বড় সময় ব্যয় করেছিলেন সারা বিশ্ব থেকে তার কাছে পাঠানো জীবজগতের নমুনার নামকরণে, যাকে আমরা বৈজ্ঞানিক নামে বলে থাকি, যা হয়েছিল মূলত ল্যাটিন ভাষায়। সে গল্পের ব্যপ্তি এবং গুরুত্ব এতই বিশাল যে অন্যদিনের জন্য তোলা থাকল ।
সুইডিশ বিজ্ঞানীটি সারা বিশ্বে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের জানালেন নমুনা পাঠাবার সময় সাথে স্থানীয় নামটিও পাঠাবার জন্য। যখন বাংলা থেকে তার কাছে সাদা- কালোয় মেশানো অপূর্ব সুন্দর একটি পাখি পৌঁছাল ( যার ভোরের সূর্য উঠানো জাদুময় সুর মূর্ছনা শোনার সৌভাগ্য হল না তার) যার স্থানীয় নাম দোয়েল, তার উচ্চারণে হল ডয়েল, আনমনে ভাবছিলেন ডয়েল, ডায়াল, সান-ডায়াল, হ্যাঁ, পাওয়া গেছে নাম! সূর্যের নামে পাখিটির নাম হল Copsychus saularis । এমন সব চমৎকার ইতিহাস আছে প্রতিটি নামের সাথেই।
সারা বিশ্বের প্রায় ৯০০০ প্রজাতির পাখির মধ্যে ১১টির বৈজ্ঞানিক নামের সাথে bengalensis বা বাংলার — পাখি শব্দটি জড়িত আছে। জড়িয়ে আছে বাংলার নাম, চলুন আর শুনি তাদের গল্প, দেখি তাদের মন ভরানো সৌন্দর্য, পরবর্তীতে তাদের দেখবেন বুনো মুক্ত পরিবেশে-
১) বাংলা শকুন, White-rumped Vulture, Gyps bengalensis

বর্ণনা- বাংলা শকুন বিশাল, প্রশস্ত ডানা এবং কালচে দেহের অধিকারী পাখি (দৈর্ঘ্য ৯০ সেমি, ওজন ৪.৩ কেজি, ডানা ৫৫ সেমি, ঠোঁট ৭.৬ সেমি, পা ১১.৬ সেমি, লেজ ২২.৫ সেমি)। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মলিন গলাবন্ধ সাদা এবং দেহ কালচে-বাদামী, কোমর স্পষ্ট সাদা, পালকহীন মাথা ও ঘাড় কালচে ধূসর।
মাথার ওপর দিয়ে ওড়ার সময় সাদা গলাবন্ধ, কালচে দেহ এবং ডানার নিচের দিকের সাদা পালক- ঢাকনি ও ওড়ার-পালকের কালচে পাড়ের পার্থক্য দেখে চেনা যেতে পারে। চোখ হলদে-বাদামী কিংবা ফিকে বাদামী, কালচে হালকা খয়েরি অথবা সবুজ-হালকা খয়েরি, ঠোঁটের ঝিল্লি কালো, মাথা ও ঘাড়ের পালকহীন চামড়া কালচে হালকা খয়েরি, এবং পা ও পায়ের পাতা কালো। ছেলে ও মেয়ের চেহারা অভিন্ন। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির কালচে বাদামি দেহ ও ডানার উপরে সূক্ষ সাদা ডোরা রয়েছে। কোমর কালচে ও ডানার পালকের নিচের ঢাকনিতে সরু সাদা টান রয়েছে।
স্বভাব- বাংলা শকুন বনের ধার, গ্রাম, ভাগাড় ও কসাইখানায় বিচরণ করে এবং এরা সবসময় দলবদ্ধ ভাবে থাকে। আহারের খোঁজে এরা আকাশে টহল দেয় অথবা উঁচু গাছ বা দালানে বসে থাকে। খাদ্যতালিকায় রয়েছে মৃত প্রাণী এবং পচা মাংস। খাবার দেখতে পেলে শো শো শব্দে দ্রুত নিচে নেমে আসে, এবং খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করে ও কর্কশ গলার ঘড়ঘড়, হিসহিস কিংবা একটানা চিঁচিঁ চিৎকার করে।
সেপ্টেম্বর-মার্চ মাসে প্রজননকালে উঁচু গাছ বা দালানের ভগ্নাবশেষে ডালপালা দিয়ে মাচার মত বাসা বানায় এবং বছরের পর বছর একই বাসা ব্যবহার করে। এ বাসায় মেয়েপাখি একটি সাদা ডিম পাড়ে, ডিমের মাপ ৮.৬ x ৬.৪, ডিম ফুটতে ৪৫ দিন লাগে।
বিস্তৃতি- বাংলা শকুন বাংলাদেশের বিরল আবাসিক পাখি, সব বিভাগেই দেখা যায়। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চীন, ইরান, আফগানিস্তান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসহ এশিয়ায় এদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা- বাংলা শকুন বিশ্বের মহাবিপন্ন বলে পরিচিত। গবাদিপশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনিক ব্যবহারের ফলে বিগত শতকের সুলভ এই পাখির সংখ্যা ৯৮ % হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশে এ প্রজাতিটি এখনও বিপদগ্রস্ত পাখির তালিকাভুক্ত করা হয় নি। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা শকুনের বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার শকুন! ( Gyps = শকুন, bengalensis= বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্রটি ইনাম আল হকের তোলা।
২) বাংলা নীলকান্ত, Indian Roller , Coracias bengalensis

বর্ণনা- বাংলা নীলকান্ত বাদামি বুক ও নীল ডানার পাখি ( দৈর্ঘ্য ৩১ সেমি, ওজন ১৬৫ গ্রাম, ডানা ১৯ সেমি, ঠোঁট ৩.৫ সেমি, পা ২.৭ সেমি, লেজ ১৩ সেমি)। বসে থাকা অবস্থায় এর পিঠ লালচে বাদামি, উড়ে গেলে ডানার নীল রঙ দেখা যায়, ডানায় পর্যায়ক্রমে ফিকে নীল ও কালচে নীল পালক রয়েছে। গলাবন্ধ, ঘাড়ের পিছনের ভাগ, গলা ও বুক লালচে-বাদামি। কাঁধ-ঢাকনি ও ডানার গোঁড়ার পালক বাদামি জলপাই-সবুজ, তলপেট ও অবসারণী ফিকে নীল এবং লেজ গাঢ় নীল। এর চোখ বাদামি, ঠোঁট বাদামি-কালো, পা এবং পায়ের সঙ্গে সংযুক্ত অঙ্গ হলদে-বাদামি। ছেলে ও মেয়েপাখির চেহারা অভিন্ন। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি অনুজ্জ্বল, কাঁধ-ঢাকনি মেটে বাদামি এবং গলা ও বুকে ডোরা রয়েছে। ৩টি উপপ্রজাতির মধ্যে C.b.bengalensis এবং সম্ভবত C.b.affinis বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
স্বভাব- বাংলা নীলকান্ত পাতাঝরা বন, বনের প্রান্তদেশ, তৃণভূমি, ক্ষুদ্র ঝোপ, খামার ও গ্রামাঞ্চলে বিচরণ করে। পাতাহীন ডাল, বেড়ার বাঁশ অথবা বৈদ্যুতিক তারে একাকী বসে থাকে। নীরবে বসে এরা ধীরে লেজ ওপর-নিচে দোলায় ও নিচের ভূমিতে শিকার খোঁজে।
আহার্যতালিকায় রয়েছে পোকামাকড়, টিকটিকি, ব্যাঙ ও সাপ। ঘাসে বা ঝোপে আগুন দেওয়া হলে পোকা ধরার জন্য এরা পাশে বসে অপেক্ষা করে।
এপ্রিল-মে মাসের প্রজনন ঋতুতে এরা উঁচু গলায় ও তীক্ষ সুরে ডাকে- ক্রাক, ক্রাক, ছেলে ও মেয়ে সমবেত ওড়ার মহড়া দেয় এবং গাছের কোটরে অথবা দালানকোঠার ফাঁকফোঁকরে ঘাস এবং খড়কুটো দিয়ে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে। ডিমের সংখ্যা ৩-৫টি, মাপ ৩.৮ x ২.৮ সেমি। ১৭-১৯ দিনে ডিম ফোটে, ২০-২৫ দিনে ছানার শরীরে ওড়ার পালক গজায়,
বিস্তৃতি- বাংলা নীলকান্ত বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি, সকল বিভাগের গ্রামাঞ্চলে বিচরণ করে। পারস্য উপসাগর থেকে পুরো ভারত উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে সুদুর চীন ও মালয়েশিয়া পর্যন্ত এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা- বাংলা নীলকান্ত বিশ্বে ও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা নীলকান্তের বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার তাউরা ( গ্রীক, Korakias= তাউরা, bengalensis=বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্রটি ইনাম আল হকের তোলা।
৩) বাংলা কাঠঠোকরা,Lesser Goldenback, Dinopium benghalense

বর্ণনা- বাংলা কাঠঠোকরা বাংলাদেশের অতি চেনা কাঠঠোকরা ( দৈর্ঘ্য ২৯ সেমি, ওজন ১০০ গ্রাম, ডানা ১৪.২ সেমি, ঠোঁট ৩.৭ সেমি, পা ২.৫ সেমি, লেজ ৯ সেমি)। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ সোনালী-হলুদ, দেহতলে কালো আইশের দাগ, ওড়ার পালক ও লেজ কালো, থুতনিতে কালো ডোরা, সাদা ঘাড়ের পাশে কালো দাগ, বুকে মোটা কালো আইশের দাগ, চোখে কালো ডোরা, ডানার গোঁড়ার ও মধ্য-পালক ঢাকনিতে সাদা বা ফিকে ফুটকি এবং পিঠ ও ডানার অবশেষ সোনালি। সবুজ গোলকসহ এর ঠোঁট লালচে-বাদামি, পা ও পায়ের পাতা ধূসর সবুজ এবং ঠোঁট শিঙ-রঙ এবং কালোর মিশ্রণ। ছেলে ও মেয়েপাখির চেহারায় পার্থক্য তাদের চাঁদি এবং ঝুটির রঙে, ছেলেপাখির চাঁদি ও ঝুটি উজ্জল লাল এবং মেয়েপাখির সাদা বিন্দুসহ চাঁদির সামনের অংশ কালো ও পিছনের ঝুটি লাল। তরুণ পাখির অনুজ্জল দেহ ও চাঁদির সামনের ভাগের সাদা বিন্দু ছাড়া দেখতে মেয়েপাখির মত। ৪টি উপপ্রজাতির মধ্যে D.b.bengalensis বাংলাদেশে আছে।

স্বভাব- বাংলা কাঠঠোকরা বন, বাগান ও লোকালয়ে সর্বত্র বিচরণ করে, একাকী, জোড়ায় বা পারিবারিক দলে দেখা যায়। গাছের কাণ্ড ও ডালে হাতুড়ির মত আঘাত করে অথবা মাটিতে ঝরাপাতা উল্টে এরা খাবার সংগ্রহ করে। খাদ্যতালিকায় রয়েছে পিঁপড়া, শুঁয়োপোকা, বিছা, মাকড়শা, অন্যান্য পোকামাকড় এবং ফুল ও ফলের রস।
শক্ত পা ও অনমনীয় লেজে ভর দিয়ে ছোট ছোট লাফ মেরে এরা গাছের কাণ্ড বেয়ে উপরে ওঠে, ওড়ার সময় উচ্চ স্বরে ডাকে- কিয়ি কিয়ি কিয়ি-কিয়ি-কিয়িকিয়িইরররর-র-র-র। ফেব্রুয়ারি- জুলাই মাসে প্রজনন ঋতুতে গাছের কাণ্ডে গর্ত খুঁড়ে বাসা বেঁধে এরা ডিম পাড়ে। ডিমগুলো সাদা, সংখ্যায় ৩টি, মাপ ২.৮ x ২.০ সেমি। ছেলে ও মেয়েপাখির উভয়ই বাসার সব কাজ করে। বাসায় হামলা হলে ছানারা সাপের মত হিসহিস শব্দ করে।
বিস্তৃতি- বাংলা কাঠঠোকরা বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি, সব বিভাগের সব বনে ও লোকালয়ে রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা- বাংলা কাঠঠোকরা বিশ্বে ও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা কাঠঠোকরার বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার বলীয়ান ( গ্রিক deinos= শক্তিমান, opos=চেহারা, bengalensis=বাংলার)। পাখিটি বাংলাদেশে শুধু কাঠঠোকরা নামে পরিচিত।
ব্যবহৃত আলোকচিত্র ২টি ইনাম আল হকের তোলা।
৪ ) বাংলা কুবো, Lesser Coucal, Centropus bengalensis

বর্ণনা- বাংলা কুবো পর্যায়ক্রমে পালকসজ্জিত লম্বা লেজওয়ালা কাকের মত পাখি ( দৈর্ঘ্য ৩৩ সেমি, ওজন ১২০ গ্রাম, ডানা ১৫ সেমি, ঠোঁট ২.৭ সেমি, পা ৩.৭ সেমি, লেজ ১৮ সেমি)। প্রজনন ঋতুতে পিঠ তামাটে ও দেহতল কালো হয়। অনুজ্জল তামাটে কাঁধ-ঢাকনি ও ডানা ছাড়া পুরো দেহই চকচকে কালো। প্রাথমিক ও তৃতীয় সারির পালকের আগা বাদামি এবং লেজ কালো। প্রজননকাল ছাড়া পাখির কালচে বাদামি মাথা ও কাঁধ-ঢাকনিতে পীতাভ শরের ডোরা এবং কোমরে কালচে বাদামি ও লালচে ডোরা রয়েছে। দেহতল পীতাভ এবং গলা ও বুকে ফিকে ডোরা আছে, সব ঋতুতেই চোখ গাঢ় লাল, ঠোঁট কালো এবং পা, পায়ের পাতা ও নখর স্লেট-কালো। ছেলে ও মেয়েপাখির চেহারায় কোন পার্থক্য নেই। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির ডানা, মাথার চাঁদি, কাঁধ-ঢাকনি ও পিঠে কালচে বাদামি ডোরা থাকে। ৫ টি উপপ্রজাতির মধ্যে C.b.bengalensis বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
স্বভাব- বাংলা কুবো উঁচু ঘাসের জমি, নল বন, ঘন গুল্ম, ঝোপ ও চা বাগানে বিচরণ করে। সচরাচর একা বা জোড়ায় থাকে। মাটিতে চুপিসারে হেঁটে এবং হঠাৎ শিকারকে ঠোঁট ও পা দিয়ে চেপে ধরে শিকার করে। খাবার তালিকায় ফড়িং ও অন্যান্য বড় পোকা রয়েছে। ওড়ার চেয়ে দৌড়াতে পছন্দ করে। ভোরে ও গোধূলিতে বেশ কর্ম তৎপর থাকে। দুটি অনুক্রমিক স্বরে ডাকে- কুপ-কুপ-কুপ কুরুক-কুবুক-কুরুক। মার্চ-অক্টোবর মাসে প্রজননকালে পূর্বরাগে ছেলে পাখি লেজ খাড়া করে ও বাকায়। ভূমির কাছাকাছি ঘন ঝোপে পল্লব, পত্র ফলক ও ঘাসের ডগা দিয়ে পার্শ্ব প্রবেশ পথসহ ডিম্বাকার বাসা বানায়। ডিমগুলো সাদা, সংখ্যায় ২-৪টি, মাপ ২.৮ x ২.৩ সেমি।

বিস্তৃতি- বাংলা কুবো বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা ও সিলেট বিভাগের ঝোপঝাড়ে ও চা বাগানে পাওয়া যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীনের দক্ষিনাঞ্চল ও ফিলিপাইনে এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে, পাকিস্তান ও মালদ্বীপ ব্যতীত সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় পাওয়া যায়।
অবস্থা- বাংলা কুবো বিশ্বে ও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত বলে পরিচিত। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে এ প্রজাতিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয় নি।
বিবিধ- বাংলা কুবোর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার গজাল-পা ( গ্রিক-kentron= গজালের মত নখর, pous= পা,bengalensis= বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্র ২টি ইনাম আল হকের তোলা।
৫) বাংলা ডাহর, Bengal Florican, Houbaropsis bengalensis

বর্ণনা- বাংলা ডাহর বাংলাদেশে থেকে হারিয়ে যাওয়া বড় আকারের ভূচর পাখি, ( দৈর্ঘ্য ৬৬ সেমি, ওজন ২ কেজি, ডানা ৩৫.৫ সেমি, ঠোঁট- ৩.৭ সেমি, পা ১৭.৫ সেমি)। ছেলে ও মেয়ে পাখির চেহারায় পার্থক্য আছে, ছেলের মাথা ও ঘাড় মখমল কালো এবং সাদা ডানার আগা কালো, পিঠের বাকী অংশ কালো ও মেটে থেকে দারুচিনি পীতাভে মিশ্রিত, বুকে এক গুচ্ছ লম্বা পালক, দেহের নিচের দিকে মখমল বাদামি। মেয়েপাখি ছেলে পাখি থেকে আকারে কিছুটা বড়। পীতাভ ভ্রু-রেখা সমেত মাথার চাঁদি ঘন বাদামি ও পিঠে স্পষ্ট বাদামি রঙে কালো তীর-ফলকের দাগ, ঘাড়ের পাশে ঘন বাদামি সরু ডোরা ও দেহের নিচের দিক পীতাভ-সাদা, ডানার পালক ঢাকনি পীতাভ-সাদা ও ওড়ার পালকে বাদামি ডোরা। ছেলে ও মেয়ে পাখি উভয়েরই চোখ হলুদ, ঠোঁট ঘন বাদামি এবং পা ও পায়ের পাতা হলুদ। ২টি উপপ্রজাতির মধ্যে H.b.bengalensis এককালে বাংলাদেশে ছিল।
স্বভাব- বাংলা ডাহর বাদাবন, বন সংলগ্ন ঝোপের প্রান্তর ও বৃহৎ তৃণভূমিতে বিচরণ করে, ৪-৮টি পাখির ছোট দলে দেখা যায়। ঘাসে ও শস্যক্ষেতে ধীরে হেঁটে এবং ঠুকরে খাবার খায়, খাদ্যতালিকায় রয়েছে পোকামাকড়, টিকটিকি, ছোট সাপ, রসালো ফল, বীজ এবং ঘাসের ও শস্যের কচি ডগা।
ভোর ও গোধূলিতে এরা বেশী কর্মচঞ্চল থাকে এবং দলের সদস্যদের সাথে যোগাযোগের জন্য ধাতব স্বরে ডাকে- চিক-চিক-চিক। মার্চ- জুন মাসে প্রজনন কালে ছেলেরা লাফ দিয়ে উঁচু ঘাসের উপর ডানা ছড়িয়ে নিজেদের প্রদর্শন করে এবং তৃণভূমির মাটি সামান্য খুঁড়ে ঘাস বিছিয়ে বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো জলপাই-সবুজ, বেগুনি ফুসকুড়ি ও ফিকে বেগুনি-ধূসর দাগ আছে, সংখ্যায় ২টি, ৬.৪ x ৪.৬ সেমি। ৩০ দিনে ডিম ফোটে।
বিস্তৃতি- বাংলা ডাহর বাংলাদেশের প্রাক্তন আবাসিক পাখি, ঢাকা বিভাগের তৃণভূমিতে পাওয়া যেত, পাখিটি এখন আর নেই। বর্তমানে নেপাল, উত্তর-পূর্ব ভারত, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা- বাংলা ডাহর বিশ্বে বিপন্ন ও বাংলাদেশে অপ্রতুল তথ্য শ্রেণীতে রয়েছে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা ডাহরের বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার ডাহর ( আরবি hubura= ডাহর, opsis= চেহারা, bengalensis= বাংলার)।
ব্যবহৃত চিত্রকর্ম নেট হতে সংগৃহীত।
৬) বাংলা রাঙাচ্যাগা, Greater Painted Snipe, Rostratula bengalensis
বর্ণনা- বাংলা রাঙাচ্যাগা ছেলেমেয়ের প্রচলিত ভূমিকা উল্টে নেয়া অনন্য জলচর পাখি, ( দৈর্ঘ্য ২৫ সেমি, ওজন ১২৫ গ্রাম, ডানা ১২.৫ সেমি, ঠোঁট ৪.৪ সেমি, পা ৪.৩ সেমি, লেজ ৪ সেমি)। ছেলের চেয়ে মেয়ে পাখি বেশী রঙ্গিন। অথচ পাখি জগতে এর উল্টোটিই হয় সবসময়, দেখুন পুরুষ পাখির ছবি-

