সাহিত্য ও সংস্কৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাহিত্য ও সংস্কৃতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

২৬ অক্টো, ২০১২

সেই সময়ের সুনীল

‘ওয়াচম্যান’ সিনেমাটার শুরুতেই বব ডিলানের একটা চমৎকার গান আছে। দ্যা টাইমস দে আর আ চেঞ্জিং। সব কিছু বদলায়, সব কিছুই বদলে যাচ্ছে, সব কিছুই বদলে যাবে। পৃথিবী ঘুরবেই।
সুনীলের কোন লেখাটা প্রথম পড়েছিলাম, সেটা আমার নিজেরও মনে নেই ঠিক। কেবল মনে আছে সে বইতে খোঁড়া একজন মানুষ- যার মনের জোর সাংঘাতিক- সেই রাজা রায় চৌধুরী নামের একটা মানুষ ছিলো। খুব সম্ভব ভূপাল রহস্য ছিলো প্রথম বইটার নাম। এরপর পড়লাম ভয়ংকর সুন্দর।
এবং এই বইটা পড়ে আমি কাকাবাবুর বিরাট ভক্ত হয়ে গেলাম। কালিকট বন্দরে এক শেকলে বাঁধা বন্দী ক্রমাগত চ্যাঁচিয়ে যাচ্ছে – সম্রাট কনিষ্কের মুণ্ডু হাতে করে আমার বন্ধু বসে আছে আমার জন্যে অপেক্ষা করে, আমায় যেতে দাও। ইতিহাসের ছোট্ট একটা মিথকে আশ্রয় করে সুনীল ভয়ংকর সুন্দর ভাবে আমার মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন। এরপর সবুজ দ্বীপের রাজা আর বিজয়নগরের হীরে- রাজা রায় চৌধুরী, নরেন্দ্রভার্মার ভাষায় বলতে গেলে – আনডন্টেড।
ক্লাস সিক্স, শীতের ছুটি, গ্রামের নানুবাড়ি বিশাল বড়। আমি সেই ছুটিতে ক্রিকেট খেলে বেড়াচ্ছি গ্রামে থাকা অন্যান্য খালাতো ভাইদের সাথে। সেবারই জানলাম গ্রামের ক্রিকেট খুব ইন্টারেস্টিং জিনিস- পেপসির কেস ধরে বাজি খেলা হয়- টেপ টেনিস না শুধু টেনিস বল। বাড়িতে রাশভারি নানা ভাই আর আদর দিয়ে মাথায় তোলা নানু। আর ছিলো আইনপড়ুয়া খালামণি। সেই ক্রিকেট মহোৎসবের দিনগুলি কাটানোর সময় এক কুয়াশার ভোরে দেখি খালামণি বই পড়ছে। সেই সময়। সন্ধ্যায় কিছু করার না পেয়ে আমিও টেনে নিলাম সেটা। ইতিহাস অমন করেও লেখা যায় !
সুনীল গাঙ্গুলি জড়িয়ে আছেন অনেক কিছুর সাথে। স্কুলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে বইপড়া কর্মসূচির মাঝেও প্রিয় বইয়ের একটা আবার যক্ষের ধন- আর অন্যটা ছিলো আঁধার রাতের অতিথি। বিশুঠাকুর চরিত্রটাকে দারুণ পছন্দ হয়ে গিয়েছিলো আমার।
সব সমীকরণ উলটে দিলেন আপনি সুনীল, ক্লাস এইটে। ছবির দেশেতে, কবিতার দেশেতে। মার্গারিট। কিছু বলার নেই, কিচ্ছুটি বলার খুঁজে পেলাম না বইটা পড়ে। কী স্বছ গদ্য, কী মনকাড়া বর্ণনা, কী অনায়াস সহজে বলা যায় নিজের গল্প। সেই প্রথম পড়া বইটাই এখনো আছে আমার বুকশেলফের ছট একটা জায়গা জুড়ে, আমি জানি এরচাইতে বহুগুণ জায়গা জুড়ে আছে সেটা প্রতিটি বইপড়ুয়ার মনেই।
কবিতার জন্যে অমরত্বকে আপনি তুচ্ছ করেছিলেন না সুনীল ?? কেউ কথা রাখেনি তাই- আপনিও অমর হয়ে গেলেন কবি। যে হাতে ছুঁয়েছিলেন সুনীল নীরার মুখ, সে হাতেই অনূদিত হয়েছিলো ব্যোঁদলেয়ারের আশ্চর্য মেঘদল। বিনয় বাদল দীনেশের মতন জল লাফিয়ে ওঠে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের বারান্দায় আর ‘লোরকা স্মরণে’ পড়তে গিয়ে বারবার আবিষ্কার করি বিস্ময়ে -কবিরা কখনো সত্যবাদী হয় না।
কোথায় যেন পড়েছিলাম সুনীল গাঙ্গুলি কবিতা ছাড়া আর কিছুই লিখতে চাননি কখনো। সাহিত্যের আরেকটা নির্মমতা হলো ইচ্ছার বিরুদ্ধেও কবিকে তাই লিখতে হয় অনেক কিছুই। ভাগ্যিস সুনীল লিখেছিলেন। বার্লিন প্রাচীরের ভাঙ্গা টুকরো হাতে নিয়ে তার সাথে আমরাও দেখি ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ, জাদুকর সত্যজিৎ এর হাত ধরে অরণ্যের দিনরাত্রি দেখি। আমি একা, আমাদের আরো কয়েকজন।
আনন্দমেলার পূজাবার্ষিকীর কাকাবাবুর জন্যে অপেক্ষা ফুরিয়েছে কয়েক বছর হলো। কবিতার ছায়া মাড়াই না, সেই সময় আর পূর্ব-পশ্চিম আবার পড়লাম বছরখানেক আগে। এই তো, সুনীলের সাথে আমার সম্পর্ক চায়ের আড্ডা বাদে এইটুকুই। তারপরেও আজ সকালে আপনার প্রয়াণে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলাম সুনীল। কারণটা কি বুঝতে পারি না।
ফাহিম ভাই দেখলাম ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলে দিয়েছেন কারণটা।
“we’ve crossed that point of life when you start losing your childhood heroes, and sadly discover there aren’t enough new heroes any more.”
… এটাই মনে হয় সবচেয়ে সত্য কথা। সুনীল চলে গেছেন, সাথে করে নিয়ে গেছেন আমাদের স্মৃতির শহরের একটা বড় অংশ। সুনীল- তার নবীনকুমারের মতোই- আমাদের সেই সময়ের প্রতীক। সেই সময়ের লোকগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। স্টিভ ওয়াহ অবসরে, পাওলো মালদিনি আর লুইস ডি নাজারিও রোনালদো খবরের কাগজে নেই। মাসুদ রানা ধুঁকতে ধুঁকতে দুনিয়া ঘুরে বেড়াচ্ছে পূর্ব আর পশ্চিমে- না ফেরার দেশে মতি নন্দী, মাইকেল জ্যাকসন আর হুমায়ূন আহমেদ। আজ এই মিছিলে যোগ দিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
আপনি নেই এই সত্য মেনে নিয়েও চোখ মুছে সেই সময়ের প্রতীক রুপে আপনাকে বিদায় জানাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সবকিছু বদলে যাচ্ছে, দ্যা টাইমস দে আর আ চেঞ্জিং।
আপনি নেই তাই সন্তু কোথায়, কাকাবাবু কোথায় জানা হবে না আর। আপনি নেই তাই সন্তু হারিয়ে গেছে।
আপনি নেই তাই হারিয়ে গেছে এক টুকরো চাঁদ।