এবং তার সঙ্গিনীর ছবি-

প্রজননকালে মেয়েপাখির পিঠের দিক কালচে ধাতব জলপাই-সবুজ অথবা ব্রোঞ্জ সবুজ, দেহের নিচের দিক সাদা, সাদাটে চোখের বলয়, চোখের পেছনে সাদা দাগ, মাথার চাঁদির ডোরা হালকা পীত বর্ণের। গাল, গলা, ঘাড়র পাশে ও বুক তামাটে কিংবা মেরুন, বুকের নিচের ফিতা কালো এবং দেহতলের শেষাংশ সাদা এবং ওড়ার সময় কালচে পিঠে স্পষ্ট সাদা V চিহ্নিত দাগ দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেপাখির বর্ণবিন্যাস একই ধরনের কিন্তু অনুজ্জল এবং ডানার পালক-ঢাকনিতে এক জোড়া বড় সোনালি-পীতাভ তিলা আছে। ছেলে ও মেয়ে পাখি উভয়ের চোখ বাদামি, লম্বা কমলা-বাদামি ঠোঁট নিচের দিকে সামান্য বাঁকানো, পা জলপাই-সবুজ। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির ডানার পালক-ঢাকনি ধূসর ও পিঠের মোটা তিলা ফিকে পীতাভ। ২টি উপপ্রজাতির মধ্যে R.b.bengalensis বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
স্বভাব- বাংলা রাঙাচ্যাগা জলাভূমি, স্যাঁতস্যাঁতে তৃণভূমি ও প্লাবিত ধানক্ষেতে বিচরণ করে, সচরাচর এক, জোড়ায় কিংবা বিচ্ছিন্ন ঝাঁকে থাকে। অগভীর পানিতে হেঁটে ও মাটিতে ঠোঁট ঢুকিয়ে খাবার খায়, খাদ্যতালিকায় রয়েছে পোকা, শামুক, চিংড়ি জাতীয় প্রাণী, কেঁচো, বীজ ও শস্যদানা।
ভোর ও গোধূলিতে এরা বেশী কর্মচঞ্চল হয়, ওড়ার সময় ফাঁপা গলায় পুনঃ পুনঃ ডাকে – পৌ—পৌ। জুলাই- সেপ্টেম্বর মাসে প্রজননকালে মেয়েপাখি গোধূলিতে গান গাওয়া শুরু করে এবং পূর্ণিমাতে পুরো রাত গম্ভীর গলায় পুনঃ পুনঃ গায় উওক—উওক। ( পাখি জগতে সাধারণত ছেলেরাই গান গায়, এটি বিরল ব্যতিক্রম)
ঘাসের গোঁড়ায় ঘাস বিছিয়ে বাসা বানিয়ে এরা ডিম পাড়ে। ডিমগুলো হলদে, সংখ্যায় ২-৫ টি, মাপ ৩.৬ x ২.৫ সেমি। ছেলেপাখি একাই ডিমে তা দেওয়া ও ছানাপালার কাজ করে, ১৫-২১ দিনে ডিম ফোটে। মেয়েপাখি অন্য ছেলের সাথে মিলিত হইয়ে অন্য বাসায় আবার ডিম পাড়ে।
বিস্তৃতি- বাংলা রাঙাচ্যাগা বাংলাদেশের বিরল আবাসিক পাখি। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগের জলাভূমিতে পাওয়া যায়। আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত উপমহাদেশসহ এশিয়ায় এদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি, তবে ভুটান ও মালদ্বীপে নেই।
অবস্থা- বাংলা রাঙাচ্যাগা বিশ্বে ও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা রাঙাচ্যাগার বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার বড়ঠুঁটো ( ল্যাতিন rostratus=বড় ঠোঁটের, bengalensis= বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্র ২টি ইনাম আল হকের তোলা।
৭) বাংলা টিকিপানচিল, Lesser Crested Tern, Sterna bengalensis

বর্ণনা- বাংলা টিকিপানচিল কালো ঝুটি ও ধূসর ডানার সামুদ্রিক পাখি ( দৈর্ঘ্য ৪৩ সেমি, ডানা ২৮.৫ সেমি, ঠোঁট ৫.৩ সেমি, পা ২.৮ সেমি, লেজ ১৩.৫ সেমি)। প্রজনন ঋতুতে প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠের দিক ফিকে ধূসর, দেহের নিচের দিক একদম সাদা, কপাল, মাথার চাঁদি ও ঝুটি কালো, কোমর ডানা উপরি-ঢাকনি ও লেজের মাঝখানের পালক ধূসর এবং ডানার ওড়ার প্রথম পালক কালচে, ঠোঁট কমলা থেকে কমলা-হলুদ ও চোখ বাদামি, পা ও পায়ের পাতা কালো এবং পায়ের তলা হলদে থাকে। প্রজননকাল ছাড়া এর কপাল সাদা ও ঠোঁট ফিকে হলদে-কমলা হয়। ছেলে ও মেয়েপাখির চেহারা অভিন্ন। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠের দিক কিছুটা বাদামি-ধূসর, দেহের নিচের দিক সাদাটে, ডানার প্রান্ত-পালক কালচে, ডানায় কালচে ডোরা, কাঁধ-ঢাকনি, ডানা-ঢাকনি ও গোড়ার পালকে তিলা রয়েছে। ৩ টি উপপ্রজাতির মধ্যে S.b.bengalensis বাংলাদেশে রয়েছে।
স্বভাব- বাংলা টিকিপানচিল সাগর তীর, পোতাশ্রয়, জোয়ারীয় খাঁড়ি ও লবণ চাষের জমিতে বিচরণ করে,দলবদ্ধ পাখি ও সচরাচর বিচ্ছিন্ন দলে থাকে, প্রায়ই বাতাসি পানচিলের সাথে দেখা যায়। জলের সামান্য উপরে উড়ে ছোঁ মেরে এদের খাদ্য সংগ্রহ করতে দেখা যায়, খাদ্যতালিকায় প্রধানত রয়েছে মাছ ও চিংড়ি। দৃঢ় ভাবে ডানা নেড়ে উড়ে চলে এবং মাছারাঙ্গার মতই শূন্যে মুহূর্তের জন্য স্থির ভেসে থাকতে পারে, প্রায়ই গভীর সাগরে উড়ে যায়, জলে ঝাপ দেবার আগে সচরাচর ডাকে- ক্রীক- ক্রীক এবং ভয় পেলে উচ্চ শব্দে কিচমিচ করে ডাকে।

মালদ্বীপ ও পারস্য উপসাগরের চরে মে-জুন মাসে প্রজননকালে ছেলেপাখি মেয়েকে মাছ এনে উপহার দেয় এবং মাটিতে বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে। ডিম সংখ্যায় ১-২ টি।
বিস্তৃতি- বাংলা টিকিপানচিল বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি। চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলে পাওয়া যায়। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত উপমহাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এরা বিস্তৃত তবে নেপাল ও ভুটানে পাওয়া যায় না।
অবস্থা- বাংলা টিকিপানচিল বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশে অপ্রতুল-তথ্য শ্রেণীতে রয়েছে। বাংলাদেশের বন্য প্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা টিকিপানচিলের বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ কমলা রঙের পানচিল ( পুরনো ইংরেজি starn= কমলা, bengalensis= বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্র ২টি ইনাম আল হকের তোলা।
৮ ) বাংলা বাবুই ,Black-breasted Weaver, Ploceus benghalensis

বর্ণনা – বাংলা বাবুই কালো বুক ও মোটা ঠোঁটের ছোট বুননবিদ পাখি ( দৈর্ঘ্য ১১ সেমি, ওজন ২০ গ্রাম, ডানা ৭ সেমি, ঠোঁট ১.৬ সেমি, পা ২ সেমি, লেজ ৪ সেমি)। প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে ও ছেলে পাখির চেহারা ভিন্ন। প্রজননকালে ছেলেপাখির মাথার চাঁদি হলুদ, কালচে লম্বালম্বি দাগসহ পিঠের শেষাংশ কালচে বাদামি, কান-ঢাকনি ও গলা সামান্য বাদামি কিংবা সাদা, বুক বরাবর প্রশস্ত কালো ফিতা এবং পেট সাদাটে হয়। প্রজননকাল ছাড়া ছেলে ও মেয়েপাখির পেট পীতাভ, দেহের উপরিভাগের পিছনের অংশ লম্বালম্বি গালকা হলুদ দাগসহ কালচে বাদামি, ভ্রু-রেখা হলুদ, ঘাড়ের পিছনে কালচে রেখা ও ছোট্ট হলুদ পট্টি রয়েছে, কান-ঢাকনি বাদামি, হলুদ গলা ও উপ-গুম্ফ এলাকা কালচে, এবং বুকের কালচে-বাদামি ফিতা অসম্পূর্ণ থাকতে পারে। ছেলে ও মেয়ে উভয়ের চোখ হালকা বাদামি, ঠোঁট ফিকে খয়েরি এবং পা ও পায়ের পাতা হলদে মেটে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি চেহারা মেয়েপাখির মত তবে বুক অপেক্ষাকৃত ফিকে।
স্বভাব- বাংলা বাবুই নল, মৌসুমে প্লাবিত উঁচু ঘাস ও আবাদি জমিতে বিচরণ করে, এরা দলবদ্ধ পাখি এবং সচরাচর ঝাকে থাকে। তৃণভূমি, শস্য-ক্ষেত ও প্রান্তরে এরা খাবার খোঁজে, খাদ্যতালিকায় রয়েছে বীজ ও পোকামাকড়।
সচরাচর এরা মৃদু স্বরে পুনঃপুনঃ ডাকে চিট চিট এবং গলা ছেড়ে কোমল কণ্ঠে গায় – সি সি সিসিক সিসিক সিক সিক। ছেলেপাখি গান গায়, মাথা নত করে এবং এর হলুদ ঠোঁট এবং চাঁদি দেখায়। জুন সেপ্টেম্বর মাসে প্রজনন মৌসুমে পানির ধারে উঁচু ঘাস কিংবা নলে পাতা ও ঘাসের সূক্ষ লম্বা ফালি দিয়ে ঝোলানো বাসা বুনিয়ে এরা ২-৪টি ডিম পাড়ে।
বিস্তৃতি- বাংলা বাবুই বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের হাওর এবং বড় পাড়ে পাওয়া যায়। বিশ শতকের মাঝামাঝি কাল পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ছিল এমন তথ্য রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা – বাংলা বাবুই বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশে অপ্রতুল-তথ্য শ্রেণীতে রয়েছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা বাবুইএর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার বাবুই (গ্রিক plokeus=বাবুই, benghalensis=বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্র নেট হতে সংগৃহীত।
৯) বাংলা ঘাসপাখি, Rufous-rumped Grassbird , Graminicola bengalensis

বর্ণনা- বাংলা ঘাসপাখি একটি ডোরাযুক্ত লালচে-বাদামি পোকা-শিকারি পাখি ( দৈর্ঘ্য ১৬ সেমি, ডানা ৬ সেমি, ঠোঁট ১.৪ সেমি, পা ২.৪ সেমি, লেজ ১৪.৭ সেমি)। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির লালচে-বাদামি পিঠে মোটা কালো লম্বা দাগ থাকে, তবে কোমর ও ডানায় রয়েছে লালচে রঙের দাগ। এর ঘাড়ের পিছনের লম্বা সাদা দাগ কিংবা পীত বর্ণের, ভ্রু-রেখা সাদা, দেহতলের অধিকাংশ সাদা কিন্তু বগল ও বুকের পাশ লালচে-পীত বর্ণের, ঘোর কালচে-বাদামি প্রশস্ত লেজের আগা সাদা, এর অনেকাংশ নিচে থেকে দেখা যায়, চোখ লালচে-বাদামি, পা ও পায়ের পাতা মেটে-বাদামি এবং ঠোঁট বাদামি। ৩ টি উপপ্রজাতির মধ্যে G.b.bengalensis বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
স্বভাব- বাংলা ঘাসপাখি সাধারণত পানির ধারের নল ও উঁচু ঘাসে বিচরণ করে, খুব নিভৃতচারী ও দিবাচর পাখি। প্রজনন মৌসুম ছাড়া সচরাচর ঘন ঘাসে লুকিয়ে থাকে। ভুম, নলের ঝোপ ও ঘাসে খাবার খোঁজে।
খাদ্যতালিকায় রয়েছে পোকামাকড়। বিরক্ত হলে অনিচ্ছায় ঘাসের আড়াল ছেড়ে সামান্য উড়ে ঘাসে লুকিয়ে থাকে। প্রজনন মৌসুম ছাড়া ডাকে- এর- উয়িট-উয়িট-উয়িট। জুলাই-আগস্ট মাসে প্রজননকালে ছেলেপাখি নলের চূড়া থেকে শ্রুতিকটু গান গায় এবং নলের উপর দিয়ে ওড়ার সময় একটু করে গান ধরে।
গভীর জলে দণ্ডায়মান ঘন ঘাসে নলখাগড়া এবং উদ্ভিদের আঁশের উপর সূক্ষ ঘাসের শিকড় বিছিয়ে গভীর বাটির মত বাসা বানিয়ে এরা ডিম পাড়ে। ডিমগুলো সাদা, সংখ্যায় ৪টি, মাপ ১.৭ x ১.৪ সেমি।
বিস্তৃতি- বাংলা ঘাসপাখি বাংলাদেশের বিরল আবাসিক পাখি, প্রধানত সিলেট বিভাগের হাওরের চারপাশের নলে পাওয়া যায় এবং উনিশ শতকে ঢাকা বিভাগে ছিল এমন তথ্য আছে। ভারত, নেপাল, দক্ষিণ-পূর্ব চীন, মিয়ানমার ও ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ, পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা- বাংলা ঘাসপাখি বিশ্বের প্রায় বিপদগ্রস্ত এবং বাংলাদেশে অপ্রতুল-তথ্য শ্রেণীতে রয়েছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা ঘাসপাখির বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার ঘাসপাখি( ল্যাতিন graminis =ঘাস, bengalensis= বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্র নেট হতে সংগৃহীত।
১০) বাংলা হুতোমপ্যাঁচা, Indian Eagle-Owl, Bubo bengalensis

অতিকায় এই পেঁচাটিকে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে দেখা যায় নি, এমনকি কোন দিন বাংলাদেশে ছিল কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, তবে কাছাকাছি অঞ্চলে হিসেবে ভারতের আসামে বাংলা পেঁচাকে দেখা গেছে। যদি কোনদিন বাংলাদেশে তার আগমনের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তাকে নিয়েও অন্যদের মত তথ্যময় ফিচার আসবে আশা রাখি। ব্যবহৃত আলোকচিত্র নেট হতে সংগৃহীত।
১১) Red-cheeked Cordonbleu, Uraeginthus bengalus