 সুত্রঃhttp://www.sachalayatan.com/shu77han/46567
বিস্তারিত পড়ুন ... »

২৯ মার্চ, ২০১২

পল্টন, বই কেনা আর আমার মার্ক টোয়েন হবার গল্প

ছোটবেলা থেকেই আমার প্রিয় শখ গুলোর একটা হলো বই পড়া। তাই বলে আমাকে জ্ঞানের সমুদ্র ভাবলে ভুল হবে। আমার আগ্রহ ছিলো সব রকমের গল্পের বইতে। তিন গোয়েন্দা, ফেলুদা, টেনিদা, কাকাবাবু, টিনটিন এমনকি চাচা চৌধুরী পর্যন্ত। দিনের বেশীর ভাগ সময় কাটতো তাই ফেলুদা তোপসের সাথে মগনলালের পিছনে তাড়া করে, না হলে কিশোর পাশার সাথে গোলমেলে ঘড়ির রহস্য ভেদ করে। বই পড়ার পাশাপাশি আর একটা শখ ছিলো, সেটা হলো বই জমানো। স্কুলে পড়ি, এতো বই কেনার টাকা কই পাবো? তাই একমাত্র সম্বল ছিলো পুরোনো বই কেনা। ঢাকার পুরানা পল্টন, নীলক্ষেত আর সদরঘাটে পুরোনো বই পাওয়া যায়। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে কিংবা রিক্সাভাড়ার টাকা বাঁচিয়ে তাই প্রতি সপ্তাহে চলে যেতাম এসব জায়গায়। পুরনা পল্টনটা বাসার কাছে হওয়াতে এখানটাতেই বেশী যাওয়া হতো।