এই রূপবান ক্ষুদে পাখিটির নাম বাংলার নামে রাখা হলেও বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে পাখিটি আফ্রিকান সাহারা অঞ্চলের! কোন ভাবে বিজ্ঞানীদের ভ্রান্ত ধারণা হয়েছিল যে পাখিটি বাংলার! ব্যবহৃত চিত্রকর্মটি নেট থেকে সংগৃহীত।
সুত্রঃhttp://bornelegant.wordpress.com/2012/05/19/
বিস্তারিত পড়ুন ... »
বহু গুণে গুণান্বিত বিশ্বখ্যাত সুইডিশ বিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়ের (Carl Linnaeus) আবিস্কার করলেন সমস্ত প্রাণীর নামকরণের এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যাতে প্রাণীটির পরিবার, প্রজাতি, গণ সম্পর্কে নামের মাধ্যমেই প্রাণীজগতে এর অবস্থান বোঝা যায়। ১৭০৭ সালে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি জীবনের একটি বড় সময় ব্যয় করেছিলেন সারা বিশ্ব থেকে তার কাছে পাঠানো জীবজগতের নমুনার নামকরণে, যাকে আমরা বৈজ্ঞানিক নামে বলে থাকি, যা হয়েছিল মূলত ল্যাটিন ভাষায়। সে গল্পের ব্যপ্তি এবং গুরুত্ব এতই বিশাল যে অন্যদিনের জন্য তোলা থাকল ।
সুইডিশ বিজ্ঞানীটি সারা বিশ্বে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের জানালেন নমুনা পাঠাবার সময় সাথে স্থানীয় নামটিও পাঠাবার জন্য। যখন বাংলা থেকে তার কাছে সাদা- কালোয় মেশানো অপূর্ব সুন্দর একটি পাখি পৌঁছাল ( যার ভোরের সূর্য উঠানো জাদুময় সুর মূর্ছনা শোনার সৌভাগ্য হল না তার) যার স্থানীয় নাম দোয়েল, তার উচ্চারণে হল ডয়েল, আনমনে ভাবছিলেন ডয়েল, ডায়াল, সান-ডায়াল, হ্যাঁ, পাওয়া গেছে নাম! সূর্যের নামে পাখিটির নাম হল Copsychus saularis । এমন সব চমৎকার ইতিহাস আছে প্রতিটি নামের সাথেই।
সারা বিশ্বের প্রায় ৯০০০ প্রজাতির পাখির মধ্যে ১১টির বৈজ্ঞানিক নামের সাথে bengalensis বা বাংলার — পাখি শব্দটি জড়িত আছে। জড়িয়ে আছে বাংলার নাম, চলুন আর শুনি তাদের গল্প, দেখি তাদের মন ভরানো সৌন্দর্য, পরবর্তীতে তাদের দেখবেন বুনো মুক্ত পরিবেশে-
১) বাংলা শকুন, White-rumped Vulture, Gyps bengalensis
বর্ণনা- বাংলা শকুন বিশাল, প্রশস্ত ডানা এবং কালচে দেহের অধিকারী পাখি (দৈর্ঘ্য ৯০ সেমি, ওজন ৪.৩ কেজি, ডানা ৫৫ সেমি, ঠোঁট ৭.৬ সেমি, পা ১১.৬ সেমি, লেজ ২২.৫ সেমি)। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মলিন গলাবন্ধ সাদা এবং দেহ কালচে-বাদামী, কোমর স্পষ্ট সাদা, পালকহীন মাথা ও ঘাড় কালচে ধূসর।
মাথার ওপর দিয়ে ওড়ার সময় সাদা গলাবন্ধ, কালচে দেহ এবং ডানার নিচের দিকের সাদা পালক- ঢাকনি ও ওড়ার-পালকের কালচে পাড়ের পার্থক্য দেখে চেনা যেতে পারে। চোখ হলদে-বাদামী কিংবা ফিকে বাদামী, কালচে হালকা খয়েরি অথবা সবুজ-হালকা খয়েরি, ঠোঁটের ঝিল্লি কালো, মাথা ও ঘাড়ের পালকহীন চামড়া কালচে হালকা খয়েরি, এবং পা ও পায়ের পাতা কালো। ছেলে ও মেয়ের চেহারা অভিন্ন। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির কালচে বাদামি দেহ ও ডানার উপরে সূক্ষ সাদা ডোরা রয়েছে। কোমর কালচে ও ডানার পালকের নিচের ঢাকনিতে সরু সাদা টান রয়েছে।
স্বভাব- বাংলা শকুন বনের ধার, গ্রাম, ভাগাড় ও কসাইখানায় বিচরণ করে এবং এরা সবসময় দলবদ্ধ ভাবে থাকে। আহারের খোঁজে এরা আকাশে টহল দেয় অথবা উঁচু গাছ বা দালানে বসে থাকে। খাদ্যতালিকায় রয়েছে মৃত প্রাণী এবং পচা মাংস। খাবার দেখতে পেলে শো শো শব্দে দ্রুত নিচে নেমে আসে, এবং খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করে ও কর্কশ গলার ঘড়ঘড়, হিসহিস কিংবা একটানা চিঁচিঁ চিৎকার করে।
সেপ্টেম্বর-মার্চ মাসে প্রজননকালে উঁচু গাছ বা দালানের ভগ্নাবশেষে ডালপালা দিয়ে মাচার মত বাসা বানায় এবং বছরের পর বছর একই বাসা ব্যবহার করে। এ বাসায় মেয়েপাখি একটি সাদা ডিম পাড়ে, ডিমের মাপ ৮.৬ x ৬.৪, ডিম ফুটতে ৪৫ দিন লাগে।
বিস্তৃতি- বাংলা শকুন বাংলাদেশের বিরল আবাসিক পাখি, সব বিভাগেই দেখা যায়। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, চীন, ইরান, আফগানিস্তান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশসহ এশিয়ায় এদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা- বাংলা শকুন বিশ্বের মহাবিপন্ন বলে পরিচিত। গবাদিপশুর চিকিৎসায় ডাইক্লোফেনিক ব্যবহারের ফলে বিগত শতকের সুলভ এই পাখির সংখ্যা ৯৮ % হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশে এ প্রজাতিটি এখনও বিপদগ্রস্ত পাখির তালিকাভুক্ত করা হয় নি। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা শকুনের বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার শকুন! ( Gyps = শকুন, bengalensis= বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্রটি ইনাম আল হকের তোলা।
২) বাংলা নীলকান্ত, Indian Roller , Coracias bengalensis
বর্ণনা- বাংলা নীলকান্ত বাদামি বুক ও নীল ডানার পাখি ( দৈর্ঘ্য ৩১ সেমি, ওজন ১৬৫ গ্রাম, ডানা ১৯ সেমি, ঠোঁট ৩.৫ সেমি, পা ২.৭ সেমি, লেজ ১৩ সেমি)। বসে থাকা অবস্থায় এর পিঠ লালচে বাদামি, উড়ে গেলে ডানার নীল রঙ দেখা যায়, ডানায় পর্যায়ক্রমে ফিকে নীল ও কালচে নীল পালক রয়েছে। গলাবন্ধ, ঘাড়ের পিছনের ভাগ, গলা ও বুক লালচে-বাদামি। কাঁধ-ঢাকনি ও ডানার গোঁড়ার পালক বাদামি জলপাই-সবুজ, তলপেট ও অবসারণী ফিকে নীল এবং লেজ গাঢ় নীল। এর চোখ বাদামি, ঠোঁট বাদামি-কালো, পা এবং পায়ের সঙ্গে সংযুক্ত অঙ্গ হলদে-বাদামি। ছেলে ও মেয়েপাখির চেহারা অভিন্ন। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি অনুজ্জ্বল, কাঁধ-ঢাকনি মেটে বাদামি এবং গলা ও বুকে ডোরা রয়েছে। ৩টি উপপ্রজাতির মধ্যে C.b.bengalensis এবং সম্ভবত C.b.affinis বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
স্বভাব- বাংলা নীলকান্ত পাতাঝরা বন, বনের প্রান্তদেশ, তৃণভূমি, ক্ষুদ্র ঝোপ, খামার ও গ্রামাঞ্চলে বিচরণ করে। পাতাহীন ডাল, বেড়ার বাঁশ অথবা বৈদ্যুতিক তারে একাকী বসে থাকে। নীরবে বসে এরা ধীরে লেজ ওপর-নিচে দোলায় ও নিচের ভূমিতে শিকার খোঁজে।
আহার্যতালিকায় রয়েছে পোকামাকড়, টিকটিকি, ব্যাঙ ও সাপ। ঘাসে বা ঝোপে আগুন দেওয়া হলে পোকা ধরার জন্য এরা পাশে বসে অপেক্ষা করে।
এপ্রিল-মে মাসের প্রজনন ঋতুতে এরা উঁচু গলায় ও তীক্ষ সুরে ডাকে- ক্রাক, ক্রাক, ছেলে ও মেয়ে সমবেত ওড়ার মহড়া দেয় এবং গাছের কোটরে অথবা দালানকোঠার ফাঁকফোঁকরে ঘাস এবং খড়কুটো দিয়ে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে। ডিমের সংখ্যা ৩-৫টি, মাপ ৩.৮ x ২.৮ সেমি। ১৭-১৯ দিনে ডিম ফোটে, ২০-২৫ দিনে ছানার শরীরে ওড়ার পালক গজায়,
বিস্তৃতি- বাংলা নীলকান্ত বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি, সকল বিভাগের গ্রামাঞ্চলে বিচরণ করে। পারস্য উপসাগর থেকে পুরো ভারত উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে সুদুর চীন ও মালয়েশিয়া পর্যন্ত এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা- বাংলা নীলকান্ত বিশ্বে ও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা নীলকান্তের বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার তাউরা ( গ্রীক, Korakias= তাউরা, bengalensis=বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্রটি ইনাম আল হকের তোলা।
৩) বাংলা কাঠঠোকরা,Lesser Goldenback, Dinopium benghalense
বর্ণনা- বাংলা কাঠঠোকরা বাংলাদেশের অতি চেনা কাঠঠোকরা ( দৈর্ঘ্য ২৯ সেমি, ওজন ১০০ গ্রাম, ডানা ১৪.২ সেমি, ঠোঁট ৩.৭ সেমি, পা ২.৫ সেমি, লেজ ৯ সেমি)। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ সোনালী-হলুদ, দেহতলে কালো আইশের দাগ, ওড়ার পালক ও লেজ কালো, থুতনিতে কালো ডোরা, সাদা ঘাড়ের পাশে কালো দাগ, বুকে মোটা কালো আইশের দাগ, চোখে কালো ডোরা, ডানার গোঁড়ার ও মধ্য-পালক ঢাকনিতে সাদা বা ফিকে ফুটকি এবং পিঠ ও ডানার অবশেষ সোনালি। সবুজ গোলকসহ এর ঠোঁট লালচে-বাদামি, পা ও পায়ের পাতা ধূসর সবুজ এবং ঠোঁট শিঙ-রঙ এবং কালোর মিশ্রণ। ছেলে ও মেয়েপাখির চেহারায় পার্থক্য তাদের চাঁদি এবং ঝুটির রঙে, ছেলেপাখির চাঁদি ও ঝুটি উজ্জল লাল এবং মেয়েপাখির সাদা বিন্দুসহ চাঁদির সামনের অংশ কালো ও পিছনের ঝুটি লাল। তরুণ পাখির অনুজ্জল দেহ ও চাঁদির সামনের ভাগের সাদা বিন্দু ছাড়া দেখতে মেয়েপাখির মত। ৪টি উপপ্রজাতির মধ্যে D.b.bengalensis বাংলাদেশে আছে।
স্বভাব- বাংলা কাঠঠোকরা বন, বাগান ও লোকালয়ে সর্বত্র বিচরণ করে, একাকী, জোড়ায় বা পারিবারিক দলে দেখা যায়। গাছের কাণ্ড ও ডালে হাতুড়ির মত আঘাত করে অথবা মাটিতে ঝরাপাতা উল্টে এরা খাবার সংগ্রহ করে। খাদ্যতালিকায় রয়েছে পিঁপড়া, শুঁয়োপোকা, বিছা, মাকড়শা, অন্যান্য পোকামাকড় এবং ফুল ও ফলের রস।
শক্ত পা ও অনমনীয় লেজে ভর দিয়ে ছোট ছোট লাফ মেরে এরা গাছের কাণ্ড বেয়ে উপরে ওঠে, ওড়ার সময় উচ্চ স্বরে ডাকে- কিয়ি কিয়ি কিয়ি-কিয়ি-কিয়িকিয়িইরররর-র-র-র। ফেব্রুয়ারি- জুলাই মাসে প্রজনন ঋতুতে গাছের কাণ্ডে গর্ত খুঁড়ে বাসা বেঁধে এরা ডিম পাড়ে। ডিমগুলো সাদা, সংখ্যায় ৩টি, মাপ ২.৮ x ২.০ সেমি। ছেলে ও মেয়েপাখির উভয়ই বাসার সব কাজ করে। বাসায় হামলা হলে ছানারা সাপের মত হিসহিস শব্দ করে।
বিস্তৃতি- বাংলা কাঠঠোকরা বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি, সব বিভাগের সব বনে ও লোকালয়ে রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা- বাংলা কাঠঠোকরা বিশ্বে ও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা কাঠঠোকরার বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার বলীয়ান ( গ্রিক deinos= শক্তিমান, opos=চেহারা, bengalensis=বাংলার)। পাখিটি বাংলাদেশে শুধু কাঠঠোকরা নামে পরিচিত।
ব্যবহৃত আলোকচিত্র ২টি ইনাম আল হকের তোলা।
৪ ) বাংলা কুবো, Lesser Coucal, Centropus bengalensis
বর্ণনা- বাংলা কুবো পর্যায়ক্রমে পালকসজ্জিত লম্বা লেজওয়ালা কাকের মত পাখি ( দৈর্ঘ্য ৩৩ সেমি, ওজন ১২০ গ্রাম, ডানা ১৫ সেমি, ঠোঁট ২.৭ সেমি, পা ৩.৭ সেমি, লেজ ১৮ সেমি)। প্রজনন ঋতুতে পিঠ তামাটে ও দেহতল কালো হয়। অনুজ্জল তামাটে কাঁধ-ঢাকনি ও ডানা ছাড়া পুরো দেহই চকচকে কালো। প্রাথমিক ও তৃতীয় সারির পালকের আগা বাদামি এবং লেজ কালো। প্রজননকাল ছাড়া পাখির কালচে বাদামি মাথা ও কাঁধ-ঢাকনিতে পীতাভ শরের ডোরা এবং কোমরে কালচে বাদামি ও লালচে ডোরা রয়েছে। দেহতল পীতাভ এবং গলা ও বুকে ফিকে ডোরা আছে, সব ঋতুতেই চোখ গাঢ় লাল, ঠোঁট কালো এবং পা, পায়ের পাতা ও নখর স্লেট-কালো। ছেলে ও মেয়েপাখির চেহারায় কোন পার্থক্য নেই। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির ডানা, মাথার চাঁদি, কাঁধ-ঢাকনি ও পিঠে কালচে বাদামি ডোরা থাকে। ৫ টি উপপ্রজাতির মধ্যে C.b.bengalensis বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
স্বভাব- বাংলা কুবো উঁচু ঘাসের জমি, নল বন, ঘন গুল্ম, ঝোপ ও চা বাগানে বিচরণ করে। সচরাচর একা বা জোড়ায় থাকে। মাটিতে চুপিসারে হেঁটে এবং হঠাৎ শিকারকে ঠোঁট ও পা দিয়ে চেপে ধরে শিকার করে। খাবার তালিকায় ফড়িং ও অন্যান্য বড় পোকা রয়েছে। ওড়ার চেয়ে দৌড়াতে পছন্দ করে। ভোরে ও গোধূলিতে বেশ কর্ম তৎপর থাকে। দুটি অনুক্রমিক স্বরে ডাকে- কুপ-কুপ-কুপ কুরুক-কুবুক-কুরুক। মার্চ-অক্টোবর মাসে প্রজননকালে পূর্বরাগে ছেলে পাখি লেজ খাড়া করে ও বাকায়। ভূমির কাছাকাছি ঘন ঝোপে পল্লব, পত্র ফলক ও ঘাসের ডগা দিয়ে পার্শ্ব প্রবেশ পথসহ ডিম্বাকার বাসা বানায়। ডিমগুলো সাদা, সংখ্যায় ২-৪টি, মাপ ২.৮ x ২.৩ সেমি।
বিস্তৃতি- বাংলা কুবো বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি, চট্টগ্রাম, ঢাকা, খুলনা ও সিলেট বিভাগের ঝোপঝাড়ে ও চা বাগানে পাওয়া যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীনের দক্ষিনাঞ্চল ও ফিলিপাইনে এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে, পাকিস্তান ও মালদ্বীপ ব্যতীত সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় পাওয়া যায়।
অবস্থা- বাংলা কুবো বিশ্বে ও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত বলে পরিচিত। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে এ প্রজাতিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয় নি।
বিবিধ- বাংলা কুবোর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার গজাল-পা ( গ্রিক-kentron= গজালের মত নখর, pous= পা,bengalensis= বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্র ২টি ইনাম আল হকের তোলা।
৫) বাংলা ডাহর, Bengal Florican, Houbaropsis bengalensis
বর্ণনা- বাংলা ডাহর বাংলাদেশে থেকে হারিয়ে যাওয়া বড় আকারের ভূচর পাখি, ( দৈর্ঘ্য ৬৬ সেমি, ওজন ২ কেজি, ডানা ৩৫.৫ সেমি, ঠোঁট- ৩.৭ সেমি, পা ১৭.৫ সেমি)। ছেলে ও মেয়ে পাখির চেহারায় পার্থক্য আছে, ছেলের মাথা ও ঘাড় মখমল কালো এবং সাদা ডানার আগা কালো, পিঠের বাকী অংশ কালো ও মেটে থেকে দারুচিনি পীতাভে মিশ্রিত, বুকে এক গুচ্ছ লম্বা পালক, দেহের নিচের দিকে মখমল বাদামি। মেয়েপাখি ছেলে পাখি থেকে আকারে কিছুটা বড়। পীতাভ ভ্রু-রেখা সমেত মাথার চাঁদি ঘন বাদামি ও পিঠে স্পষ্ট বাদামি রঙে কালো তীর-ফলকের দাগ, ঘাড়ের পাশে ঘন বাদামি সরু ডোরা ও দেহের নিচের দিক পীতাভ-সাদা, ডানার পালক ঢাকনি পীতাভ-সাদা ও ওড়ার পালকে বাদামি ডোরা। ছেলে ও মেয়ে পাখি উভয়েরই চোখ হলুদ, ঠোঁট ঘন বাদামি এবং পা ও পায়ের পাতা হলুদ। ২টি উপপ্রজাতির মধ্যে H.b.bengalensis এককালে বাংলাদেশে ছিল।
স্বভাব- বাংলা ডাহর বাদাবন, বন সংলগ্ন ঝোপের প্রান্তর ও বৃহৎ তৃণভূমিতে বিচরণ করে, ৪-৮টি পাখির ছোট দলে দেখা যায়। ঘাসে ও শস্যক্ষেতে ধীরে হেঁটে এবং ঠুকরে খাবার খায়, খাদ্যতালিকায় রয়েছে পোকামাকড়, টিকটিকি, ছোট সাপ, রসালো ফল, বীজ এবং ঘাসের ও শস্যের কচি ডগা।
ভোর ও গোধূলিতে এরা বেশী কর্মচঞ্চল থাকে এবং দলের সদস্যদের সাথে যোগাযোগের জন্য ধাতব স্বরে ডাকে- চিক-চিক-চিক। মার্চ- জুন মাসে প্রজনন কালে ছেলেরা লাফ দিয়ে উঁচু ঘাসের উপর ডানা ছড়িয়ে নিজেদের প্রদর্শন করে এবং তৃণভূমির মাটি সামান্য খুঁড়ে ঘাস বিছিয়ে বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো জলপাই-সবুজ, বেগুনি ফুসকুড়ি ও ফিকে বেগুনি-ধূসর দাগ আছে, সংখ্যায় ২টি, ৬.৪ x ৪.৬ সেমি। ৩০ দিনে ডিম ফোটে।
বিস্তৃতি- বাংলা ডাহর বাংলাদেশের প্রাক্তন আবাসিক পাখি, ঢাকা বিভাগের তৃণভূমিতে পাওয়া যেত, পাখিটি এখন আর নেই। বর্তমানে নেপাল, উত্তর-পূর্ব ভারত, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম পর্যন্ত এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা- বাংলা ডাহর বিশ্বে বিপন্ন ও বাংলাদেশে অপ্রতুল তথ্য শ্রেণীতে রয়েছে। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা ডাহরের বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার ডাহর ( আরবি hubura= ডাহর, opsis= চেহারা, bengalensis= বাংলার)।
ব্যবহৃত চিত্রকর্ম নেট হতে সংগৃহীত।
৬) বাংলা রাঙাচ্যাগা, Greater Painted Snipe, Rostratula bengalensis
বর্ণনা- বাংলা রাঙাচ্যাগা ছেলেমেয়ের প্রচলিত ভূমিকা উল্টে নেয়া অনন্য জলচর পাখি, ( দৈর্ঘ্য ২৫ সেমি, ওজন ১২৫ গ্রাম, ডানা ১২.৫ সেমি, ঠোঁট ৪.৪ সেমি, পা ৪.৩ সেমি, লেজ ৪ সেমি)। ছেলের চেয়ে মেয়ে পাখি বেশী রঙ্গিন। অথচ পাখি জগতে এর উল্টোটিই হয় সবসময়, দেখুন পুরুষ পাখির ছবি-
এবং তার সঙ্গিনীর ছবি-
প্রজননকালে মেয়েপাখির পিঠের দিক কালচে ধাতব জলপাই-সবুজ অথবা ব্রোঞ্জ সবুজ, দেহের নিচের দিক সাদা, সাদাটে চোখের বলয়, চোখের পেছনে সাদা দাগ, মাথার চাঁদির ডোরা হালকা পীত বর্ণের। গাল, গলা, ঘাড়র পাশে ও বুক তামাটে কিংবা মেরুন, বুকের নিচের ফিতা কালো এবং দেহতলের শেষাংশ সাদা এবং ওড়ার সময় কালচে পিঠে স্পষ্ট সাদা V চিহ্নিত দাগ দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেপাখির বর্ণবিন্যাস একই ধরনের কিন্তু অনুজ্জল এবং ডানার পালক-ঢাকনিতে এক জোড়া বড় সোনালি-পীতাভ তিলা আছে। ছেলে ও মেয়ে পাখি উভয়ের চোখ বাদামি, লম্বা কমলা-বাদামি ঠোঁট নিচের দিকে সামান্য বাঁকানো, পা জলপাই-সবুজ। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির ডানার পালক-ঢাকনি ধূসর ও পিঠের মোটা তিলা ফিকে পীতাভ। ২টি উপপ্রজাতির মধ্যে R.b.bengalensis বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
স্বভাব- বাংলা রাঙাচ্যাগা জলাভূমি, স্যাঁতস্যাঁতে তৃণভূমি ও প্লাবিত ধানক্ষেতে বিচরণ করে, সচরাচর এক, জোড়ায় কিংবা বিচ্ছিন্ন ঝাঁকে থাকে। অগভীর পানিতে হেঁটে ও মাটিতে ঠোঁট ঢুকিয়ে খাবার খায়, খাদ্যতালিকায় রয়েছে পোকা, শামুক, চিংড়ি জাতীয় প্রাণী, কেঁচো, বীজ ও শস্যদানা।
ভোর ও গোধূলিতে এরা বেশী কর্মচঞ্চল হয়, ওড়ার সময় ফাঁপা গলায় পুনঃ পুনঃ ডাকে – পৌ—পৌ। জুলাই- সেপ্টেম্বর মাসে প্রজননকালে মেয়েপাখি গোধূলিতে গান গাওয়া শুরু করে এবং পূর্ণিমাতে পুরো রাত গম্ভীর গলায় পুনঃ পুনঃ গায় উওক—উওক। ( পাখি জগতে সাধারণত ছেলেরাই গান গায়, এটি বিরল ব্যতিক্রম)
ঘাসের গোঁড়ায় ঘাস বিছিয়ে বাসা বানিয়ে এরা ডিম পাড়ে। ডিমগুলো হলদে, সংখ্যায় ২-৫ টি, মাপ ৩.৬ x ২.৫ সেমি। ছেলেপাখি একাই ডিমে তা দেওয়া ও ছানাপালার কাজ করে, ১৫-২১ দিনে ডিম ফোটে। মেয়েপাখি অন্য ছেলের সাথে মিলিত হইয়ে অন্য বাসায় আবার ডিম পাড়ে।
বিস্তৃতি- বাংলা রাঙাচ্যাগা বাংলাদেশের বিরল আবাসিক পাখি। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেট বিভাগের জলাভূমিতে পাওয়া যায়। আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত উপমহাদেশসহ এশিয়ায় এদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি, তবে ভুটান ও মালদ্বীপে নেই।
অবস্থা- বাংলা রাঙাচ্যাগা বিশ্বে ও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা রাঙাচ্যাগার বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার বড়ঠুঁটো ( ল্যাতিন rostratus=বড় ঠোঁটের, bengalensis= বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্র ২টি ইনাম আল হকের তোলা।
৭) বাংলা টিকিপানচিল, Lesser Crested Tern, Sterna bengalensis
বর্ণনা- বাংলা টিকিপানচিল কালো ঝুটি ও ধূসর ডানার সামুদ্রিক পাখি ( দৈর্ঘ্য ৪৩ সেমি, ডানা ২৮.৫ সেমি, ঠোঁট ৫.৩ সেমি, পা ২.৮ সেমি, লেজ ১৩.৫ সেমি)। প্রজনন ঋতুতে প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠের দিক ফিকে ধূসর, দেহের নিচের দিক একদম সাদা, কপাল, মাথার চাঁদি ও ঝুটি কালো, কোমর ডানা উপরি-ঢাকনি ও লেজের মাঝখানের পালক ধূসর এবং ডানার ওড়ার প্রথম পালক কালচে, ঠোঁট কমলা থেকে কমলা-হলুদ ও চোখ বাদামি, পা ও পায়ের পাতা কালো এবং পায়ের তলা হলদে থাকে। প্রজননকাল ছাড়া এর কপাল সাদা ও ঠোঁট ফিকে হলদে-কমলা হয়। ছেলে ও মেয়েপাখির চেহারা অভিন্ন। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠের দিক কিছুটা বাদামি-ধূসর, দেহের নিচের দিক সাদাটে, ডানার প্রান্ত-পালক কালচে, ডানায় কালচে ডোরা, কাঁধ-ঢাকনি, ডানা-ঢাকনি ও গোড়ার পালকে তিলা রয়েছে। ৩ টি উপপ্রজাতির মধ্যে S.b.bengalensis বাংলাদেশে রয়েছে।
স্বভাব- বাংলা টিকিপানচিল সাগর তীর, পোতাশ্রয়, জোয়ারীয় খাঁড়ি ও লবণ চাষের জমিতে বিচরণ করে,দলবদ্ধ পাখি ও সচরাচর বিচ্ছিন্ন দলে থাকে, প্রায়ই বাতাসি পানচিলের সাথে দেখা যায়। জলের সামান্য উপরে উড়ে ছোঁ মেরে এদের খাদ্য সংগ্রহ করতে দেখা যায়, খাদ্যতালিকায় প্রধানত রয়েছে মাছ ও চিংড়ি। দৃঢ় ভাবে ডানা নেড়ে উড়ে চলে এবং মাছারাঙ্গার মতই শূন্যে মুহূর্তের জন্য স্থির ভেসে থাকতে পারে, প্রায়ই গভীর সাগরে উড়ে যায়, জলে ঝাপ দেবার আগে সচরাচর ডাকে- ক্রীক- ক্রীক এবং ভয় পেলে উচ্চ শব্দে কিচমিচ করে ডাকে।
মালদ্বীপ ও পারস্য উপসাগরের চরে মে-জুন মাসে প্রজননকালে ছেলেপাখি মেয়েকে মাছ এনে উপহার দেয় এবং মাটিতে বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে। ডিম সংখ্যায় ১-২ টি।
বিস্তৃতি- বাংলা টিকিপানচিল বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি। চট্টগ্রাম বিভাগের উপকূলে পাওয়া যায়। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত উপমহাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এরা বিস্তৃত তবে নেপাল ও ভুটানে পাওয়া যায় না।
অবস্থা- বাংলা টিকিপানচিল বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশে অপ্রতুল-তথ্য শ্রেণীতে রয়েছে। বাংলাদেশের বন্য প্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা টিকিপানচিলের বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ কমলা রঙের পানচিল ( পুরনো ইংরেজি starn= কমলা, bengalensis= বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্র ২টি ইনাম আল হকের তোলা।