একবারের কথা বলি। তখন ক্লাশ এইটে পড়ি। বেশ কিছু টাকা জমিয়েছি। আমাদের বাসা তখন ফকিরেপুল এলাকায়। অসহযোগ আন্দোলন চলছে। বিএনপি বিরোধী দল ছাড়াই একা নির্বাচন করে সংসদে বসেছে। আর বিরোধী দল সব এক হয়ে জ্বালাও পোড়াও করছে। দৈনিক বাংলায় প্রতিদিন টিয়ার গ্যাস ছোড়া হচ্ছে আর আমরা বাসায় বসে হাঁপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে টিভি দেখছি। কারন স্কুল কলেজ সব বন্ধ। এর মাঝে একদিন মনে হলো সব কিছু শান্ত। মিছিল টিছিল নাই। তাই জমানো টাকা নিয়ে রওনা হলাম পুরনা পল্টনের বইয়ের ডিপোতে। আমার সাথে সবসময়ই কোন না কোন বন্ধু জুটে যেতো। সব ক্লাশেই আমার সাথে চলার জন্য একজন খুব ভালো বন্ধু থাকতো। ক্লাশ এইটে ছিলো তারেক। আমি বাসা থেকে বের হয়ে তারেককে নিয়ে হেটে চলে এলাম পুরনা পল্টনে। এই বই দেখি সেই বই দেখি। খুব হিসাব করে কয়েকটা বই কিনলাম। সব মিলিয়ে জমিয়েছি পঞ্চাশ টাকা। দরাদরি করে পাঁচটার মতো বই পাওয়া যাবে। তাই খুব হিসাব করে কিনতে হবে।
বই খুঁজতে খুঁজতে তোপখানার মোড় পর্যন্ত চলে এসেছি। খুব কাছ দিয়ে কয়েকটা মিছিল গেলো। খালেদার চামড়া তুলে নেবো আমরা টাইপের শ্লোগান দিতে দিতে।তখন সব মিছিলেরই এটা একটা কমন শ্লোগান।খালেদা আর হাসিনার চামড়ার গুনগত মান মনে হয় খুব ভালো। কেননা সব সময় দেখি এদের চামড়া তোলার জন্য সবাই খুব উৎসুক থাকে।যদিও সেই চামড়া তোলার পর সেটা দিয়ে ঠিক কি করা হবে সে বিষয়ে কিছুই বলা হয় না।
মিছিল খুব একটা স্বাভবিক ব্যাপার তখন। তোপখানার কাছাকাছি একটা দোকানে পৌছানোর পর দেখি একটা হুড়াহুড়ি লাগলো। দোকানদার চিৎকার করে বললো ভাইজান ভাগেন। আমি কিছুই বুঝলাম না। পায়ের কাছে সিলিন্ডার টাইপ কিছু একটা এসে পড়লো। সেখান থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। আমি পেছন ফিরে দিলাম দৌড়। আশে পাশে সবাই দেখলাম দৌড়ুচ্ছে। তারেক খুব লম্বা। সে দৌড়ে আমাকে ছাড়িয়ে গেলো। রাস্তার উপর বই পত্র সব ছড়াছড়ি। তরমুজের কিছু দোকান ছিলো। সব লন্ড ভন্ড। রাস্তা ভর্তি তরমুজ পড়ে আছে। পেছনে গুলির শব্দ। আমি তখনো দৌড়াচ্ছি। কোন পথ থেকে কোন পথে গেছি জানি না। এক সময় দেখলাম আমি মতিঝিল পৌঁছে গেছি। আশে পাশে কোথাও তারেককে খুঁজে পেলাম না। পড়ে অবশ্য জেনেছিলাম সে একটা দোকানে মধ্যে লুকিয়ে ছিলো। আর আমি মতিঝিলের মোড়ে টেনিদা সমগ্র নিয়ে দাড়িয়ে রইলাম। সেদিনের পর পুরো ঢাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছিলো অনির্দিষ্ট দিনের জন্য। তাতে আমার কি? আমি ঘরে বসে তখন আয়েস করে টেনিদা সমগ্র পড়ছি।
পুরনা পল্টন নিয়ে আর একটা ঘটনা বলি। ক্লাশের বই পড়ার ব্যাপারে আমার বরাবরই অনিচ্ছা। তবে পাঠ্যবইয়ের একটা লাইন খুবই মনে ধরলো। বই চুরি করা নাকি ঠিক চুরি করা নয়। মার্ক টোয়েন নামে এক বিশাল বড় মানুষ সেটা বলে গিয়েছেন। এই লাইনটা পড়ে আমার মাথায় ঢুকলো, তাহলে তো আমি বই চুরি করলে কোন সমস্যা নাই। আমি তো চাইলেই পুরনা পল্টন থেকে একটা দুইটা বই গাপ করে দিতে পারি। যেই বুদ্ধি সেই কাজ। তখন ক্লাশ নাইনে পড়ি। আমার সাথে সবসময় থাকে মাসুম। তো আমি মাসুমকে নিয়ে একদফা পুরনা পল্টন ঘুরে এলাম। আর চুরি করে নিয়ে নিয়ে এলাম তিনটা বই। বন্ধু মহলে তখন আমরা পুরা হিরো।
একবার চুরি করে সাহস বেড়ে গেলো। দু’দিন পর আবার গেলাম। এবার আরো বেশী বেপরোয়া। একটা বই কিনি তো তিনটা চুরি করি।
কিছু বই মাসুমের হাতে চালান করে দিয়ে আমি মাত্র টিনটিনের একটা বই নিজের কেনা বইয়ের ফাঁকে চালান করতে যাবো এমন সময় পাশের দোকানী ছুটে এলো। কাহিনী হলো, পাশের দোকান থেকে মাত্র ফেলুদার যত কান্ড কাঠমুন্ডুতে বইটা চুরি করে মাসুমকে দিয়েছে আর সে সেটা একদম বাইরে রেখে ঐ দোকানীর সামনেই দাড়িয়ে আছে। দোকানী তো বিশাল চিৎকার চেচামেচি জুড়ে দিলো। আমরা নাকি তার স্টল থেকে বই চুরি করেছি। কাহিনী তো সত্যই। এখন কি করি। আশে পাশে লোক জমে গেলো। আমি গলা উচিয়ে বলা শুরু করলাম ‘মোটেও না। আমি এই বই চাচামিয়ার কাছে থেকে কিনেছি।‘
ঐখানে এক চাচা মিয়া ছিলো। তার কাছ থেকে আমি অনেক বই কিনতাম। তাই বলে দিলাম তার নাম। দোকানী তো বিশ্বাসই করে না। বললো, ‘চলেন তাইলে চাচা মিয়ার কাছে।‘ আমার হাত ধরে টেনে সে চাচামিয়ার দোকানে নিয়ে গেলো। আমার কপাল এমনই খারাপ যে সেই দিন চাচা মিয়া দোকানই খুলে নি। ব্যাস পুরা হাতে নাতে ধরা।
আমার একটা সমস্যা হলো বিপদে পড়লে মাথা গরম হয়ে যায়। আর চিৎকার শুরু করি। আমি তখন বললাম আমি এই বই নীলক্ষেত থেকে কিনে এনেছি। দোকানীরা কিছুতেই বিশ্বাস করবে না। তোপখানার মোড়ে মোটামুটি একটা বিশাল ভিড় লেগে গেলো। আমি আঁড় চোখে দেখলাম তিনজন পুলিশ আসছে। মাসুমের দেখলাম মুখ টুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। আমি জোড় চিৎকার করা শুরু করলাম। এই দোকানী একটা পুরান বই আমাকে গছাতে চেয়েছিলো । আমি নেই নি বলে সে আমার নামে মিথ্যা বলছে। এই কাহিনী বানালাম। যদিও কাহিনীটা নিজের কাছেই রুপকথার গল্প মনে হলো।
এর মাঝে ভীড়ের মধ্যে এক কম বয়সী দেখলাম আমার পক্ষ নিলো। মনে হয় ইউনিভার্সিটিতি পড়ে। সেও বলতে শুরু করলো । ‘আসলেই এই সব দোকানদারদের কোন নীতি নাই। এরা ছোট ছোট পোলাপারনদের কাছে বেশী দামে বই বেঁচে।‘ ইত্যাদি ইত্যাদী। আমি তো হাতে চাঁদ পেলাম।আমার চিৎকার আরো বেড়ে গেলো। এই দোকানী আগে কোনদিন আমাকে ঠকিয়েছে, আগে কোনদিন আমোকে ছেড়া বই দিয়েছে সব ফিরিস্তি শুরু করলাম উৎসাহ পেয়ে। ভীড়ের মাঝে দেখলাম জনমতও আমার পক্ষে আসছে। অবশেষে সবাই মিলে দোকানদারকে খুব বকাঝকা করলো। আমার তখন খারাপ লাগা শুরু হলো। কিন্তু তখন আর কিই ই বা করতে পারি। ডজন খানেক চুরি করা বই আর মনের মাঝে তীব্র অপরাধ বোধ নিয়ে ফিরে এলাম ঘরে।
এরপর যতবারই পল্টনের ঐ জায়গাটা দিয়ে গেছি মাথা সেই দোকানদার কে খোঁজার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পাই নি। যদি কোনদিন পাই অবশ্যই তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবো। হোক না দশ টাকার বই। হোক না তখন আমি ছোট মানুষ।কিন্তু আমি তারকাছে দশ হাজারগুণ ছোট হয়ে গেছি মানুষ হিসেবে। মার্ক টোয়েনের কথা মনে হয় সবসময় সত্যি নয়।
বিস্তারিত পড়ুন ... »

সত্যজিৎ এর ফেলুদা ও আমার ভাবনা,সাথে ফেলুদার সকল মুভির ডাউনলোড লিংক


মাঝে বেশ দেখা হয়ে গেলো ফেলুদা বিষয়ক বেশ কয়েকটি মুভি।এর মধ্য আছে রয়েল বেঙ্গল রহস্য,গোরস্থানে সাবধান,টিনটোরেটোর রহস্য,বোম্বাইয়ের বোম্বেটে,কৈলাসে কেলেঙ্কারি,সোনার কেল্লা, বাক্স রহস্য।বাকি আছে শুধু জয় বাবা ফেলুনাথ ।
সেই সব মুভির উপর ভিত্তি করেই একটা সমালোচনা করার দুঃসাহস করলাম।
প্রথমে বলতে গেলে,নির্মাণ শৈলীর দিক দিয়ে সন্দীপ রায় বাণিজ্যিক খানিকটা,হয়তো এখনকার জামানায় এটাই খাটে।কিছু জায়গায় আধুনিক তথা সমসাময়িক বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন।উদাহরণ স্বরূপ বলতে গেলে টিনটোরেটোর রহস্য আর গোরস্থানে সাবধানে কাহিনী থেকে সরে আসার অনেক আলামতই পাওয়া যায়।অন্যদিকে সত্যজিৎ সেটার ধারে কাছে না।কারণ তিনি নিজেই একটা ব্রান্ড ছিলেন বৈকি।তবে সন্দীপ রায়ের মেকিং খুব একটা আহামরি লাগেনি।কারণ সত্যজিৎ এমন ভাবেই গল্প সাজিয়েছেন আমার মনে হয় না তাঁর খুব মাথা খাটাতে হয়েছে ফেলুদা নিয়ে।ফেলুদার বাইরে তাঁর সৃষ্টি দেখার অপেক্ষায় আছি।দেখি তিনি নিজের স্বকীয়তায় কি করতে পারেন।
এখন আসি ফেলুদা বা প্রদোষ মিট্টির এ।সৌমিত্র থেকে সব্যসাচী আমার মতে সত্যজিৎ এর ফেলুদার চরিত্রে এঁরাই একবারে আদর্শ।তবে আমার সৌমিত্রের চেয়ে সব্যসাচী কে যথেষ্ট ক্ষুরধার আর সচল,পারফেক্ট মনে হয়েছে।৬ ফুট ২ ইঞ্চি লম্বা বাঙালী নায়ক পাওয়া আসলে ভাগ্যের ও ব্যাপার বটে।সব্যসাচীর তরুণ বয়সের ফেলুদা অর্থাৎ “বাক্স রহস্যে” যাকে আমরা পাই,বলতে গেলে তার অবয়ব গল্পে পড়া ফেলুদার সাথে একে বাড়েই মিলে যায়। তবে সব্যসাচী ঘোষণাই দিয়ে বসেছেন যে তিনি আর ফেলুদা হচ্ছেন না।গল্পের ফেলুদার তো বয়স বাড়ে না বাস্তবের ফেলুদার তো বয়স বাড়ে বৈকি।এখন দেখার বিষয় এর পরের ফেলু মিত্তির কে হন।
এবার আসি তোপসে তে।সত্যজিৎ এর ফেলুদা গল্পে তোপসে লেখক নিজেই।অর্থাৎ সত্যজিৎ ভাবতেন তিনিই তোপসে।এটা অবশ্য আমি মনে করি।তাঁর লেখায় তোপসে কে যত প্রাণবন্ত আর চৌকস লাগে কোন মুভিতে আজ অব্দই ঐ ভাবে তোপসে কে পাইনি।এটা আসলে সত্যজিৎ থেকে সন্দীপ সকলেরই ব্যর্থতা।এখন মন্দের ভালো খুঁজে হলে বলবো,পরমব্রতকে যা একটু ভালো লেগেছে অভিনয়ে।আর ছোট বেলা বিটিভিতে শাশ্বত চ্যাটার্জির তোপসে চরিত্রে খারাপ লাগেনি।বাক্স রহস্য মুভিটা ( এটা টিভির জন্য বানানো)তে সব্যসাচী আর তোপসের কেম্যাস্ট্রী আমার কাছে সবচেয়ে পারফেক্ট মনে হয়েছে।আর শেষ যে দুটো ফেলুদায় অর্থাৎ গোরস্থানে সাবধান আর রয়েল বেঙ্গল রহস্যে যেই তোপসে কে দেখলাম,ঐটা দেখে পুরোপুরি হতাশই হয়েছি।
এবার বলি জটায়ু কথন।বিভুদা আমার মতে জটায়ু চরিত্রে ভালো ভাবে উৎরে গেছেন।তাঁর সব মুভমেন্ট ফেলুদার মুভিতে শীতল পরশ যোগায়।তবে আমার সব সময়ই মনে হয়েছে এই ফেলুদা আর জটায়ুর মধ্য অদৃশ্য দেয়াল আছে।আর একজন আছেন জটায়ুতে তিনি হচ্ছে রবি ঘোষ।তাঁর অভিনয় আমাকে বাক্স রহস্যে মুগ্ধ করে দিয়েছে।তবে বিভু ভট্টাচার্য রবি ঘোষের কাছে হেরে গেছেন আমার কাছে অন্তত তাই মনে হয়েছে।বিভুদা রয়েল বেঙ্গল রহস্য এর শুটিং ডাবিং শেষ হওয়ার পর মৃত্যু বরণ করেন।ঠিক তেমনি রবি ঘোষ ও কোন এক ফেলুদার শুটিং ডাবিং শেষ করে মৃত্যু বরন করেন।বলতে গেলে কাকতালীয়।তবে এর মধ্য কেমন যেন রহস্য পেলাম।
ভাবনা গুলো একান্ত আমার,মিল অমিল হতেই পারে।ভুল হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
এখন ফেলুদার আজ অব্দই সকল মুভির ডাউনলোড লিংক দিচ্ছি
সোনার কেল্লা