৮ ) বাংলা বাবুই ,Black-breasted Weaver, Ploceus benghalensis
বর্ণনা – বাংলা বাবুই কালো বুক ও মোটা ঠোঁটের ছোট বুননবিদ পাখি ( দৈর্ঘ্য ১১ সেমি, ওজন ২০ গ্রাম, ডানা ৭ সেমি, ঠোঁট ১.৬ সেমি, পা ২ সেমি, লেজ ৪ সেমি)। প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে ও ছেলে পাখির চেহারা ভিন্ন। প্রজননকালে ছেলেপাখির মাথার চাঁদি হলুদ, কালচে লম্বালম্বি দাগসহ পিঠের শেষাংশ কালচে বাদামি, কান-ঢাকনি ও গলা সামান্য বাদামি কিংবা সাদা, বুক বরাবর প্রশস্ত কালো ফিতা এবং পেট সাদাটে হয়। প্রজননকাল ছাড়া ছেলে ও মেয়েপাখির পেট পীতাভ, দেহের উপরিভাগের পিছনের অংশ লম্বালম্বি গালকা হলুদ দাগসহ কালচে বাদামি, ভ্রু-রেখা হলুদ, ঘাড়ের পিছনে কালচে রেখা ও ছোট্ট হলুদ পট্টি রয়েছে, কান-ঢাকনি বাদামি, হলুদ গলা ও উপ-গুম্ফ এলাকা কালচে, এবং বুকের কালচে-বাদামি ফিতা অসম্পূর্ণ থাকতে পারে। ছেলে ও মেয়ে উভয়ের চোখ হালকা বাদামি, ঠোঁট ফিকে খয়েরি এবং পা ও পায়ের পাতা হলদে মেটে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি চেহারা মেয়েপাখির মত তবে বুক অপেক্ষাকৃত ফিকে।
স্বভাব- বাংলা বাবুই নল, মৌসুমে প্লাবিত উঁচু ঘাস ও আবাদি জমিতে বিচরণ করে, এরা দলবদ্ধ পাখি এবং সচরাচর ঝাকে থাকে। তৃণভূমি, শস্য-ক্ষেত ও প্রান্তরে এরা খাবার খোঁজে, খাদ্যতালিকায় রয়েছে বীজ ও পোকামাকড়।
সচরাচর এরা মৃদু স্বরে পুনঃপুনঃ ডাকে চিট চিট এবং গলা ছেড়ে কোমল কণ্ঠে গায় – সি সি সিসিক সিসিক সিক সিক। ছেলেপাখি গান গায়, মাথা নত করে এবং এর হলুদ ঠোঁট এবং চাঁদি দেখায়। জুন সেপ্টেম্বর মাসে প্রজনন মৌসুমে পানির ধারে উঁচু ঘাস কিংবা নলে পাতা ও ঘাসের সূক্ষ লম্বা ফালি দিয়ে ঝোলানো বাসা বুনিয়ে এরা ২-৪টি ডিম পাড়ে।
বিস্তৃতি- বাংলা বাবুই বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি, ঢাকা ও সিলেট বিভাগের হাওর এবং বড় পাড়ে পাওয়া যায়। বিশ শতকের মাঝামাঝি কাল পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ছিল এমন তথ্য রয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা – বাংলা বাবুই বিশ্বে বিপদমুক্ত এবং বাংলাদেশে অপ্রতুল-তথ্য শ্রেণীতে রয়েছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা বাবুইএর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার বাবুই (গ্রিক plokeus=বাবুই, benghalensis=বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্র নেট হতে সংগৃহীত।
৯) বাংলা ঘাসপাখি, Rufous-rumped Grassbird , Graminicola bengalensis
বর্ণনা- বাংলা ঘাসপাখি একটি ডোরাযুক্ত লালচে-বাদামি পোকা-শিকারি পাখি ( দৈর্ঘ্য ১৬ সেমি, ডানা ৬ সেমি, ঠোঁট ১.৪ সেমি, পা ২.৪ সেমি, লেজ ১৪.৭ সেমি)। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির লালচে-বাদামি পিঠে মোটা কালো লম্বা দাগ থাকে, তবে কোমর ও ডানায় রয়েছে লালচে রঙের দাগ। এর ঘাড়ের পিছনের লম্বা সাদা দাগ কিংবা পীত বর্ণের, ভ্রু-রেখা সাদা, দেহতলের অধিকাংশ সাদা কিন্তু বগল ও বুকের পাশ লালচে-পীত বর্ণের, ঘোর কালচে-বাদামি প্রশস্ত লেজের আগা সাদা, এর অনেকাংশ নিচে থেকে দেখা যায়, চোখ লালচে-বাদামি, পা ও পায়ের পাতা মেটে-বাদামি এবং ঠোঁট বাদামি। ৩ টি উপপ্রজাতির মধ্যে G.b.bengalensis বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
স্বভাব- বাংলা ঘাসপাখি সাধারণত পানির ধারের নল ও উঁচু ঘাসে বিচরণ করে, খুব নিভৃতচারী ও দিবাচর পাখি। প্রজনন মৌসুম ছাড়া সচরাচর ঘন ঘাসে লুকিয়ে থাকে। ভুম, নলের ঝোপ ও ঘাসে খাবার খোঁজে।
খাদ্যতালিকায় রয়েছে পোকামাকড়। বিরক্ত হলে অনিচ্ছায় ঘাসের আড়াল ছেড়ে সামান্য উড়ে ঘাসে লুকিয়ে থাকে। প্রজনন মৌসুম ছাড়া ডাকে- এর- উয়িট-উয়িট-উয়িট। জুলাই-আগস্ট মাসে প্রজননকালে ছেলেপাখি নলের চূড়া থেকে শ্রুতিকটু গান গায় এবং নলের উপর দিয়ে ওড়ার সময় একটু করে গান ধরে।
গভীর জলে দণ্ডায়মান ঘন ঘাসে নলখাগড়া এবং উদ্ভিদের আঁশের উপর সূক্ষ ঘাসের শিকড় বিছিয়ে গভীর বাটির মত বাসা বানিয়ে এরা ডিম পাড়ে। ডিমগুলো সাদা, সংখ্যায় ৪টি, মাপ ১.৭ x ১.৪ সেমি।
বিস্তৃতি- বাংলা ঘাসপাখি বাংলাদেশের বিরল আবাসিক পাখি, প্রধানত সিলেট বিভাগের হাওরের চারপাশের নলে পাওয়া যায় এবং উনিশ শতকে ঢাকা বিভাগে ছিল এমন তথ্য আছে। ভারত, নেপাল, দক্ষিণ-পূর্ব চীন, মিয়ানমার ও ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ, পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা- বাংলা ঘাসপাখি বিশ্বের প্রায় বিপদগ্রস্ত এবং বাংলাদেশে অপ্রতুল-তথ্য শ্রেণীতে রয়েছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ- বাংলা ঘাসপাখির বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ বাংলার ঘাসপাখি( ল্যাতিন graminis =ঘাস, bengalensis= বাংলার)
ব্যবহৃত আলোকচিত্র নেট হতে সংগৃহীত।
১০) বাংলা হুতোমপ্যাঁচা, Indian Eagle-Owl, Bubo bengalensis
অতিকায় এই পেঁচাটিকে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে দেখা যায় নি, এমনকি কোন দিন বাংলাদেশে ছিল কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, তবে কাছাকাছি অঞ্চলে হিসেবে ভারতের আসামে বাংলা পেঁচাকে দেখা গেছে। যদি কোনদিন বাংলাদেশে তার আগমনের প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তাকে নিয়েও অন্যদের মত তথ্যময় ফিচার আসবে আশা রাখি। ব্যবহৃত আলোকচিত্র নেট হতে সংগৃহীত।
১১) Red-cheeked Cordonbleu, Uraeginthus bengalus
এই রূপবান ক্ষুদে পাখিটির নাম বাংলার নামে রাখা হলেও বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে পাখিটি আফ্রিকান সাহারা অঞ্চলের! কোন ভাবে বিজ্ঞানীদের ভ্রান্ত ধারণা হয়েছিল যে পাখিটি বাংলার! ব্যবহৃত চিত্রকর্মটি নেট থেকে সংগৃহীত।
সুত্রঃhttp://bornelegant.wordpress.com/2012/05/19/
২৯ মার্চ, ২০১২
ফাতু-হিভা , আমার প্রিয় বই
•
বিস্তারিত পড়ুন ... »
ফাতু-হিভা, আমাদের গ্রহের স্বর্গ। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে, আর
সব দেশ-মহাদেশের বাঁধন ছিন্ন করে অতল নীল মহাসাগরের বুকে ফুঁড়ে ওঠা চির
সবুজে ছাওয়া পাথর-মাটি মেশানো কয়েকটি একরত্তি দ্বীপের সমাহার।
পলিনেশিয়ায় অবস্থিত, তাহিতির খুব কাছের মারেক্কস দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত
ত্রিভুবনের অমরাবতী।
নরওয়ের পাঁশুটে শহরজীবনের উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে এক সোনালীচুলো যুবক ঠিক করল সারা জীবনের জন্য চলে যাবে এই শহর আর কৃত্রিম সভ্যতা ছেড়ে, ফিরে যাবে প্রকৃতির কোলে, যেখানে সময় অফুরন্ত, নেই অপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য নগ্ন হাহাকারময় চাহিদা, জীবন যাপনের অত্যাবশ্যকীয় আহার, পানীয়ের নুন্যতম সংস্থান হলেই খুশী থাকে সবাই। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বজ্রের দেবতা থরের নামে নাম এই যুবকের থর হেয়ারডাল। অনেক হিসাব নিকাশ কষে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে রওনা দিলেন এই স্বর্গ পানে, কোন দিন লোকসমাজে না ফেরার প্রতিজ্ঞা নিয়ে। তাকে নিয়ে অবশ্য একটি লেখা লিখেছিলাম সচলে আগে।
সারা বিশ্ব পরবর্তীতে থর হেয়ারডালকে চিনেছে প্রাতঃস্মরণীয় অভিযাত্রী, নৃতত্ত্ববিদ, লেখক হিসেবে। কন-টিকি, রা, ইউফ্রেতিস প্রমুখ দুঃসাহসী অভিযানের দলনেতা হিসেবে। কোটি কোটি মানুষের ধারণা ভুল প্রমানিত করে স্রেফ বালসা কাঠের তৈরি ভেলায় আধুনিক সাজ-সরঞ্জাম ছাড়াই পাড়ি দিলেন প্রশান্ত মহাসাগরের বিপুল বিক্ষুদ্ধ জলরাশি, প্রমাণ করার চেষ্টা চালালেন আদি রেড ইন্ডিয়ানরা অনেক আগেই ল্যাতিন আমেরিকা থেকে একই ভাবে ভেলার মাধ্যমে যেয়ে বসতি গেড়েছিল পলিনেশিয়ায়। একই চেতনায় নলখাগড়া দিয়ে নৌকা বানিয়ে পাড়ি দিলেন আটলান্টিক মহাসাগর, দেখাতে চাইলেন প্রাচীন মিশরীয় ও মায়া সভ্যতার মধ্যকার মেলবন্ধন কিন্তু ফাতু-হিভা ছিল তার প্রথম যাত্রা- নিজের সন্ধানে, জ্ঞানের জিগীষায়, প্রকৃতির খোঁজে।
১৯৩৮ সালে নরওয়েজিয়ান ভাষায় প্রকাশিত হয় ফাতু-হিভা, ২য় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে আন্তর্জাতিক মহলের চোখে পড়বার আগেই লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায় এই মহান আলেখ্য, অনেক অনেক দশক পরে ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয় তা ইংরেজিতে। ব্যস, ভিনি, ভিডি, ভিসি- কোটি কোটি পাঠকের মনে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে বসল তার সেই স্মৃতিচারণা।
থরের ঝুলিতে ছিল মুক্তোঝরা ভাষা, অভিজ্ঞ ডুবুরীর মত মনের শব্দ ভাণ্ডারের অতলে ডুব দিয়ে অনায়াসে নানা মূল্যবান শব্দ সম্ভার তুলে এনে শিল্পীর অপরিসীম দক্ষতায় ছুঁয়ে ছেনে পরিমাপমত একের পর এক স্বচ্ছ দ্যুতিশীল মায়াময় শব্দ বসিয়ে নির্মাণ করেছেন কল্পলোকের সাহিত্যদুর্গ। সেই অবারিত দ্বিধাহীন পথ বেয়ে আমিও চলে গিয়েছি অজস্রবার স্বপ্নের দ্বীপপুঞ্জে, যেখানে সবুজ নারকেল পাতার চিরল বাতাসে কেপে ওঠে ভোরের মৃদু আলো, দিগন্তে আকাশ আর সাগরের মিলনস্থানে কেবলই মন ভুলানো নীলের সহাবস্থান, দীঘল ঘাসের বনে সরসর করে ছুটে যায় মুক্ত হাওয়া, গতিতে তার বুনো ঘোড়ার উদ্যমের প্রাচুর্য, নিশিরাতে নিশাচর পাখির শব্দ ছাড়া সমস্ত বিশ্ব চরাচর নিস্তব্ধ, আকাশগঙ্গার অনন্ত নক্ষত্র বীথি নেমে আসে আমার মাথায় চাঁদোয়া খাটিয়ে দিতে প্রতিদিন সেই দূষণমুক্ত আকাশে।
তার শব্দ বিন্যাস আর রচনাগুণে নিশিগ্রস্ত মানুষের মত আমি ভিড়ে যাই থর আর তার স্ত্রী লিভের দলে, সমস্ত ধরনের কোলাহল থেকে যোজন যোজন দূরে এসে প্রথম সন্ধ্যায় তাবু খাটায় তারা, নক্ষত্রের আগুনে আলোকিত নিবিড় শান্তিময় মধ্যরাতে হঠাৎ কামানের গোলা পতনের শব্দে হতচকিত করে তোলে সবাইকে, সন্ধান করে পাওয়া যায় ঝড়ো বাতাসে উপর থেকে খসে পড়েছে ঝুনো নারকেল! নিরীহ দর্শন নারকেলগুচ্ছকে এমন মৃত্যুদূতের ভূমিকায় দেখে নিরাপদ স্থানে তাঁবু সরিয়ে ফেলে তারা, প্রথমবারের মত বিপদের সম্মুখীন হয়ে সেই পুরনো বাণী উদয় হয় তাদের চিন্তা মাঝে- স্বর্গেও সাপ আছে!!
আদিম জীবনে ফিরে যাবার প্রানান্তকর চেষ্টা চালায় তরুণ দম্পতি, লজ্জা নিবারণের যৎসামান্য আবরণ ধারণ করেই ক্ষুন্নিবৃত্তি মেটাবার তাগিদে ফল আহরণ ও মাছ শিকারে সচেষ্ট হয় তারা, রূপকথার আদম- ইভের মত। কিন্তু স্বর্গে একা নয় তারা, আছে স্থানীয় আদিবাসীরা, যারা দেখাতে লাগল মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ এই পাগলাটে শ্বেতকায়দের ব্যাপারে, নিরিবিলি স্বেচ্ছা নির্বাসনের মূল ধারণাই ভেস্তে যায় বুঝি!
ক্রান্তীয় জঙ্গলের গভীরে কুঁড়ে বানালেন বাঁশ কেটে, ঘর ছাইলেন পাতা দিয়ে, শুরু হল অন্য ধরনের সংসার জীবন। উৎপাত হিসেবে চলতে থাকল পাগল করা জীবাণু পরিবহনকারী মশার কামড়, প্রতিকূল আবহাওয়া, অন্যান্য রোগের সংক্রমণ। সেই সাথে স্থানীয়দের অসহযোগিতা।
অবশেষে কুঁড়ে ছেড়ে অন্য দ্বীপে যেয়ে তারা পাথরের গুহার আশ্রয় নেন। একইসাথে নানা দ্বীপের আদিবাসীদের সংশ্রবে এসে তাদের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণার আগ্রহ জন্ম নেয় থরের মনে, সেখানে প্রাপ্ত প্রাচীন মাথার খুলি ও লোকগাথায় ল্যাতিন আমেরিকার সাথে অদ্ভুত সাদৃশ্য খুঁজে পান তিনি, বিশাল সব নির্বাক প্রস্তর মূর্তি দেখে মাথার ভেতরে প্রশ্ন ফেনিয়ে ওঠে তাহলে কি প্রচলিতমতের পূর্ব এশিয়া নয়, দক্ষিণ আমেরিকাই এই দ্বীপবাসীদের আদি বাসস্থান।
সেখানে দেড় বছরের অবস্থানের এক ফাঁকে স্বপ্নদ্বীপ তাহিতি গিয়েছিলেন তিনি, মালিক বনেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী রাইফেলের, কারণ সেই রাইফেলের কাঠের কুঁদোতে যে রঙচঙে ছবি আঁকা ছিল তা এঁকেছিলেন স্বয়ং পল গগ্যাঁ! ইম্প্রেশনিজমের দিকপাল এই ফরাসী চিত্রকর তার জীবনের সেরা কাজগুলো সবই করেছিলেন আলো ঝলমলে তাহিতিতে, তার সমাধিও এইখানে অবস্থিত। পরে এক বেরসিক কাস্টমস কর্মকর্তা নিরাপত্তার দোহাই দেখিয়ে রাইফেলের কুঁদোটি খুলে নেয়, লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায় সেই বিশ্ব সম্পদ।
এমন ভাবে আরব্যপন্যাসের জাদুকরের মত বইয়ের খসখসে পাতায় নির্বাক পিঁপড়ার সারির মত কালো কালো অক্ষরগুলো থেকে লাল-নীল-সবুজ বর্ণময় ছন্দময় কাহিনীর জন্ম নেয় একের পর এক থরের বর্ণনার গুণে। আমাদের চারপাশের চেনা জগত একনিমিষে রঙধনুর সপ্তবর্ণা ত্রান্তীয় অঞ্চলে পরিণত হয়।
নরখাদকদের সাথেও পরিচয় ঘটে তাদের, বাস করতে হয় একই সবুজ উপত্যকায় প্রতিবেশী হিসেবে, গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তাদের জীবনধারা। পান ভবিষ্যৎ গবেষণার পর্যাপ্ত রসদ, যা তাকে ব্যস্ত রাখে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
বইটির শেষ পর্যায়ে এসে ফেলে আসা শহুরে জীবনের টানে উম্মুখ হয়ে পড়েন তরুণ দম্পতি, যতটা না সেই নিরাপদ জীবনের আরাম-আয়েশের জন্য, তার চেয়ে বেশী এখানকার নানা সমস্যার কারণে।
থর ফিরে আসেন নরওয়েতে, রেখে যান তার লিগ্যাসি। আর এক অমূল্য স্মৃতিকথা, যা আমার মত পাঠকদের দিবারাত্রি নিয়ে যায় দক্ষিণের সেই স্বর্গে। ফাতু-হিভার কাছে আমার অপরিসীম কৃতজ্ঞতা জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার প্রেরণা দেবার জন্য, নতুন নতুন অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়বার জন্য, সর্বোপরি জীবনকে ও আমাদের সুন্দর গ্রহটাকে ভালবাসতে শেখাবার জন্য।
সুত্রঃhttp://www.sachalayatan.com/tareqanu/43215
নরওয়ের পাঁশুটে শহরজীবনের উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে এক সোনালীচুলো যুবক ঠিক করল সারা জীবনের জন্য চলে যাবে এই শহর আর কৃত্রিম সভ্যতা ছেড়ে, ফিরে যাবে প্রকৃতির কোলে, যেখানে সময় অফুরন্ত, নেই অপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য নগ্ন হাহাকারময় চাহিদা, জীবন যাপনের অত্যাবশ্যকীয় আহার, পানীয়ের নুন্যতম সংস্থান হলেই খুশী থাকে সবাই। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বজ্রের দেবতা থরের নামে নাম এই যুবকের থর হেয়ারডাল। অনেক হিসাব নিকাশ কষে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে রওনা দিলেন এই স্বর্গ পানে, কোন দিন লোকসমাজে না ফেরার প্রতিজ্ঞা নিয়ে। তাকে নিয়ে অবশ্য একটি লেখা লিখেছিলাম সচলে আগে।
সারা বিশ্ব পরবর্তীতে থর হেয়ারডালকে চিনেছে প্রাতঃস্মরণীয় অভিযাত্রী, নৃতত্ত্ববিদ, লেখক হিসেবে। কন-টিকি, রা, ইউফ্রেতিস প্রমুখ দুঃসাহসী অভিযানের দলনেতা হিসেবে। কোটি কোটি মানুষের ধারণা ভুল প্রমানিত করে স্রেফ বালসা কাঠের তৈরি ভেলায় আধুনিক সাজ-সরঞ্জাম ছাড়াই পাড়ি দিলেন প্রশান্ত মহাসাগরের বিপুল বিক্ষুদ্ধ জলরাশি, প্রমাণ করার চেষ্টা চালালেন আদি রেড ইন্ডিয়ানরা অনেক আগেই ল্যাতিন আমেরিকা থেকে একই ভাবে ভেলার মাধ্যমে যেয়ে বসতি গেড়েছিল পলিনেশিয়ায়। একই চেতনায় নলখাগড়া দিয়ে নৌকা বানিয়ে পাড়ি দিলেন আটলান্টিক মহাসাগর, দেখাতে চাইলেন প্রাচীন মিশরীয় ও মায়া সভ্যতার মধ্যকার মেলবন্ধন কিন্তু ফাতু-হিভা ছিল তার প্রথম যাত্রা- নিজের সন্ধানে, জ্ঞানের জিগীষায়, প্রকৃতির খোঁজে।
১৯৩৮ সালে নরওয়েজিয়ান ভাষায় প্রকাশিত হয় ফাতু-হিভা, ২য় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে আন্তর্জাতিক মহলের চোখে পড়বার আগেই লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায় এই মহান আলেখ্য, অনেক অনেক দশক পরে ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয় তা ইংরেজিতে। ব্যস, ভিনি, ভিডি, ভিসি- কোটি কোটি পাঠকের মনে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে বসল তার সেই স্মৃতিচারণা।
থরের ঝুলিতে ছিল মুক্তোঝরা ভাষা, অভিজ্ঞ ডুবুরীর মত মনের শব্দ ভাণ্ডারের অতলে ডুব দিয়ে অনায়াসে নানা মূল্যবান শব্দ সম্ভার তুলে এনে শিল্পীর অপরিসীম দক্ষতায় ছুঁয়ে ছেনে পরিমাপমত একের পর এক স্বচ্ছ দ্যুতিশীল মায়াময় শব্দ বসিয়ে নির্মাণ করেছেন কল্পলোকের সাহিত্যদুর্গ। সেই অবারিত দ্বিধাহীন পথ বেয়ে আমিও চলে গিয়েছি অজস্রবার স্বপ্নের দ্বীপপুঞ্জে, যেখানে সবুজ নারকেল পাতার চিরল বাতাসে কেপে ওঠে ভোরের মৃদু আলো, দিগন্তে আকাশ আর সাগরের মিলনস্থানে কেবলই মন ভুলানো নীলের সহাবস্থান, দীঘল ঘাসের বনে সরসর করে ছুটে যায় মুক্ত হাওয়া, গতিতে তার বুনো ঘোড়ার উদ্যমের প্রাচুর্য, নিশিরাতে নিশাচর পাখির শব্দ ছাড়া সমস্ত বিশ্ব চরাচর নিস্তব্ধ, আকাশগঙ্গার অনন্ত নক্ষত্র বীথি নেমে আসে আমার মাথায় চাঁদোয়া খাটিয়ে দিতে প্রতিদিন সেই দূষণমুক্ত আকাশে।
তার শব্দ বিন্যাস আর রচনাগুণে নিশিগ্রস্ত মানুষের মত আমি ভিড়ে যাই থর আর তার স্ত্রী লিভের দলে, সমস্ত ধরনের কোলাহল থেকে যোজন যোজন দূরে এসে প্রথম সন্ধ্যায় তাবু খাটায় তারা, নক্ষত্রের আগুনে আলোকিত নিবিড় শান্তিময় মধ্যরাতে হঠাৎ কামানের গোলা পতনের শব্দে হতচকিত করে তোলে সবাইকে, সন্ধান করে পাওয়া যায় ঝড়ো বাতাসে উপর থেকে খসে পড়েছে ঝুনো নারকেল! নিরীহ দর্শন নারকেলগুচ্ছকে এমন মৃত্যুদূতের ভূমিকায় দেখে নিরাপদ স্থানে তাঁবু সরিয়ে ফেলে তারা, প্রথমবারের মত বিপদের সম্মুখীন হয়ে সেই পুরনো বাণী উদয় হয় তাদের চিন্তা মাঝে- স্বর্গেও সাপ আছে!!
আদিম জীবনে ফিরে যাবার প্রানান্তকর চেষ্টা চালায় তরুণ দম্পতি, লজ্জা নিবারণের যৎসামান্য আবরণ ধারণ করেই ক্ষুন্নিবৃত্তি মেটাবার তাগিদে ফল আহরণ ও মাছ শিকারে সচেষ্ট হয় তারা, রূপকথার আদম- ইভের মত। কিন্তু স্বর্গে একা নয় তারা, আছে স্থানীয় আদিবাসীরা, যারা দেখাতে লাগল মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ এই পাগলাটে শ্বেতকায়দের ব্যাপারে, নিরিবিলি স্বেচ্ছা নির্বাসনের মূল ধারণাই ভেস্তে যায় বুঝি!
ক্রান্তীয় জঙ্গলের গভীরে কুঁড়ে বানালেন বাঁশ কেটে, ঘর ছাইলেন পাতা দিয়ে, শুরু হল অন্য ধরনের সংসার জীবন। উৎপাত হিসেবে চলতে থাকল পাগল করা জীবাণু পরিবহনকারী মশার কামড়, প্রতিকূল আবহাওয়া, অন্যান্য রোগের সংক্রমণ। সেই সাথে স্থানীয়দের অসহযোগিতা।
অবশেষে কুঁড়ে ছেড়ে অন্য দ্বীপে যেয়ে তারা পাথরের গুহার আশ্রয় নেন। একইসাথে নানা দ্বীপের আদিবাসীদের সংশ্রবে এসে তাদের উৎপত্তি নিয়ে গবেষণার আগ্রহ জন্ম নেয় থরের মনে, সেখানে প্রাপ্ত প্রাচীন মাথার খুলি ও লোকগাথায় ল্যাতিন আমেরিকার সাথে অদ্ভুত সাদৃশ্য খুঁজে পান তিনি, বিশাল সব নির্বাক প্রস্তর মূর্তি দেখে মাথার ভেতরে প্রশ্ন ফেনিয়ে ওঠে তাহলে কি প্রচলিতমতের পূর্ব এশিয়া নয়, দক্ষিণ আমেরিকাই এই দ্বীপবাসীদের আদি বাসস্থান।
সেখানে দেড় বছরের অবস্থানের এক ফাঁকে স্বপ্নদ্বীপ তাহিতি গিয়েছিলেন তিনি, মালিক বনেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে দামী রাইফেলের, কারণ সেই রাইফেলের কাঠের কুঁদোতে যে রঙচঙে ছবি আঁকা ছিল তা এঁকেছিলেন স্বয়ং পল গগ্যাঁ! ইম্প্রেশনিজমের দিকপাল এই ফরাসী চিত্রকর তার জীবনের সেরা কাজগুলো সবই করেছিলেন আলো ঝলমলে তাহিতিতে, তার সমাধিও এইখানে অবস্থিত। পরে এক বেরসিক কাস্টমস কর্মকর্তা নিরাপত্তার দোহাই দেখিয়ে রাইফেলের কুঁদোটি খুলে নেয়, লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায় সেই বিশ্ব সম্পদ।
এমন ভাবে আরব্যপন্যাসের জাদুকরের মত বইয়ের খসখসে পাতায় নির্বাক পিঁপড়ার সারির মত কালো কালো অক্ষরগুলো থেকে লাল-নীল-সবুজ বর্ণময় ছন্দময় কাহিনীর জন্ম নেয় একের পর এক থরের বর্ণনার গুণে। আমাদের চারপাশের চেনা জগত একনিমিষে রঙধনুর সপ্তবর্ণা ত্রান্তীয় অঞ্চলে পরিণত হয়।
নরখাদকদের সাথেও পরিচয় ঘটে তাদের, বাস করতে হয় একই সবুজ উপত্যকায় প্রতিবেশী হিসেবে, গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তাদের জীবনধারা। পান ভবিষ্যৎ গবেষণার পর্যাপ্ত রসদ, যা তাকে ব্যস্ত রাখে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
বইটির শেষ পর্যায়ে এসে ফেলে আসা শহুরে জীবনের টানে উম্মুখ হয়ে পড়েন তরুণ দম্পতি, যতটা না সেই নিরাপদ জীবনের আরাম-আয়েশের জন্য, তার চেয়ে বেশী এখানকার নানা সমস্যার কারণে।
থর ফিরে আসেন নরওয়েতে, রেখে যান তার লিগ্যাসি। আর এক অমূল্য স্মৃতিকথা, যা আমার মত পাঠকদের দিবারাত্রি নিয়ে যায় দক্ষিণের সেই স্বর্গে। ফাতু-হিভার কাছে আমার অপরিসীম কৃতজ্ঞতা জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার প্রেরণা দেবার জন্য, নতুন নতুন অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়বার জন্য, সর্বোপরি জীবনকে ও আমাদের সুন্দর গ্রহটাকে ভালবাসতে শেখাবার জন্য।
সুত্রঃhttp://www.sachalayatan.com/tareqanu/43215
বিশ্বের সবচেয়ে বড়/সেরা ৫ সমুদ্রবন্দর
•