ডাউনলোড লিংক
বাক্স রহস্য

ডাউনলোড লিংক
Password : lordshaw
জয় বাবা ফেলুনাথ

ডাউনলোড লিংক
বোম্বাইয়ের বোম্বেটে

ডাউনলোড লিংক
কৈলাসে কেলেঙ্কারি

ডাউনলোড লিংক
টিনটোরেটোর যীশু

ডাউনলোড লিংক
গোরস্থানে সাবধান

ডাউনলোড লিংক
রয়েল বেঙ্গল রহস্য

ডাউনলোড লিংক
ডা: মুনসীর ডায়রি


ফেলুদাকে নিয়ে অন্জন দত্ত কবীর সুমনের গান




বিস্তারিত পড়ুন ... »

৩০ নভে, ২০১১

সত্যজিতের ‘ফেলুদা’ সমগ্র : এখন পর্যন্ত প্রকাশিত সকল সিনেমা, ইবুক,কমিকস্‌, অডিও নাটক এর মেগা কালেকশন


অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় কেউ সত্যজিতের ফেলুদা পড়েনি এমনটা কখনো শুনা যায় না, কি নেই এতে…রহস্য, অ্যাডভেঞ্চার, সাসপেন্স সহ আরও অনেক কিছু। বাংলার এই সেরা গোয়েন্দা কাহিনীর মোট ৩৫ টি গল্প আছে, প্রতিটি গল্প পড়ার সময় যেন একধরনের থ্রিলিং তৈরী হয়। এই গল্প গুলো নিয়ে এখন পর্যন্ত সাতটি সিনেমা তৈরী হয়েছে, এছাড়া রেডিও মিরচী তে এর কিছু গল্প নিয়ে অডিও নাটক হয়েছে। ওয়েব জগতে পাওয়া সকল ফেলুদার ইবুক, কমিকস্‌, নাটক, অডিও নাটকের লিংক দিয়ে দিলাম, তো দেরী না করে ডাউনলোড শুরু করুন B-)
ফেলুদা’র গোয়েন্দাদিরি :
ইবুক 582 KB
অডিও নাটক 54MB
বাদশাহী আংটি :
ইবুক 5.76 MB
শেয়াল-দেবতা রহস্য :
কমিকস্‌ ইবুক 8.6 MB
অডিও নাটক 58.3 MB
গ্যাংটকে গন্ডোগোল :
কমিকস্‌ ইবুক 15 MB
সোনার কেল্লা :
সিনেমা (৪ পার্ট ) 777 MB
বাক্স রহস্য :
ইবুক 3.722 MB
সিনেমা :
পার্ট ১
পার্ট ২
পার্ট ৩
পার্ট ৪
পার্ট ৫
পার্ট ৬
পার্ট ৭
পার্ট ৮ ( 700 MB )
সমাদ্দারের চাবি :
অডিও নাটক 65.56 MB
কৈলাসে কেলেঙ্কারি :
সিনেমা :
পার্ট ১
পার্ট ২
পার্ট ৩
পার্ট ৪
পার্ট ৫ ( 700 MB)
রয়েল বেঙ্গল রহস্য :
ইবুক 4.4 MB
অডিও নাটক 43.48 MB
জয় বাবা ফেলুনাথ :
ইবুক 1.77 MB
সিনেমা ( 8 part) 771 MB
ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা :
ইবুক 1.51 MB
অডিও নাটক 52.23 MB
বোম্বাইয়ের বোম্বেটে :
সিনেমা :
পার্ট ১
পার্ট ২
পার্ট ৩ 450 MB
গোঁসাইপুর সরগরম :
কমিকস্‌ ইবুক 10.49 MB
গোরস্থানে সাবধান :
সিনেমা :
পার্ট ১
পার্ট ২ 350 MB
গোলকধাম রহস্য :
ইবুক 1.68 MB
অডিও নাটক 84.07 MB
নেপোলিয়নের চিঠি :
কমিকস্‌ ইবুক 13.43 MB
টিনটোরেটোর যীশু :
সিনেমা 700 MB
জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা :
কমিকস্‌ ইবুক 10 MB
অডিও নাটক 61.53 MB
এবার কান্ড কেদারনাথে :
কমিকস্‌ ইবুক 4.73 MB
শকুন্তলার কন্ঠাহার :
ইবুক :
পার্ট ১ 1.19 MB
পার্ট ২ 2.71 MB
ডা: মুনসীর ডায়রি :
অডিও নাটক 68.08 MB
সিনেমা 357 MB
লন্ডনে ফেলুদা :
ইবুক 2.36 MB
রবার্টসনের রুবি :
কমিকস্‌ ইবুক 25.34 MB
(ছিন্নমস্তার অভিশাপ + সোনার কেল্লা + ডা: মুনসীর ডায়রি) ইবুক 25.931 MB
অসমাপ্ত ফেলুদা ইবুক 923 KB
(সব ফেলুদা সিনেমা একসাথে) টরেন্ট 5.18 GB
এখানে দেওয়া সকল লিংক নেট থেকে সংগ্রহিত, কোন লিংকে সমস্যা হলে জানাবেন।
হ্যাপ্পী ডাউনলোডি





http://www.somewhereinblog.net/blog/manob_shontan/29447909
বিস্তারিত পড়ুন ... »

১৮ নভে, ২০১১

বাংলা সাহিত্যের রহস্যপুরুষের সাক্ষাৎকার

কাজী আনোয়ার হোসেনের এই এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারটি এবারের ইত্তেফাক ঈদুল আযহা সংখ্যা ২০১১ তে প্রকাশিত হয়েছে। আগ্রহী পাঠকদের জন্য এখানে তার পুরোটাই দিলাম।