আগেই বলে নেয়া ভাল যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেরা সমুদ্র বন্দরগুলোর বেশির ভাগই চায়নাতে অবস্থিত। আর এগুলো যে শুধু বড় তা নয়; সবচেয়ে ব্যস্থতমও বটে।
আসুন জেনে নেই তাহলে এগুলো বন্দরের খবর।
১। Shanghai (China)
বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র বন্দরগুলোর মধ্যে সবার উপরে অবস্থান। ২০১০ সালের পরিসংখ্যান মতে, একমাত্র এই বন্দর (একইসাথে সমুদ্র এবং নদী) থেকেই ২৯ মিলিয়ন টি ই ইউ হ্যান্ডেল করা হয়েছিল। য গত বছর গুলোর তুলনায় অনেক বেশী।

Yangtze নদীকে ঘিরেই এখানে এত বড় ইকোনমিক সমৃদ্ধি গড়ে উঠেছে।
২। Ningbo-Zhoushan (China)
Ningbo এবং Zhoushan এই দুই যৌথ বন্দরকে ঘিরেই এর নামকরণ করা হয় ২০০৬ সালে। যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র বন্দরগুলোর মধ্যে ২য় অবস্থানে আছে।

৩। Singapore
সিংগাপুর বন্দর বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়াতে এখন এই বন্দর বিশ্বের ৩য় অবস্থানে আছে।

সিংগাপুর বন্দরটি ১০০ টির অধিক দেশের ছড়িয়ে থাকা ৬০০ টি বন্দরের সাথে যুক্ত আছে।
৪। Rotterdam (নেদারল্যান্ড)
সারা ইউরোপের একমাত্র বন্দর যা ৪র্থ অবস্থানে রয়েছে। ১৯৬২ – ২০০৪ সাল পর্যন্ত এই বন্দর বিশ্বের সবচেয়ে বড় বন্দর হিসেবে ১ নম্বর স্থানে অবস্থা করেছিল।

৫। Tianjin (China)
এই বন্দরের অবস্থান Haihe নদীর সাথে। বর্তমানে এই বন্দরের সাথে সারা বিশ্বে প্রায় ২০০ টি দেশের ৪০০ টি বন্দর সংযুক্ত। পুরো চায়নাতে এই বন্দরের অবস্থান ৩য় তে।

সুত্রঃhttp://www.somewhereinblog.net/blog/mahbub154/29539338
বিস্তারিত পড়ুন ... »
আগেই বলে নেয়া ভাল যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেরা সমুদ্র বন্দরগুলোর বেশির ভাগই চায়নাতে অবস্থিত। আর এগুলো যে শুধু বড় তা নয়; সবচেয়ে ব্যস্থতমও বটে।
আসুন জেনে নেই তাহলে এগুলো বন্দরের খবর।
১। Shanghai (China)
বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র বন্দরগুলোর মধ্যে সবার উপরে অবস্থান। ২০১০ সালের পরিসংখ্যান মতে, একমাত্র এই বন্দর (একইসাথে সমুদ্র এবং নদী) থেকেই ২৯ মিলিয়ন টি ই ইউ হ্যান্ডেল করা হয়েছিল। য গত বছর গুলোর তুলনায় অনেক বেশী।
Yangtze নদীকে ঘিরেই এখানে এত বড় ইকোনমিক সমৃদ্ধি গড়ে উঠেছে।
২। Ningbo-Zhoushan (China)
Ningbo এবং Zhoushan এই দুই যৌথ বন্দরকে ঘিরেই এর নামকরণ করা হয় ২০০৬ সালে। যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র বন্দরগুলোর মধ্যে ২য় অবস্থানে আছে।
৩। Singapore
সিংগাপুর বন্দর বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়াতে এখন এই বন্দর বিশ্বের ৩য় অবস্থানে আছে।
সিংগাপুর বন্দরটি ১০০ টির অধিক দেশের ছড়িয়ে থাকা ৬০০ টি বন্দরের সাথে যুক্ত আছে।
৪। Rotterdam (নেদারল্যান্ড)
সারা ইউরোপের একমাত্র বন্দর যা ৪র্থ অবস্থানে রয়েছে। ১৯৬২ – ২০০৪ সাল পর্যন্ত এই বন্দর বিশ্বের সবচেয়ে বড় বন্দর হিসেবে ১ নম্বর স্থানে অবস্থা করেছিল।
৫। Tianjin (China)
এই বন্দরের অবস্থান Haihe নদীর সাথে। বর্তমানে এই বন্দরের সাথে সারা বিশ্বে প্রায় ২০০ টি দেশের ৪০০ টি বন্দর সংযুক্ত। পুরো চায়নাতে এই বন্দরের অবস্থান ৩য় তে।
সুত্রঃhttp://www.somewhereinblog.net/blog/mahbub154/29539338
৩০ নভে, ২০১১
ঢাকার মজার কিছু খাবার দোকান এবং ঠিকানা
•

আমি একজন ভোজনরসিক মানুষ। আমি খেতে খুবই পছন্দ করি। সুযোগ পেলেই আমি ভালো কিছু খাবারের জন্য বেরিয়ে পড়ি। সেই সুবাদে আমি ঢাকা শহরের এমন কিছু দোকানের মুখরোচক খাবার খেয়েছি, যা খেলে যে কোন মানুষের বার বার সেই খাবার খাওয়ার লোভ আসতে বাধ্য। এখন আমি আমার ব্লগার বন্ধুদের কাছে এমন কয়েকটি বাংলা খাবারের দোকানের খাবার এর বর্ণনা করছি, যে সব দোকানে সবারই একবার করে হলেও যাওয়া উচিত মজাদার খাবারের আসল মজা বোঝার জন্য। আমার বিশ্বাস এই দোকানগুলোর আমার উল্লেখিত খাবারগুলো একবার খেলে বারবার খেতে যেতেই হবে…………………………………..
১. “নান্না বিরিয়ানি” এর নাম শুনেনি এমন মানুষ খুব কমই আছে। এই দোকানটির মতো “মোরগ-পোলাও” বাংলাদেশের আর কোন দোকান বানাতে পারে কি না ?? আমি বলতে পারবো না। এই দোকানটির “মোরগ-পোলাও” এর যে স্বাদ তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। অনাসায়ে যে কেও একবৈঠকে দুটি “মোরগ-পোলাও” শেষ করে ফেলতে পারবে। “মোরগ-পোলাও” এর ঝোলের যেই স্বাদ, তা এককথায় অমৃত এর কাছাকাছি। সেই সাথে এই দোকানের বোরহানীটাও মজার।
বর্তমান দাম:- মোরগ-পোলাও = ৮০ টাকা, বোরহানী = ১৫ টাকা।
ঠিকানা:- এই মোট ৪টি শাখা রয়েছে। ৪টি শাখাই পুরনো ঢাকায় অবস্হিত। কিন্তু প্রথম এবং মেইন দোকানটির সাথে এর শাখাগুলোর রান্না এর কিছু পার্থক্য আছে। তাই যারা আসল স্বাদ নিতে চান তারা চলে যান এর প্রথম শাখায়। দোকানটি বেচারাম দেউরীতে অবস্হিত। যেতে হলে যাবেন তারা মসজিদে। সেখান থেকে “নান্না বিরিয়ানি” দেখা যায়। তারা মসজিদে সরাসরি যেতে না পারলে চলে যান কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখান থেকে তারা মসজিদে যেতে ১৫ টাকা রিকশা ভাড়া লাগে।
২. খুবই খুবই মজাদার “কাচ্চি বিরিয়ানী” খেতে চান ? ভুলে যান দামী ফখরুদ্দীন বিরিয়ানী অথবা ষ্টার বিরিয়ানী এর কথা। চলে যান “সুনামী রেস্তোরা”য়। ভাই বিশ্বাস করুন এত মজার “কাচ্চি বিরিয়ানী” আর কোথাও পাবেন কি না ? জানি না। সেরকম একটা “কাচ্চি বিরিয়ানী” পাওয়া যায় এই দোকানে।
বর্তমান দাম:- কাচ্চি বিরিয়ানী = ৮৫ টাকা, বোরহানী ফ্রী।
ঠিকানা:- ধানমন্ডির ঝিগাতলা বাসষ্ট্যান্ড এর বিপরীতে এই রেস্তোরা। ধানমন্ডির ঝিগাতলা বাসষ্ট্যান্ড এ গিয়ে কাউকে বললেই দেখিয়ে দিবে।
৩. “ভোলা ভাই বিরিয়ানি” এই দোকানটির গরুর চাপ এর বিরিয়ানি একবার হলেও খেয়ে দেখবেন। হালকা ঝাল দিয়ে বানানো এই বিরিয়ানী আপনার অবশ্যই ভালো লাগবে।
বর্তমান দাম:- গরুর চাপ = ৭৫ টাকা, বোরহানী = ১৫ টাকা।
ঠিকানা:- প্রথমে যাবেন খিঁলগাও রেলগেটে। সেখান থেকে খিঁলগাও-গোড়ান এর দিকে যে রাস্তা নেমে গেছে, সেই রাস্তা দিয়ে আস্তে আস্তে ৪-৫ মিনিট হাঁটলেই হাতের বামে দোকানটি দেখতে পাবেন।
৪. “মুক্তা বিরিয়ানি” এই দোকানটির গরুর চাপ এর বিরিয়ানি কিন্তু খিঁলগাও এলাকায় খুবই বিখ্যাত। এই দোকানের গরুর চাপ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর আগুন ঝাল এবং মসলার স্বাদ। আপনাদের ভালো লাগবে আশা করি।
বর্তমান দাম:- গরুর চাপ = ৭০ টাকা, বোরহানী = ১০ টাকা।
ঠিকানা:- গোরান টেম্পুস্ট্যান্ড এর আগে হাড়ভাঙ্গা রোডে।
৫. ভূনা খিচুরী খেতে অনেকেই ভালোবাসেন। যদি আপনি ঢাকা শহরের সবচেয়ে মজার ভূনা খিচুরী খেতে চান, তাহলে চলে যান “ঘরোয়া হোটেল” এ। এখানে আপনি ঢাকা শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং মজাদার ভূনা খিচুরী পাবেন। দামটা একটু বেশী মনে হলেও খাওয়ার পর এই দাম কিছুই মনে হবে না।
বর্তমান দাম:- ভূনা খিচুরী = ১২০ টাকা, বোরহানী = ২০ টাকা।
ঠিকানা:- শাপলা চত্বর থেকে মধুমিতা সিনেমা হল যাওয়ার সময় মধুমিতা সিনেমা হল এর একটু আগে।
ভালো থাকবেন। আপনার খোজেঁ অন্য কোন মজার খাবার দোকানের সন্ধান থাকলে অবশ্যই জানাবেন।
part 2

বেশ কয়েকদিন আগে ঢাকার বিখ্যাত এবং মজাদার খাবারের কিছু দোকান নিয়ে একটা পোষ্ট দিয়েছিলাম। অনেক ব্লগার ভাইয়া-আপুরা সেই পোষ্টে আরো নানা খাবারের দোকান এর খোঁজ দিয়েছিলেন। এমনকি ঢাকার বাইরের অনেক খাবারের দোকান সম্পর্কেও অনেকে লিখেছিলেন। সব মিলিয়ে অনেক বড় লিস্ট হয়েছে। তাই ভাবলাম সবাই যে যে খাবারের সন্ধান দিলেন তা এক করে ফেললেই তো পারি। এতে আমার নিজের তো বটেই, আমার মতো অনেক ভোজন রসিকদের উপকার। অনেকটা “ বাংলার মিনি ফুড ডিকশনারী ” টাইপের। কাজটি করেই ফেললাম। স্বীকার করছি ঢাকার বাইরের যে খাবারের সন্ধান দেয়া আছে সংখ্যাতে তা অত্যন্ত হাস্যকর। ঢাকার বাইরে মোট ৬৩টি জেলা রয়েছে। সব জেলাতেই রয়েছে নিজস্ব মজার এবং বিখ্যাত খাবার। কিন্তু সেসবের সন্ধান শুধুমাত্র নিজ নিজ এলাকার বাসিন্দারাই দিতে পারেন। যাই হোক এখানে আমার সেই পোষ্টে যত খাবারের সন্ধানসহ লোকেশন দেওয়া হয়েছিলো তা দেয়া আছে। বিশাল বড় তালিকা। আমি তো খুশিতে বাক বাকুম। দেখুন কেমন লাগে……….
ঢাকার মধ্যের খাবার……………..
১. বেচারাম দেউরীতে অবস্হিত নান্না বিরিয়ানি এর মোরগ-পোলাও
২. ঝিগাতলার সুনামী রেস্তোরা এর কাচ্চি বিরিয়ানী
৩. খিঁলগাও এর ভোলা ভাই বিরিয়ানী এর গরুর চাপ এবং মুক্তা বিরিয়ানী এর গরুর চাপ, খাসীর চাপ এবং ফুল কবুতর
৪. মতিঝিলের ঘরোয়া হোটেল এবং হীরাঝীলের ভূনা খিচুড়ী
৫. হোটেল আল-রাজ্জাকের কাচ্চি+গ্লাসি
৬. লালমাটিয়ার স্বাদ এর তেহারী
৭. নবাবপুর রোডে হোটেল স্টার এর খাসীর লেকুশ, চিংড়ি ,ফালুদা
৮. নয়াপল্টনে হোটেল ভিক্টোরীতে ৭০টি আইটেমের বুফে
৯. হাতিরপুল মোড়ে হেরিটেজ এর শর্মা
১০. শ্যামলী রিং রোডের আল-মাহবুব রেস্তোরার গ্রীল চিকেন
১১. মোহাম্মদপুর জেনেভা/বিহারী ক্যাম্পের গরু ও খাশির চাপ
১২. মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের সামনের বিহারী ক্যাম্পের “মান্জারের পুরি”
১৩. চকবাজারের শাহ সাহেবের বিরিয়ানী
১৪. মিরপুর-১০-এর শওকতের কাবাব
১৫. নারিন্দার শাহ সাহেবের ঝুনার বিরিয়ানী
১৬. ইংলিশ রোডের মানিকের নাস্তা
১৭. গুলশানের কস্তুরির সরমা
১৮. সোবহানবাগের প্রিন্স রেস্টুরেন্ট এর কাকড়া
১৯. সাইন্স-ল্যাবের ছায়ানীড়ের গ্রীল-চিকেন
২০. নাজিরা বাজারের হাজীর বিরিয়ানী
২১. জেলখানা গেটের পাশে হোটেল নিরবের ব্রেন ফ্রাই
২২. নয়া বাজারের করিমের বিরিয়ানী
২৩. হাজি বিরিয়ানী এর উল্টা দিকের হানিফের বিরিয়ানী
২৪. লালবাগের ভাটের মসজিদের কাবাব বন
২৫. মোহাম্মদপুরে সেন্ট জোসেফ স্কুলের গেটে এক মামার চানাচুর মাখা
২৬. বংশালের শমসের আলীর ভূনা খিচুড়ী
২৭. খিলগাঁও বাজারের উল্টো পাশে আল রহমানিয়ার গ্রীল চিকেন আর তেহারী
২৮. মতিঝিল সিটি সেন্টারের পিছনের বালুর মাঠের পিছনের মামার খিচুড়ী
২৯. চানখারপুলের নীরব হোটেলের ভুনা গরু আর ভর্তার সাথে ভাত
৩০. ধানমন্ডী লায়লাতির খাসির ভুনা খিচুড়ী
৩১. হোসনী দালান রোডে রাতের বেলার পরটা আর কলিজা ভাজি
৩২. নাজিরা বাজার মোড়ে বিসমিল্লার বটি কাবাব আর গুরদার
৩৩. পুরানা পল্টনে খানা-বাসমতির চাইনিজ প্যাকেজ
৩৪. বনানীর বুমারস রেস্টুরেন্টের বুফে প্যাকেজ
৩৫. ধানমন্ডির কড়াই গোশত এর ইলিশ সস
৩৬. গুলশান ২ এর খাজানার মাটন দম বিরিয়ানী এবং হাইদ্রাবাদী বিরিয়ানী
৩৭. উত্তরার একুশে রেস্তোরার গ্রীল চিকেন
৩৮. ধানমন্ডি/বনানীর স্টার হোটেলের কাচ্চি এবং কাবাব
৩৯. মৌচাকের স্বাদ রেস্তোরার ভাতের সাথে ৩৬ রকমের ভর্তা
৪০. সাইন্স ল্যাবে মালঞ্চ রেস্তোরার কাচ্চি বিরিয়ানী
ঢাকার বাইরের খাবার…….
১. স্পেশাল শাক ভাজি + ভেটকি মাছ–হোটেল সাজনা, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম
২. করাই মাটন+সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস, কাবাব এবং নান, হাইদ্রাবাদী বিরিয়ানী-হোটেল উন্দাল, পূর্ব জিন্দাবাজার, সিলেট
৩. কালাই রুটি– কোর্টের সামনে, রাজশাহী
৪. রুইমাছ ভাজি–কস্তুরি হোটেল, খুলনা
৫. মামুনের চাপ/জনি কাবাব এণ্ড চাপ–চার খাম্বার মোর, যশোর
৬. খুলনার হারুন ভাইয়ের ইলিশ ভাজা
৭. কক্সবাজারের পৌশির ভর্তা আইটেম, নিরিবিলির খিচুড়ি
৮. কলিজার সিঙ্গারা ও খাসির সমুচা—সাহেব বাজার, রাজশাহী
বিঃদ্রঃ = সবগুলোর মধ্যে সেরা খাবার……..
* মায়ের হাতের রান্না করা যেকোন খাবার *
ভালো থাকবেন। আপনার কোন মতামত থাকলে জানাবেন।
http://www.somewhereinblog.net/blog/nmrobin1988/29228531
বিস্তারিত পড়ুন ... »
আমি একজন ভোজনরসিক মানুষ। আমি খেতে খুবই পছন্দ করি। সুযোগ পেলেই আমি ভালো কিছু খাবারের জন্য বেরিয়ে পড়ি। সেই সুবাদে আমি ঢাকা শহরের এমন কিছু দোকানের মুখরোচক খাবার খেয়েছি, যা খেলে যে কোন মানুষের বার বার সেই খাবার খাওয়ার লোভ আসতে বাধ্য। এখন আমি আমার ব্লগার বন্ধুদের কাছে এমন কয়েকটি বাংলা খাবারের দোকানের খাবার এর বর্ণনা করছি, যে সব দোকানে সবারই একবার করে হলেও যাওয়া উচিত মজাদার খাবারের আসল মজা বোঝার জন্য। আমার বিশ্বাস এই দোকানগুলোর আমার উল্লেখিত খাবারগুলো একবার খেলে বারবার খেতে যেতেই হবে…………………………………..
১. “নান্না বিরিয়ানি” এর নাম শুনেনি এমন মানুষ খুব কমই আছে। এই দোকানটির মতো “মোরগ-পোলাও” বাংলাদেশের আর কোন দোকান বানাতে পারে কি না ?? আমি বলতে পারবো না। এই দোকানটির “মোরগ-পোলাও” এর যে স্বাদ তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। অনাসায়ে যে কেও একবৈঠকে দুটি “মোরগ-পোলাও” শেষ করে ফেলতে পারবে। “মোরগ-পোলাও” এর ঝোলের যেই স্বাদ, তা এককথায় অমৃত এর কাছাকাছি। সেই সাথে এই দোকানের বোরহানীটাও মজার।
বর্তমান দাম:- মোরগ-পোলাও = ৮০ টাকা, বোরহানী = ১৫ টাকা।
ঠিকানা:- এই মোট ৪টি শাখা রয়েছে। ৪টি শাখাই পুরনো ঢাকায় অবস্হিত। কিন্তু প্রথম এবং মেইন দোকানটির সাথে এর শাখাগুলোর রান্না এর কিছু পার্থক্য আছে। তাই যারা আসল স্বাদ নিতে চান তারা চলে যান এর প্রথম শাখায়। দোকানটি বেচারাম দেউরীতে অবস্হিত। যেতে হলে যাবেন তারা মসজিদে। সেখান থেকে “নান্না বিরিয়ানি” দেখা যায়। তারা মসজিদে সরাসরি যেতে না পারলে চলে যান কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখান থেকে তারা মসজিদে যেতে ১৫ টাকা রিকশা ভাড়া লাগে।
২. খুবই খুবই মজাদার “কাচ্চি বিরিয়ানী” খেতে চান ? ভুলে যান দামী ফখরুদ্দীন বিরিয়ানী অথবা ষ্টার বিরিয়ানী এর কথা। চলে যান “সুনামী রেস্তোরা”য়। ভাই বিশ্বাস করুন এত মজার “কাচ্চি বিরিয়ানী” আর কোথাও পাবেন কি না ? জানি না। সেরকম একটা “কাচ্চি বিরিয়ানী” পাওয়া যায় এই দোকানে।
বর্তমান দাম:- কাচ্চি বিরিয়ানী = ৮৫ টাকা, বোরহানী ফ্রী।
ঠিকানা:- ধানমন্ডির ঝিগাতলা বাসষ্ট্যান্ড এর বিপরীতে এই রেস্তোরা। ধানমন্ডির ঝিগাতলা বাসষ্ট্যান্ড এ গিয়ে কাউকে বললেই দেখিয়ে দিবে।
৩. “ভোলা ভাই বিরিয়ানি” এই দোকানটির গরুর চাপ এর বিরিয়ানি একবার হলেও খেয়ে দেখবেন। হালকা ঝাল দিয়ে বানানো এই বিরিয়ানী আপনার অবশ্যই ভালো লাগবে।
বর্তমান দাম:- গরুর চাপ = ৭৫ টাকা, বোরহানী = ১৫ টাকা।
ঠিকানা:- প্রথমে যাবেন খিঁলগাও রেলগেটে। সেখান থেকে খিঁলগাও-গোড়ান এর দিকে যে রাস্তা নেমে গেছে, সেই রাস্তা দিয়ে আস্তে আস্তে ৪-৫ মিনিট হাঁটলেই হাতের বামে দোকানটি দেখতে পাবেন।
৪. “মুক্তা বিরিয়ানি” এই দোকানটির গরুর চাপ এর বিরিয়ানি কিন্তু খিঁলগাও এলাকায় খুবই বিখ্যাত। এই দোকানের গরুর চাপ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর আগুন ঝাল এবং মসলার স্বাদ। আপনাদের ভালো লাগবে আশা করি।
বর্তমান দাম:- গরুর চাপ = ৭০ টাকা, বোরহানী = ১০ টাকা।
ঠিকানা:- গোরান টেম্পুস্ট্যান্ড এর আগে হাড়ভাঙ্গা রোডে।
৫. ভূনা খিচুরী খেতে অনেকেই ভালোবাসেন। যদি আপনি ঢাকা শহরের সবচেয়ে মজার ভূনা খিচুরী খেতে চান, তাহলে চলে যান “ঘরোয়া হোটেল” এ। এখানে আপনি ঢাকা শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং মজাদার ভূনা খিচুরী পাবেন। দামটা একটু বেশী মনে হলেও খাওয়ার পর এই দাম কিছুই মনে হবে না।
বর্তমান দাম:- ভূনা খিচুরী = ১২০ টাকা, বোরহানী = ২০ টাকা।
ঠিকানা:- শাপলা চত্বর থেকে মধুমিতা সিনেমা হল যাওয়ার সময় মধুমিতা সিনেমা হল এর একটু আগে।
ভালো থাকবেন। আপনার খোজেঁ অন্য কোন মজার খাবার দোকানের সন্ধান থাকলে অবশ্যই জানাবেন।
part 2
বেশ কয়েকদিন আগে ঢাকার বিখ্যাত এবং মজাদার খাবারের কিছু দোকান নিয়ে একটা পোষ্ট দিয়েছিলাম। অনেক ব্লগার ভাইয়া-আপুরা সেই পোষ্টে আরো নানা খাবারের দোকান এর খোঁজ দিয়েছিলেন। এমনকি ঢাকার বাইরের অনেক খাবারের দোকান সম্পর্কেও অনেকে লিখেছিলেন। সব মিলিয়ে অনেক বড় লিস্ট হয়েছে। তাই ভাবলাম সবাই যে যে খাবারের সন্ধান দিলেন তা এক করে ফেললেই তো পারি। এতে আমার নিজের তো বটেই, আমার মতো অনেক ভোজন রসিকদের উপকার। অনেকটা “ বাংলার মিনি ফুড ডিকশনারী ” টাইপের। কাজটি করেই ফেললাম। স্বীকার করছি ঢাকার বাইরের যে খাবারের সন্ধান দেয়া আছে সংখ্যাতে তা অত্যন্ত হাস্যকর। ঢাকার বাইরে মোট ৬৩টি জেলা রয়েছে। সব জেলাতেই রয়েছে নিজস্ব মজার এবং বিখ্যাত খাবার। কিন্তু সেসবের সন্ধান শুধুমাত্র নিজ নিজ এলাকার বাসিন্দারাই দিতে পারেন। যাই হোক এখানে আমার সেই পোষ্টে যত খাবারের সন্ধানসহ লোকেশন দেওয়া হয়েছিলো তা দেয়া আছে। বিশাল বড় তালিকা। আমি তো খুশিতে বাক বাকুম। দেখুন কেমন লাগে……….
ঢাকার মধ্যের খাবার……………..
১. বেচারাম দেউরীতে অবস্হিত নান্না বিরিয়ানি এর মোরগ-পোলাও
২. ঝিগাতলার সুনামী রেস্তোরা এর কাচ্চি বিরিয়ানী
৩. খিঁলগাও এর ভোলা ভাই বিরিয়ানী এর গরুর চাপ এবং মুক্তা বিরিয়ানী এর গরুর চাপ, খাসীর চাপ এবং ফুল কবুতর
৪. মতিঝিলের ঘরোয়া হোটেল এবং হীরাঝীলের ভূনা খিচুড়ী
৫. হোটেল আল-রাজ্জাকের কাচ্চি+গ্লাসি
৬. লালমাটিয়ার স্বাদ এর তেহারী
৭. নবাবপুর রোডে হোটেল স্টার এর খাসীর লেকুশ, চিংড়ি ,ফালুদা
৮. নয়াপল্টনে হোটেল ভিক্টোরীতে ৭০টি আইটেমের বুফে
৯. হাতিরপুল মোড়ে হেরিটেজ এর শর্মা
১০. শ্যামলী রিং রোডের আল-মাহবুব রেস্তোরার গ্রীল চিকেন
১১. মোহাম্মদপুর জেনেভা/বিহারী ক্যাম্পের গরু ও খাশির চাপ
১২. মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের সামনের বিহারী ক্যাম্পের “মান্জারের পুরি”
১৩. চকবাজারের শাহ সাহেবের বিরিয়ানী
১৪. মিরপুর-১০-এর শওকতের কাবাব
১৫. নারিন্দার শাহ সাহেবের ঝুনার বিরিয়ানী
১৬. ইংলিশ রোডের মানিকের নাস্তা
১৭. গুলশানের কস্তুরির সরমা
১৮. সোবহানবাগের প্রিন্স রেস্টুরেন্ট এর কাকড়া
১৯. সাইন্স-ল্যাবের ছায়ানীড়ের গ্রীল-চিকেন
২০. নাজিরা বাজারের হাজীর বিরিয়ানী
২১. জেলখানা গেটের পাশে হোটেল নিরবের ব্রেন ফ্রাই
২২. নয়া বাজারের করিমের বিরিয়ানী
২৩. হাজি বিরিয়ানী এর উল্টা দিকের হানিফের বিরিয়ানী
২৪. লালবাগের ভাটের মসজিদের কাবাব বন
২৫. মোহাম্মদপুরে সেন্ট জোসেফ স্কুলের গেটে এক মামার চানাচুর মাখা
২৬. বংশালের শমসের আলীর ভূনা খিচুড়ী
২৭. খিলগাঁও বাজারের উল্টো পাশে আল রহমানিয়ার গ্রীল চিকেন আর তেহারী
২৮. মতিঝিল সিটি সেন্টারের পিছনের বালুর মাঠের পিছনের মামার খিচুড়ী
২৯. চানখারপুলের নীরব হোটেলের ভুনা গরু আর ভর্তার সাথে ভাত
৩০. ধানমন্ডী লায়লাতির খাসির ভুনা খিচুড়ী
৩১. হোসনী দালান রোডে রাতের বেলার পরটা আর কলিজা ভাজি
৩২. নাজিরা বাজার মোড়ে বিসমিল্লার বটি কাবাব আর গুরদার
৩৩. পুরানা পল্টনে খানা-বাসমতির চাইনিজ প্যাকেজ
৩৪. বনানীর বুমারস রেস্টুরেন্টের বুফে প্যাকেজ
৩৫. ধানমন্ডির কড়াই গোশত এর ইলিশ সস
৩৬. গুলশান ২ এর খাজানার মাটন দম বিরিয়ানী এবং হাইদ্রাবাদী বিরিয়ানী
৩৭. উত্তরার একুশে রেস্তোরার গ্রীল চিকেন
৩৮. ধানমন্ডি/বনানীর স্টার হোটেলের কাচ্চি এবং কাবাব
৩৯. মৌচাকের স্বাদ রেস্তোরার ভাতের সাথে ৩৬ রকমের ভর্তা
৪০. সাইন্স ল্যাবে মালঞ্চ রেস্তোরার কাচ্চি বিরিয়ানী
ঢাকার বাইরের খাবার…….
১. স্পেশাল শাক ভাজি + ভেটকি মাছ–হোটেল সাজনা, আগ্রাবাদ, চট্টগ্রাম
২. করাই মাটন+সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস, কাবাব এবং নান, হাইদ্রাবাদী বিরিয়ানী-হোটেল উন্দাল, পূর্ব জিন্দাবাজার, সিলেট
৩. কালাই রুটি– কোর্টের সামনে, রাজশাহী
৪. রুইমাছ ভাজি–কস্তুরি হোটেল, খুলনা
৫. মামুনের চাপ/জনি কাবাব এণ্ড চাপ–চার খাম্বার মোর, যশোর
৬. খুলনার হারুন ভাইয়ের ইলিশ ভাজা
৭. কক্সবাজারের পৌশির ভর্তা আইটেম, নিরিবিলির খিচুড়ি
৮. কলিজার সিঙ্গারা ও খাসির সমুচা—সাহেব বাজার, রাজশাহী
বিঃদ্রঃ = সবগুলোর মধ্যে সেরা খাবার……..
* মায়ের হাতের রান্না করা যেকোন খাবার *
ভালো থাকবেন। আপনার কোন মতামত থাকলে জানাবেন।
http://www.somewhereinblog.net/blog/nmrobin1988/29228531
২০ নভে, ২০১১
প্রযুক্তির টাইম মেশিন : সিডি বা কমপ্যাক্ট ডিস্ক
•
বিস্তারিত পড়ুন ... »
বর্তমানে আমরা সিডি অনেক কাজে ব্যবহার করি। কিন্তু পূর্বে সিডি শুধু গান
শুনার কাজে ব্যবহার করা হতো। অনেক আগে গান শুনার জন্য প্রধান মাধ্যম ছিল
গ্রামোফোন বা কলের গান(vinyl record)। সেই বড় আকারের থালার মত ক্যাসেট কে
কিভাবে আরও উন্নত করে আকারে ছোট করবে তা নিয়ে গবেষণা করতো অনেক গবেষকরা।
সেই চেষ্টায় আজকের এই সিডি বা কমপ্যাক্ট ডিস্ক(Compact Disk)। আসুন জেনে
নেই এই সিডি র জন্ম ইতিহাস ও পথচলার গল্প।