প্রশ্ন : ৪০০-এর ঘর পেরিয়েছে আপনার মাসুদ রানা, তার স্রষ্টা আপনি কাজী আনোয়ার হোসেন এখন পা রেখেছেন ৭৬-এ। প্রশ্নটা এখানে না, আমরা জানি পুরোপুরি মৌলিক কাহিনি নিয়ে যাত্রারম্ভ করেছিল আপনার এ সিরিজটি। তখন পর্যন্ত আমাদের এখানে গোয়েন্দাকাহিনি বলে কিছু ছিল না, আর স্পাই থ্রিলার তো এখনো বাংলা ভাষাতেই রচিত হয়নি আর। আপনি নিজেও গতানুগতিক একটা কাহিনি ‘কুয়াশা’ দিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলেন। ‘কুয়াশা’ ছিল ট্রাডিশনাল একটা রচনা। আমরা জানতে চাই, ‘কুয়াশা’ থেকে ‘মাসুদ রানা’ রচনা করতে এসে দুটি সিরিজের মধ্যে এই মেরুদূরত্ব রচনা কিভাবে আপনি সম্ভব করেছিলেন?
উত্তর : শৈশবে শ্রী হেমেন্দ্র কুমার রায় (যকের ধন, আবার যখের ধন, ঘটোত্কচ, নৃমুণ্ডশিকারী ইত্যাদি); শ্রী নীহাররঞ্জন গুপ্ত (কালো ভ্রমর, ইস্কাবনের টেক্কা, কালো হাত ইত্যাদি); শ্রী শশধর দত্ত (দস্যু মোহন) এবং আরও অনেক নাম-ভুলে-যাওয়া সুলেখক তাঁদের লেখার জাদু দিয়ে আমাকে একেবারে পাগল করে দিয়েছিলেন। সেই আদলেই আঠারো বছর বয়সে লিখতে শুরু করেছিলাম কুয়াশা সিরিজ। আর সেগুলো ছাপতে শুরু করি পড়ালেখা শেষ করে প্রেস ব্যবসায় নেমেই—১৯৬৪ সালে।
কিছু কিছু প্রশংসাও পাচ্ছিলাম। প্রথম ৩টি বই ছাপার পর সদ্যপরিচিত এক শিকারি বন্ধু, করাচি-লাহোরে মানুষ, জার্মানিফেরত মাহবুব আমিনকে দিয়েছিলাম পড়তে। আমি লেখালেখি করি শুনে তিনিই চেয়ে নিয়েছিলেন। তিনি তখন লাহোরের আরজিএ ট্র্যানজিস্টার রেডিও কোম্পানির ঢাকা-ম্যানেজার। পরদিন ফোন পেয়ে তাঁর অফিসে গেলাম। মনে আশা, খুব প্রশংসা করবেন বুঝি।
কিন্তু চা খাওয়ার ফাঁকে তিনি যা বললেন তাতে একেবারে হকচকিয়ে গেলাম। বললেন—মন্দ না, ভালোই। তবে পড়ে বোঝা যায়, আধুনিক রহস্য-সাহিত্য সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণাই নেই। আপনি জানেন না আজ কোথায় পৌঁছে গেছে বিশ্ব রহস্য-সাহিত্য। গড় গড় করে কয়েকটা নাম বলে গেলেন—এদের লেখা পড়েছেন? মাথা নাড়লাম। পড়ব কী, নামই শুনিনি কখনো।
চেহারা দেখে তিনি বুঝলেন আমার মনের অবস্থা। বললেন, কিছু মনে করবেন না। কথাগুলো আপনাকে দুঃখ দেওয়ার জন্য বলিনি। নির্জলা সত্যি কথা বলেছি। না বললে নিজের কাছেই ধোঁকাবাজ, অসত্ লোক মনে হতো আমার নিজেকে। চা শেষ করে উঠছি, তিনিও উঠলেন—চলুন, আপনাকে একটা বই প্রেজেন্ট করব। ওটা পড়লেই আমার কথাগুলো পরিষ্কার হয়ে যাবে আরও।
ওঁর ছোট্ট ফিয়াট সিক্স হানড্রেড গাড়িতে করে আমাকে নিয়ে গেলেন স্টেডিয়ামের একটা বইয়ের দোকানে। আড়াই টাকা দিয়ে কিনে দিলেন তখনকার ক্রেজ ইয়ান ফ্লেমিঙের ডক্টর নো। বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় নিয়ে গেলাম বইটা। একটানা পড়ে রাত দশটায় শেষ করলাম বই। লজ্জাই হলো। হাড়ে হাড়ে টের পেলাম মানের তারতম্য।
শুরু হলো অনুশীলন। তারই ফলাফল একে একে ধ্বংস-পাহাড়, ভারত নাট্যম, স্বর্ণমৃগ এবং পরবর্তী ৪১০টি মাসুদ রানা।
প্রশ্ন : কুয়াশা প্রকাশিত হয়েছিল সেগুনবাগান প্রকাশনী থেকে, যা পরে সেবা প্রকাশনীতে রূপান্তরিত হয়। আমরা জানি, বাবার কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে ১৯৬৩ সালে আপনি এই সেগুনবাগান প্রেস চালু করেছিলেন। তখন আপনি লিখতেন বিদ্যুত্ মিত্র নামে। সেগুনবাগান প্রেস ও প্রকাশনী প্রতিষ্ঠা, বিদ্যুত্ মিত্র থেকে কাজী আনোয়ার হোসেনে ফিরে আসার ওই ঘটনাগুলো যদি একটু বিস্তারিত বলতেন।
উত্তর : এমএ পাশ করার পর কিছুদিন গান-বাজনা নিয়ে সুখে কাটল, তারপর বড়রা ধরে বিয়ে দিয়ে দিলেন। পড়লাম বিপদে। অনেক আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, চাকরি করব না; রোজ রোজ নটা-পাঁচটা অফিস করা আমার ধাতে সইবে না। তা হলে কী করব? রোজগার তো করতে হবে। ভেবে-চিন্তে স্থির করলাম, প্রেস ও প্রকাশনী ব্যবসা করব, নিজের লেখা নিজে প্রকাশ করব নিজের প্রেস থেকে। শুরু করলাম সেগুনবাগান প্রেস, সেইসঙ্গে প্রকাশনী। কিন্তু নামটা জুতসই লাগছিল না। কিছুদিন পর সেগুনের ‘সে’ আর বাগানের ‘বা’ নিয়ে জন্ম হলো সেবা প্রকাশনীর। শুনতে ভালো, সবাই পছন্দ করল; তাই থাকল ওই নামই।
আর আমার নামের ব্যাপারটা… তখন রেডিও-টিভি-সিনেমায় গান গাইতাম কাজী আনোয়ার হোসেন নামে। চেয়েছিলাম পাঠক আমাকে অন্য নামে চিনুক, তাই ছদ্মনাম নিয়েছিলাম বিদ্যুত্ মিত্র। পরে যখন গান-বাজনা ছেড়ে নিয়মিত লেখালেখি শুরু করলাম, তখন আর ছদ্মনামের প্রয়োজন থাকল না।