১৯৭০ সালে ফিলিপস কোম্পানি ALP (Audio Long Play) অডিও ডিস্ক সিস্টেম নিয়ে কাজ শুরু করে। এই প্রোজেক্ট এর মূল উদ্দেশ্য ছিল লেজার টেকনোলজি ব্যবহার করে ভিনাইল রেকর্ডের (vinyl record) প্রতিদ্বন্দ্বী কিছু উদ্ভাবন করা।

ফিলিপসের অডিও ডিভিশনের পরিচালক লু অটেন্স সর্বপ্রথম পরামর্শ দেন, এক ঘণ্টার মিউজিক সম্বলিত ALP ডিস্ক হবে প্রচলিত ভিনাইল রেকর্ডের চেয়ে ছোট।

প্রথমে ভাবা হয়েছিল এই নতুন ফরম্যাটটির ব্যাসার্ধ হবে ১০ সেন্টিমিটার। ১৯৭৭ সালে ফিলিপস নতুন অডিও ফরম্যাট নিয়ে জোরেশোরে কাজ শুরু করে। অবশেষে ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচিত হয় সিডি বা কমপ্যাক্ট ডিস্ক(Compact Disk) । ঠিক এর এক সপ্তাহ পর এই নতুন ফরম্যাট কে কিভাবে আরও উন্নত করা যায় সেই লক্ষ্যে জাপানের সনি কর্পোরেশনের সাথে চুক্তি করে ফিলিপস।

প্রথমে এক ধন্টার অডিও ধারনক্ষমতা সম্পন্ন ডিস্ক তৈরির কথা থাকলেও পরবর্তীতে তা ৭৪ মিনিটে উন্নত করা সম্ভব হয়। ১৯৮০ সালে ফিলিপস এবং সনি যৌথ ভাবে তৈরি করে “রেড বুক” নামের কমপ্যাক্ট ডিস্ক।
১৯৮২ সালে ফিলিপস প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক ভাবে সিডি প্লেয়ার বাজারে ছাড়ে। এর মূল্য ছিল প্রায় ১০০০ ইউরো। প্রথমদিকে শুধুমাত্র ক্লাসিক্যাল মিউজিক এর অ্যালবামই সিডি আকারে বাজারে ছাড়া হয়। সিডি আকারে প্রথম অডিও অ্যালবাম The Visitors বাজারে ছাড়ে বিখ্যাত ব্যান্ড ABBA .

Download করুন – The Visitors
১৯৮৫ সালে বাজারে আসে Dire Strait এর বিখ্যাত অ্যালবাম Brother In Arms . মূলত এই অ্যালবামটিই সিডি কে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। এই অ্যালবামটি বিক্রি হয় ১ মিলিয়নের চেয়ে বেশি। এমন কি বিক্রির দিক থেকে এ যাবৎকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিডি অ্যালবাম এর নামও Brother In Arms.

Download করুন – Brother In Arms
২০০০ সালে সারাবিশ্বে সিডির বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৪৫৫ বিলিয়ন।
২০০৭ সালে সারাবিশ্বে সিডির বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৭৫৫ বিলিয়ন।
২০০৮ সালে সারাবিশ্বে সিডির বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ বিলিয়নের বেশি।
তবে অনলাইনে ডাউনলোডের সুবিধা বেড়ে যাওয়াতে সিডি বিক্রির পরিমাণ কমে গেছে ব্যাপক হারে।
প্রকৃতিতে যেমন বিবর্তন ঘটছে ঠিক তেমন বিবর্তন ঘটছে প্রযুক্তি বিশ্বেও। এক সময় ফ্লপি ডিস্ক এর খুব প্রচলন ছিল। এখন ফ্লপির যুগ শেষ। ঠিক তেমনি সিডি র পর এলো ডিভিডি। এখন ডিভিডি র পরে আসল ব্লু-রে ডিস্ক। হয়তোবা একদিন প্রযুক্তির ছোয়াতে একদিন সিডি হারিয়ে যাবে। এর পরিবর্তে নতুন কিছু দিয়ে কাজ করবে মানুষ।
এই ছিল সিডি বা কমপ্যাক্ট ডিস্ক এর প্রায় ৩২ বছরের এক পলক।
১৯৭০ সালে ফিলিপস কোম্পানি ALP (Audio Long Play) অডিও ডিস্ক সিস্টেম নিয়ে কাজ শুরু করে। এই প্রোজেক্ট এর মূল উদ্দেশ্য ছিল লেজার টেকনোলজি ব্যবহার করে ভিনাইল রেকর্ডের (vinyl record) প্রতিদ্বন্দ্বী কিছু উদ্ভাবন করা।
ফিলিপসের অডিও ডিভিশনের পরিচালক লু অটেন্স সর্বপ্রথম পরামর্শ দেন, এক ঘণ্টার মিউজিক সম্বলিত ALP ডিস্ক হবে প্রচলিত ভিনাইল রেকর্ডের চেয়ে ছোট।
প্রথমে ভাবা হয়েছিল এই নতুন ফরম্যাটটির ব্যাসার্ধ হবে ১০ সেন্টিমিটার। ১৯৭৭ সালে ফিলিপস নতুন অডিও ফরম্যাট নিয়ে জোরেশোরে কাজ শুরু করে। অবশেষে ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচিত হয় সিডি বা কমপ্যাক্ট ডিস্ক(Compact Disk) । ঠিক এর এক সপ্তাহ পর এই নতুন ফরম্যাট কে কিভাবে আরও উন্নত করা যায় সেই লক্ষ্যে জাপানের সনি কর্পোরেশনের সাথে চুক্তি করে ফিলিপস।
প্রথমে এক ধন্টার অডিও ধারনক্ষমতা সম্পন্ন ডিস্ক তৈরির কথা থাকলেও পরবর্তীতে তা ৭৪ মিনিটে উন্নত করা সম্ভব হয়। ১৯৮০ সালে ফিলিপস এবং সনি যৌথ ভাবে তৈরি করে “রেড বুক” নামের কমপ্যাক্ট ডিস্ক।
১৯৮২ সালে ফিলিপস প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক ভাবে সিডি প্লেয়ার বাজারে ছাড়ে। এর মূল্য ছিল প্রায় ১০০০ ইউরো। প্রথমদিকে শুধুমাত্র ক্লাসিক্যাল মিউজিক এর অ্যালবামই সিডি আকারে বাজারে ছাড়া হয়। সিডি আকারে প্রথম অডিও অ্যালবাম The Visitors বাজারে ছাড়ে বিখ্যাত ব্যান্ড ABBA .
Download করুন – The Visitors
১৯৮৫ সালে বাজারে আসে Dire Strait এর বিখ্যাত অ্যালবাম Brother In Arms . মূলত এই অ্যালবামটিই সিডি কে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। এই অ্যালবামটি বিক্রি হয় ১ মিলিয়নের চেয়ে বেশি। এমন কি বিক্রির দিক থেকে এ যাবৎকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিডি অ্যালবাম এর নামও Brother In Arms.
Download করুন – Brother In Arms
২০০০ সালে সারাবিশ্বে সিডির বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৪৫৫ বিলিয়ন।
২০০৭ সালে সারাবিশ্বে সিডির বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৭৫৫ বিলিয়ন।
২০০৮ সালে সারাবিশ্বে সিডির বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ বিলিয়নের বেশি।
তবে অনলাইনে ডাউনলোডের সুবিধা বেড়ে যাওয়াতে সিডি বিক্রির পরিমাণ কমে গেছে ব্যাপক হারে।
প্রকৃতিতে যেমন বিবর্তন ঘটছে ঠিক তেমন বিবর্তন ঘটছে প্রযুক্তি বিশ্বেও। এক সময় ফ্লপি ডিস্ক এর খুব প্রচলন ছিল। এখন ফ্লপির যুগ শেষ। ঠিক তেমনি সিডি র পর এলো ডিভিডি। এখন ডিভিডি র পরে আসল ব্লু-রে ডিস্ক। হয়তোবা একদিন প্রযুক্তির ছোয়াতে একদিন সিডি হারিয়ে যাবে। এর পরিবর্তে নতুন কিছু দিয়ে কাজ করবে মানুষ।
এই ছিল সিডি বা কমপ্যাক্ট ডিস্ক এর প্রায় ৩২ বছরের এক পলক।
কিউবান বিপ্লবের জাদুঘর
•
বিস্তারিত পড়ুন ... »
২৬ জুলাই, ১৯৫৩। নিজ দেশের স্বৈরশাসক সেনাবাহিনী প্রধান বাতিস্তার নির্মম
শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবের অগ্নিশপথ নিয়ে মোনকাদা নামের এক সেনাব্যারাকে
আক্রমণ করলেন একদল বিপ্লবী, নেতৃত্বে ফিদেল কাস্ত্রো নামের এক তরুণ
আইনজীবি। দেশমাতৃকার উপর চলমান দমন পীড়নের বিরুদ্ধে হাতের অতি অপ্রতুল
সম্পদ নিয়েই ছোট ভাই রাউল ও অন্যান্য বন্ধুদের মন দ্রোহের মন্ত্রে
উদ্দীপ্ত করেই সেই আক্রমণ থেকে বার্তা পৌছাতে চাইলেন শাসক গোষ্ঠী ও তাদের
উপরওয়ালা মার্কিন বাণিজ্য কোম্পানিগুলোর কাছে।

পরবর্তীতে সরকারের কোপানলে পড়ে গ্রেফতারকৃত সকল বিপ্লবীর দীর্ঘ মেয়াদের সাজা হয়, স্বয়ং ফিদেলকে প্রহসনের বিচারে দেওয়া হয় ১৫ বছরের জেল। এবং কয়েক বছর পরই বিপ্লবের পরিকল্পনাকারী মূল যোদ্ধাদের রাজনৈতিক নির্বাসনে পাঠানো হয় মেক্সিকোতে, রুদ্ধ হয়ে যায় স্বদেশভূমিতে ফেরার সমস্ত পথ।


কিন্তু তারুণ্য, বিপ্লব আর দেশপ্রেমের সামনে কোন প্রতিকূলতায় যে অটল হয়ে থাকতে পারে না তারই প্রমাণ দিল যেন ফিদেল আর তার বন্ধুরা- ১৯৫৬র ডিসেম্বরে মাত্র ৮২ জন অকুতোভয় যোদ্ধা গ্রান মা নামের এক নৌকায় করে সাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছে গেল কিউবার জলকাদাময় ম্যানগ্রোভ বনভূমির রাজত্বে। স্বপ্ন গেরিলা যুদ্ধে করেই উৎখাত করবে বাতিস্তাকে, সঙ্গী হবে দেশের আপামর নিপীড়িত জনসাধারণ। কিউবানদের সাথে যোগ গিয়েছেন আর্নেস্তো গুয়েভারা নামের এক আর্জেন্টাইন, যার ঝুলিতে আছে সবচেয়ে কম সময়ে সবচেয়ে ভাল ফলাফল করে গিনেস বুকে খোদাই করা ডাক্তার হবার বিশ্বরেকর্ড , কিন্তু কিউবানদের কাছে তার নাম কেবলমাত্র চে।
মহাপরিকল্পনা শুরু থেকেই বাধার মুখ দেখতে থাকে, গ্রান মা কিউবার উপকূলে ভিড়ে ঝকঝকে দিনের আলোতে, শুরু হয়ে সেনাবাহিনীর আক্রমণ। নানা বাঁধা পেরিয়ে সিয়েরা মায়েস্ত্রো পর্বতে যখন গেরিলারা পুনর্মিলিত হন তখন তাদের সংখ্যা মাত্র ১২ ! সেই থেকে কি করে নিজেদের সংগঠিত করে, স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে মাত্র ২ বছরের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের তাবেদার সরকারের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে বাতিস্তাকে দেশ ছাড়া করল সে কাহিনী রূপকথাকে ছাড়িয়ে পরিণত হয়েছে কিংবদন্তীতে, সারা বিশ্বের নিপীড়িত নির্যাতিত জনগণের কাছে কিউবার বিপ্লব হয়ে গেছে মুক্তির প্রতীক।
কিউবার বিপ্লবের প্রায় সমস্ত নিদর্শনতো বটেই এমনকি সেই মোটরবোট গ্রান মা পর্যন্ত সংরক্ষিত আছে ওল্ড হাভানায় অবস্থিত কিউবার বিপ্লব জাদুঘরে। চলুন ঘুরে আসি ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণ থেকে-