প্রশ্ন : এবার একটু আপনার শৈশব-কৈশোরের কথা শুনি, একটা গল্প প্রচলিত আছে যে, আপনি তখন সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুলের ক্লাস ওয়ানের ছাত্র। বাংলার স্যার ‘নির্বোধ’ দিয়ে বাক্য রচনা করতে বললে আপনি লিখেছিলেন, ‘আমার বাবা একটি নির্বোধ’। আমাদের কি বলবেন ওই গল্পটা বড় মানুষকে নিয়ে বানানো গল্পগুলোর একটা, না সত্যি আপনি ওই বাক্যটা লিখেছিলেন?
উত্তর : আমিই লিখেছিলাম। ঘটনা সত্য। টিচার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, নির্বোধ শব্দটির মানে জানো? আমি বলেছিলাম, জানি, স্যার। বোকা।
আসলে আমিই ছিলাম নির্বোধ। জানতাম না আমার আপনভোলা, সহজ-সরল পিতাকে আমার মা বোকা বলতে পারেন; আমি পারি না।
প্রশ্ন : বাবা ড. কাজী মোতাহার হোসেন আপনার এবং আপনার ভাইবোনদের মেধা, মনন ও মানসিকতার উত্কর্ষ সাধনে কী ভূমিকা রেখেছিলেন?
উত্তর : হ্যাঁ। প্রচুর। আমাদের সবার চাহিদার প্রতি নজর ছিল তাঁর।
প্রশ্ন : আপনার মায়ের কথা কিছু বলুন, ওনার নাম তো সাজেদা খাতুন?
উত্তর : হ্যাঁ। তিনি ছিলেন পশ্চিম বাংলার মানুষ। হুগলির শামসুল ওলামা মৌলানা ফজলুর রহমানের নাতনী। পিতা ফায়েজুর রহমান কলকাতা শহরেই সেট্ল্ করেছিলেন। সে-সময়ে ওখানকার অনেক মুসলিম পরিবারে বাংলার চেয়ে উর্দুর চল ছিল বেশি। মার লেখাপড়া বেশিদূর এগোয়নি, বাড়িতেই যেটুকু যা। সেটা যে খুব কম ছিল তাও বলা যায় না, কারণ বিয়ের আগেই তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাধারানী’ ও ‘যুগলাঙ্গুরীয়’ উপন্যাস দুটি উর্দুতে অনুবাদ করেছিলেন।
অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু তখন থেকেই তিনি স্বামীর সংসারের সমস্ত বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। যার ফলে আব্বা নিশ্চিন্ত মনে তাঁর লেখাপড়া ও গবেষণার কাজে পরিপূর্ণভাবে মনোনিবেশ করতে পেরেছিলেন।
প্রশ্ন : বাবা বা মায়ের কোনো বিশেষ গুণ কি আপনাকে আকৃষ্ট করত?
উত্তর : হ্যাঁ। বাবার বিচক্ষণতা, ধৈর্য, ন্যায়নিষ্ঠা ও অধ্যবসায় দেখে অনেক কিছু শিখেছি। আর মা ছিলেন খুব বড় মনের মানুষ। অকুণ্ঠ স্নেহ ও নিরাপত্তা বলয় দিয়ে ঘিরে রাখতেন কাছের সবাইকে।
প্রশ্ন : সাত বোন ও চার ভাইয়ের এক বিশাল পরিবার ছিল আপনাদের, ভাইবোনদের মধ্য থেকে কারও কথা কি বলবেন, যিনি আপনাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত বা পরিচালিত করেছেন?
উত্তর : বাবা ছিলেন ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, মুক্তবুদ্ধির মানুষ। তিনি আমাদের সবাইকে নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিয়েছিলেন, সাহায্য চাইলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, কিন্তু প্রভাবিত বা পরিচালনার চেষ্টা করেননি। আমরা ভাই-বোনেরাও চাপমুক্ত পরিবেশে যে-যার মতো করে বিকশিত হয়েছি। সেজন্য সবাইকে মেলা পরিশ্রম করতে হয়েছে, কষ্ট করে গড়তে হয়েছে নিজেদের—কেউ কারও ওপর প্রভাব বিস্তারের সময় বা সুযোগ পাইনি।
তবে এখানে আমার সেজো বোন খুরশিদা খাতুনের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তিনিই প্রথম আমাকে লেখালেখিতে উত্সাহ দিয়েছিলেন। তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। তাঁরই উত্সাহে নিয়মিত ডায়েরি লিখেছি বহুদিন। তিনিই সেই ডায়েরিটা লাল-নীল সুতো দিয়ে নিজ হাতে সুন্দর করে বানিয়ে দিয়েছিলেন। নিয়মিত লিখতে লিখতেই লেখার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করা আমার জন্য অনেকটা সহজ হয়ে এসেছিল।
প্রশ্ন : সেইন্ট গ্রেগরিজ থেকে জগন্নাথ কলেজ, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় পড়াশোনা শেষ করে গান গাওয়াকেই পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। পরিবারে সংগীত চর্চা ছিল আপনাদের, আপনার বোন সন্জীদা খাতুন ও ফাহমিদা খাতুন এখনো রবীন্দ্রসংগীতে অনন্য জায়গা দখল করে আছেন। আপনার স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিনও একজন বিখ্যাত শিল্পী, আপনাদের বিয়ে হলো ১৯৬২ সালে, ১৯৬৩ সালে আপনার প্রেস ও প্রকাশনীর যাত্রারম্ভ হলো এবং তার কয়েক বছরের মধ্যে আপনারা দু জনই গানটা পুরোপুরি ছেড়ে দিলেন। কেন ছাড়লেন—এটা অনেকেরই জানার আগ্রহ রয়েছে।