১৯২০ সালে নির্মিত সুরম্য ভবনটি বরাদ্দ ছিল কিউবার রাষ্ট্রপতির জন্যে(যদিও সেই সময় কিউবা সত্যিকার অর্থে কোন স্বাধীন দেশ নয় বরং আমেরিকার আধুনিক উপনিবেশ হিসেবেই পরিচিত ছিল সারা বিশ্বে), বাতিস্তা দেশ ত্যাগে বাধ্য হবার পরপরই ১৯৫৯ সালে বিপ্লব জাদুঘরে পরিণত করা হয় এই স্থাপত্যকে।



সিংহদ্বার দিয়ে ঢোকার পরপরই টিকিট কাটার কর্তব্য শেষ করে ( কিউবার সবখানেই স্থানীয়দের জন্য অতি সস্তা নামমাত্র দর্শনী আর পর্যটকদের জন্য বেশ কয়েক গুণ চড়া মূল্য) ঢুকে পড়লাম বিপ্লব পূর্ববর্তী কিউবার গ্যালারীতে, সেই সময়ের নানা আলোকচিত্র, দলিল দস্তাবেজ সেনাবাহিনীর নির্যাতনের সাক্ষী। সেই সাথে আছে বাতিস্তার গুন্ডা বাহিনীর শিকার কয়েকজন বিপ্লবীর রক্তে রঞ্জিত পোশাক, ধারণা করা হয় কম পক্ষে ২০,০০০ মানুষ সেই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল, বিশেষ করে মুক্তিকামী ছাত্ররা।

এর পরে আসে ২৬ জুলাই বিপ্লবের নানা মুহূর্ত, সাদাকালো আলোকচিত্রগুলো সব ধরনের জানা-অজানা রঙে উদ্ভাসিত হয়ে আমাদের সামনে সৃষ্টি করে যায় সেই বীরত্বগাথা।



এক কোণে দেখা যায় সিয়েরা মায়েস্ত্রোর দুর্গম পার্বত্য এলাকায় ব্যবহৃত রেডিও ট্রান্সমিটার। ডাক্তার চের ব্যবহৃত ফাস্ট এইড বক্স, গেরিলাদের টাইপ রাইটার, নানা অস্ত্র। আলোকচিত্রের সাথে সাথে সেই সময়ের নানা খবরের কাগজ, ম্যাপ, পতাকায় জড়িয়ে আছে যেন বারুদের উত্তেজনাময় গন্ধ।


পুরো একটা গ্যালারী উৎসর্গিত হয়েছে কিউবার বিপ্লবের অন্যতম দুই প্রধান বিপ্লবী ক্যামিলো সিয়েনফুয়েগোস এবং চে গুয়েভারার স্মৃতির প্রতি।

ক্যামিলো সিয়েনফুয়েগোস, কিউবার বিপ্লবের রাজপুত্র, ১৯৫৯ সালের সফল বিপ্লবের সময় ফিদেলের পরে সমগ্র কিউবায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। দুঃসাহসিক পরিকল্পনা, ক্ষুরধার প্রত্যুৎপন্নমতিতা তাকে পরিণত করেছিল অন্যতম শ্রেষ্ঠ গেরিলা নেতাতে, বিশেষ করে ইয়াগুয়েজের যুদ্ধে তার ভূমিকা এনে দিয়েছেল ইয়াগুয়েজের নায়ক খেতাব। মুক্ত কিউবাতে অন্তত দুঃখজনক ভাবে এক বিমান দুর্ঘটনায় সম্ভবত সাগরে সলিল সমাধি ঘটে ক্যামিলোর, তার বয়স হয়েছিল তখন কেবলমাত্র ২৭ !


বন্ধু ক্যামিলোর নামে ছেলের নাম রেখেছিলেন চে। যে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন নিজেকে, মুক্তির সেই অমোঘ বাণী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন দেশ ছাড়িয়ে মহাদেশে এবং বিশেষ করে পিতৃভূমি আর্জেন্টিনায়। কিউবার মন্ত্রিত্ব ঠেলে পরে আফ্রিকার কঙ্গোতে বিপ্লব সংগঠনের প্রচেষ্টার পর বলিভিয়াতে গেরিলা যুদ্ধরত অবস্থায় সামরিক জান্তার হাতে সি আই এর প্রত্যক্ষ সহায়তায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন চে, যার সম্পর্কে দার্শনিক জ্য পল সাত্রে বলেছিলেন Che Ernesto Guevara is the Most Complete Human Being of Our Time।
এই গ্যালারী সযত্নে রক্ষিত আছে দুই বিপ্লবীর ব্যবহৃত অস্ত্র, পোশাক, টুপি, নানা স্মারক। সেই সাথে আলোকচিত্র ও তথ্যের সমাহার।


ঘরের একপ্রান্তে আছে তাদের গেরিলাযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের প্রমাণ আকারের ভাস্কর্য।

উল্লেখ্য কিউবার অন্যতম বৃহত্তম নগরী সান্তা ক্লারা দখল মুক্ত করতে এই দুই গেরিলা নেতার নেতৃত্বাধীন সেনারা কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে যুদ্ধ করে। দুইজনই আজ অমর মুক্তিকামী মানুষের মনে, সেই জন্যই হয়ত তাদের স্মৃতির অবস্থান একসাথে যেমন বিপ্লব জাদুঘরে তেমন হাভানার বিখ্যাত বিপ্লব চত্বরেও।

এরপরে এক ফাঁকা জায়গায় ফিদেল, চে, ক্যামিলোর ধাতব ভাস্কর্য।

তারপরই রাষ্ট্রপতির চেম্বার, আলাদা টিকিট কেটে সেখানে দেখা গেল সাবেক রাষ্ট্রপতি ব্যবহৃত টেবিলের পিছনে কিউবান স্বাধীনতার আন্দোলনের পুরোধা কবি হোসে মার্তির ভাস্কর্য, এক কোণায় বাতিস্তার দুর্নীতি আর বিলাসব্যসনের প্রতীক সোনার প্রলেপ দেওয়া টেলিফোন।

এর পরে বিশেষ একখানা ঘর, যেখান অনুষ্ঠিত হয়ে ছিল সেনাদখলমুক্ত কিউবার নবসরকারের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ সভাগুলো। ঘরের আসবাবপত্র ও সাজসজ্জা ঠিক তেমনই আছে যেমন ছিল সেই উম্মাতাল যুগ সন্ধিক্ষণে, ভাবা যায় এই ঘরেই সামনের টেবিল ঘেরা চেয়ারে বসে ছিলেন একসময়ে ফিদেল, চে, রাউল, হুয়ান আলমেইদা! চিন্তা করতেই রোমাঞ্চে সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে।

এরপরে বিপ্লবের নানা গ্যালারী পার হয়ে বিশেষ করে ফিদেলে ৮৫তম জন্মদিন উপলক্ষে তার গেরিলা যুদ্ধে ব্যবহৃত জিনিসের বিশেষ প্রদর্শনী দেখে আমরা রওনা দিই জাদুঘরের অন্য অংশে।


সেখানে আছে গেরিলা যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত বেশ কিছু জিপগাড়ী, ভূপাতিত এক মার্কিন বিমান ও অন্যান্য যুদ্ধযান। আর এদের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে গ্রান মা!


সেই মোটরচালিত নৌকা যাতে করে গেরিলা দল পা রেখেছিল কিউবার মাটিতে, আজ তা পূর্ণ মর্যাদায় সংরক্ষিত। গ্রান মার পাশেই বিপ্লবের নায়কদের উদ্দেশ্যে প্রজ্জলিত অগ্নিশিখা, যা স্মরণ করে যাচ্ছে মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের সূর্যসন্তানদের।

যে লড়াই এখনো থামে নি, যে বিজয় এখনো সুদূর পরাহত, যে লড়াই নিয়ে চে গুয়েভারার বক্তব্য ছিল- জীবন মানুষের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ। এই জীবন সে পায় মাত্র একটি বার। তাই এমনভাবে বাঁচতে হবে যাতে বছরের পর বছর লক্ষ্যহীন জীবন যাপন করার যন্ত্রণা ভরা অনুশোচনায় ভুগতে না হয়, যাতে বিগত জীবনের গ্লানিভরা হীনতার লজ্জার দগ্ধানি সইতে না হয়, এমনভাবে বাঁচতে হবে যাতে মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষ বলতে পারে- আমার সমগ্র জীবন, সমগ্র শক্তি আমি ব্যয় করেছি এই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আদর্শের জন্য- মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রামে।।
পরবর্তীতে সরকারের কোপানলে পড়ে গ্রেফতারকৃত সকল বিপ্লবীর দীর্ঘ মেয়াদের সাজা হয়, স্বয়ং ফিদেলকে প্রহসনের বিচারে দেওয়া হয় ১৫ বছরের জেল। এবং কয়েক বছর পরই বিপ্লবের পরিকল্পনাকারী মূল যোদ্ধাদের রাজনৈতিক নির্বাসনে পাঠানো হয় মেক্সিকোতে, রুদ্ধ হয়ে যায় স্বদেশভূমিতে ফেরার সমস্ত পথ।
কিন্তু তারুণ্য, বিপ্লব আর দেশপ্রেমের সামনে কোন প্রতিকূলতায় যে অটল হয়ে থাকতে পারে না তারই প্রমাণ দিল যেন ফিদেল আর তার বন্ধুরা- ১৯৫৬র ডিসেম্বরে মাত্র ৮২ জন অকুতোভয় যোদ্ধা গ্রান মা নামের এক নৌকায় করে সাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছে গেল কিউবার জলকাদাময় ম্যানগ্রোভ বনভূমির রাজত্বে। স্বপ্ন গেরিলা যুদ্ধে করেই উৎখাত করবে বাতিস্তাকে, সঙ্গী হবে দেশের আপামর নিপীড়িত জনসাধারণ। কিউবানদের সাথে যোগ গিয়েছেন আর্নেস্তো গুয়েভারা নামের এক আর্জেন্টাইন, যার ঝুলিতে আছে সবচেয়ে কম সময়ে সবচেয়ে ভাল ফলাফল করে গিনেস বুকে খোদাই করা ডাক্তার হবার বিশ্বরেকর্ড , কিন্তু কিউবানদের কাছে তার নাম কেবলমাত্র চে।
মহাপরিকল্পনা শুরু থেকেই বাধার মুখ দেখতে থাকে, গ্রান মা কিউবার উপকূলে ভিড়ে ঝকঝকে দিনের আলোতে, শুরু হয়ে সেনাবাহিনীর আক্রমণ। নানা বাঁধা পেরিয়ে সিয়েরা মায়েস্ত্রো পর্বতে যখন গেরিলারা পুনর্মিলিত হন তখন তাদের সংখ্যা মাত্র ১২ ! সেই থেকে কি করে নিজেদের সংগঠিত করে, স্থানীয় জনগণকে সাথে নিয়ে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে মাত্র ২ বছরের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের তাবেদার সরকারের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে বাতিস্তাকে দেশ ছাড়া করল সে কাহিনী রূপকথাকে ছাড়িয়ে পরিণত হয়েছে কিংবদন্তীতে, সারা বিশ্বের নিপীড়িত নির্যাতিত জনগণের কাছে কিউবার বিপ্লব হয়ে গেছে মুক্তির প্রতীক।
কিউবার বিপ্লবের প্রায় সমস্ত নিদর্শনতো বটেই এমনকি সেই মোটরবোট গ্রান মা পর্যন্ত সংরক্ষিত আছে ওল্ড হাভানায় অবস্থিত কিউবার বিপ্লব জাদুঘরে। চলুন ঘুরে আসি ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণ থেকে-
১৯২০ সালে নির্মিত সুরম্য ভবনটি বরাদ্দ ছিল কিউবার রাষ্ট্রপতির জন্যে(যদিও সেই সময় কিউবা সত্যিকার অর্থে কোন স্বাধীন দেশ নয় বরং আমেরিকার আধুনিক উপনিবেশ হিসেবেই পরিচিত ছিল সারা বিশ্বে), বাতিস্তা দেশ ত্যাগে বাধ্য হবার পরপরই ১৯৫৯ সালে বিপ্লব জাদুঘরে পরিণত করা হয় এই স্থাপত্যকে।
সিংহদ্বার দিয়ে ঢোকার পরপরই টিকিট কাটার কর্তব্য শেষ করে ( কিউবার সবখানেই স্থানীয়দের জন্য অতি সস্তা নামমাত্র দর্শনী আর পর্যটকদের জন্য বেশ কয়েক গুণ চড়া মূল্য) ঢুকে পড়লাম বিপ্লব পূর্ববর্তী কিউবার গ্যালারীতে, সেই সময়ের নানা আলোকচিত্র, দলিল দস্তাবেজ সেনাবাহিনীর নির্যাতনের সাক্ষী। সেই সাথে আছে বাতিস্তার গুন্ডা বাহিনীর শিকার কয়েকজন বিপ্লবীর রক্তে রঞ্জিত পোশাক, ধারণা করা হয় কম পক্ষে ২০,০০০ মানুষ সেই বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল, বিশেষ করে মুক্তিকামী ছাত্ররা।
এর পরে আসে ২৬ জুলাই বিপ্লবের নানা মুহূর্ত, সাদাকালো আলোকচিত্রগুলো সব ধরনের জানা-অজানা রঙে উদ্ভাসিত হয়ে আমাদের সামনে সৃষ্টি করে যায় সেই বীরত্বগাথা।
এক কোণে দেখা যায় সিয়েরা মায়েস্ত্রোর দুর্গম পার্বত্য এলাকায় ব্যবহৃত রেডিও ট্রান্সমিটার। ডাক্তার চের ব্যবহৃত ফাস্ট এইড বক্স, গেরিলাদের টাইপ রাইটার, নানা অস্ত্র। আলোকচিত্রের সাথে সাথে সেই সময়ের নানা খবরের কাগজ, ম্যাপ, পতাকায় জড়িয়ে আছে যেন বারুদের উত্তেজনাময় গন্ধ।
পুরো একটা গ্যালারী উৎসর্গিত হয়েছে কিউবার বিপ্লবের অন্যতম দুই প্রধান বিপ্লবী ক্যামিলো সিয়েনফুয়েগোস এবং চে গুয়েভারার স্মৃতির প্রতি।
ক্যামিলো সিয়েনফুয়েগোস, কিউবার বিপ্লবের রাজপুত্র, ১৯৫৯ সালের সফল বিপ্লবের সময় ফিদেলের পরে সমগ্র কিউবায় সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। দুঃসাহসিক পরিকল্পনা, ক্ষুরধার প্রত্যুৎপন্নমতিতা তাকে পরিণত করেছিল অন্যতম শ্রেষ্ঠ গেরিলা নেতাতে, বিশেষ করে ইয়াগুয়েজের যুদ্ধে তার ভূমিকা এনে দিয়েছেল ইয়াগুয়েজের নায়ক খেতাব। মুক্ত কিউবাতে অন্তত দুঃখজনক ভাবে এক বিমান দুর্ঘটনায় সম্ভবত সাগরে সলিল সমাধি ঘটে ক্যামিলোর, তার বয়স হয়েছিল তখন কেবলমাত্র ২৭ !
বন্ধু ক্যামিলোর নামে ছেলের নাম রেখেছিলেন চে। যে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন নিজেকে, মুক্তির সেই অমোঘ বাণী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন দেশ ছাড়িয়ে মহাদেশে এবং বিশেষ করে পিতৃভূমি আর্জেন্টিনায়। কিউবার মন্ত্রিত্ব ঠেলে পরে আফ্রিকার কঙ্গোতে বিপ্লব সংগঠনের প্রচেষ্টার পর বলিভিয়াতে গেরিলা যুদ্ধরত অবস্থায় সামরিক জান্তার হাতে সি আই এর প্রত্যক্ষ সহায়তায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন চে, যার সম্পর্কে দার্শনিক জ্য পল সাত্রে বলেছিলেন Che Ernesto Guevara is the Most Complete Human Being of Our Time।
এই গ্যালারী সযত্নে রক্ষিত আছে দুই বিপ্লবীর ব্যবহৃত অস্ত্র, পোশাক, টুপি, নানা স্মারক। সেই সাথে আলোকচিত্র ও তথ্যের সমাহার।
ঘরের একপ্রান্তে আছে তাদের গেরিলাযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের প্রমাণ আকারের ভাস্কর্য।
উল্লেখ্য কিউবার অন্যতম বৃহত্তম নগরী সান্তা ক্লারা দখল মুক্ত করতে এই দুই গেরিলা নেতার নেতৃত্বাধীন সেনারা কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে যুদ্ধ করে। দুইজনই আজ অমর মুক্তিকামী মানুষের মনে, সেই জন্যই হয়ত তাদের স্মৃতির অবস্থান একসাথে যেমন বিপ্লব জাদুঘরে তেমন হাভানার বিখ্যাত বিপ্লব চত্বরেও।
এরপরে এক ফাঁকা জায়গায় ফিদেল, চে, ক্যামিলোর ধাতব ভাস্কর্য।
তারপরই রাষ্ট্রপতির চেম্বার, আলাদা টিকিট কেটে সেখানে দেখা গেল সাবেক রাষ্ট্রপতি ব্যবহৃত টেবিলের পিছনে কিউবান স্বাধীনতার আন্দোলনের পুরোধা কবি হোসে মার্তির ভাস্কর্য, এক কোণায় বাতিস্তার দুর্নীতি আর বিলাসব্যসনের প্রতীক সোনার প্রলেপ দেওয়া টেলিফোন।
এর পরে বিশেষ একখানা ঘর, যেখান অনুষ্ঠিত হয়ে ছিল সেনাদখলমুক্ত কিউবার নবসরকারের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ সভাগুলো। ঘরের আসবাবপত্র ও সাজসজ্জা ঠিক তেমনই আছে যেমন ছিল সেই উম্মাতাল যুগ সন্ধিক্ষণে, ভাবা যায় এই ঘরেই সামনের টেবিল ঘেরা চেয়ারে বসে ছিলেন একসময়ে ফিদেল, চে, রাউল, হুয়ান আলমেইদা! চিন্তা করতেই রোমাঞ্চে সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে।
এরপরে বিপ্লবের নানা গ্যালারী পার হয়ে বিশেষ করে ফিদেলে ৮৫তম জন্মদিন উপলক্ষে তার গেরিলা যুদ্ধে ব্যবহৃত জিনিসের বিশেষ প্রদর্শনী দেখে আমরা রওনা দিই জাদুঘরের অন্য অংশে।
সেখানে আছে গেরিলা যুদ্ধের সময় ব্যবহৃত বেশ কিছু জিপগাড়ী, ভূপাতিত এক মার্কিন বিমান ও অন্যান্য যুদ্ধযান। আর এদের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে গ্রান মা!
সেই মোটরচালিত নৌকা যাতে করে গেরিলা দল পা রেখেছিল কিউবার মাটিতে, আজ তা পূর্ণ মর্যাদায় সংরক্ষিত। গ্রান মার পাশেই বিপ্লবের নায়কদের উদ্দেশ্যে প্রজ্জলিত অগ্নিশিখা, যা স্মরণ করে যাচ্ছে মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের সূর্যসন্তানদের।
যে লড়াই এখনো থামে নি, যে বিজয় এখনো সুদূর পরাহত, যে লড়াই নিয়ে চে গুয়েভারার বক্তব্য ছিল- জীবন মানুষের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ। এই জীবন সে পায় মাত্র একটি বার। তাই এমনভাবে বাঁচতে হবে যাতে বছরের পর বছর লক্ষ্যহীন জীবন যাপন করার যন্ত্রণা ভরা অনুশোচনায় ভুগতে না হয়, যাতে বিগত জীবনের গ্লানিভরা হীনতার লজ্জার দগ্ধানি সইতে না হয়, এমনভাবে বাঁচতে হবে যাতে মৃত্যুর মুহূর্তে মানুষ বলতে পারে- আমার সমগ্র জীবন, সমগ্র শক্তি আমি ব্যয় করেছি এই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আদর্শের জন্য- মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রামে।।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)