উত্তর : ফরিদা ইয়াসমিন কিন্তু ঠিক ছাড়েননি, এখনো এক-আধটা গান করেন। তবে কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন ছেলে-মেয়ে-সংসারের চাপে। আমি সত্যিই ছেড়েছি। নতুন একটা পেশা ও সেইসঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে গিয়ে বুঝেছি, আমার মতো সাধারণ একজন মানুষের জন্য একসঙ্গে অনেক কাজ করতে যাওয়া উচিত নয়। লেখালেখি, গান, ব্যবসা—তিনটেই তো আসলে হোলটাইম জব, তাই একটাকে বিসর্জন দিতেই হলো।
প্রশ্ন : ফরিদা ইয়াসমিনের সঙ্গে পরিচয় হলো কিভাবে? আসলে আমরা আপনাদের দু জনের সম্পর্ক গড়ে ওঠার গল্পটা জানতে চাইছি।
উত্তর : গল্প ছোটই। পরিচয় গান গাইতে গিয়ে রেডিও স্টেশনে। আমি তাঁর প্রতি আকর্ষণ বোধ করতাম মিষ্টি গলা ও সুন্দর চোখের কারণে। তিনি কেন… কে জানে! কী করে যেন একদিন মন দেয়া-নেয়া হয়ে গেল। তারপর দু জনেই অপ্রস্তুত অবস্থায় ঝাঁপ দিলাম সংসার সমুদ্রে।
প্রশ্ন : আপনার লেখালেখির কথাতেই ফিরি। যখন রহস্য-সাহিত্য নিয়ে এ অঞ্চলে অর্থাত্ পূর্ববঙ্গে সিরিয়াস ধারার সাহিত্য সমালোচকদের নাক সিঁটকানো ভাব ছিল, তখন কাজী আনোয়ার হোসেন কোন ভিতের ওপর নির্ভর করে মাসুদ রানার মতো এক রহস্যময় চরিত্র নির্মাণ করার স্বপ্ন দেখলেন? বর্তমানে আপনি নিজের সৃষ্ট চরিত্রের সাফল্য দেখে কেমন বোধ করেন?
উত্তর : বিরাট কোনো সাফল্য অর্জন আসলে করিনি। যা-ই হোক, ভিত আর কিছুই নয়—আমার আত্মবিশ্বাস। আমি লেখালেখির ব্যাপারে কখনো কারও সমর্থন বা আনুকূল্য চাইতে যাইনি। জানতাম, রথী-মহারথীদের কাছে গেলেই তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত হতে হবে—আমি আর নিজের মতো লিখতে পারব না। আমার যা ভালো লেগেছে আমি আসলে সেই কাজটাই করেছি, কারও মুখাপেক্ষী হইনি। কারও প্রশংসার জন্য যদি কাজ করতাম, তা হলে তাঁদের বাঁধাধরা পছন্দের পথে চলতে হতো—তাতে আমার সন্তুষ্টি হতো না।
আর নাক সিঁটকানোর ব্যাপারে আর কী বলব, এটা তো জানা কথাই, কোনোদিন সব মানুষের প্রিয় হওয়া যায় না। সবকিছু সবার ভালো লাগতে পারে না। মানুষে মানুষে রুচির ভিন্নতা আছে বলেই না তৈরি হয়েছে এত মত, এত পথ। আসল কথা, আমি দেখব, যা করছি সেটা অন্যায় কিছু কি না, এবং করতে আমার ভালো লাগছে কি না। আমার ভালো লাগে তাই রহস্যোপন্যাস, রহস্যগল্প লিখেছি; এক শ্রেণীর পাঠকের কাছে সেটা ভালো লেগেছে বলে তারা পড়েছে; আরেক শ্রেণী পছন্দ করেনি বলে পড়েনি। ব্যস, মামলা শেষ। কারও কাছেই যদি ভালো না লাগত, কেউ যদি না পড়ত, তবে কবে ছাঁটাই হয়ে যেতাম! আমি খুশি যে কারও তোয়াক্কা না করে নিজের কাজ করে গেছি। যদি সমালোচনার ভয়ে পিছিয়ে যেতাম, তা হলে অনেক মানুষ অনেক আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতো। আমি নিজেও অপরিপূর্ণ থেকে যেতাম।
প্রশ্ন : মাসুদ রানা সিরিজের তৃতীয় বই ‘স্বর্ণমৃগ’। ওই বইটি প্রকাশের পর সেই সময়কার বিখ্যাত সাময়িকী ‘সচিত্র সন্ধানী’ আপনার কলম কেড়ে নিয়ে হাতে আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছিল। তাঁদের আপত্তির মূল বিষয় ছিল, আপনি মাসুদ রানার মাধ্যমে খোলামেলা যৌনতা নিয়ে এসেছিলেন। যতদূর জানি আপনি তখন সন্ধানীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে হেরে গিয়েছিলেন এবং উল্টো সরকারিভাবে ‘স্বর্ণমৃগ’ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ওই ঘটনাটা সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
উত্তর : হ্যাঁ, খুব খেপে যাওয়ার ভান করেছিল সচিত্র সন্ধানী। কিন্তু আমি তাঁদের ভিতরটা ঠিকই দেখতে পেয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, তাঁদের প্রকাশিত যৌনতা-নির্ভর উপন্যাস ‘খেলারাম খেলে যা’র দিক থেকে মানুষের নজর অন্যদিকে ফিরাবার জন্য তাঁরা আমাকে টার্গেট করেছিলেন; শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ধারক-বাহক-রক্ষকের ভঙ্গি নিয়ে কাউকে আক্রমণ করার খুব প্রয়োজন ছিল তাঁদের।
শুধু আগুনের ছ্যাঁকা নয়, পল্টন ময়দানে আমাকে উলঙ্গ করে বেঁধে বেত মারার প্রস্তাবও ছিল তাঁদের। সেজন্য আমি মানহানির মামলা করতে বাধ্য হয়েছিলাম। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তাঁরা প্রভাব খাটিয়ে আমার বইটি নিষিদ্ধ করিয়ে দিলেন। আমি সেই সরকারি দপ্তরের বিরুদ্ধে আইনি নোটিস পাঠালাম, যার ফলে বইটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলো। কিন্তু সেটা হাতে পাওয়ার আগেই কোর্টের রায় আমার বিরুদ্ধে চলে গেল। সন্ধানীর পক্ষে প্রায় পনেরো-বিশজন বাঘা বাঘা উকিল হাজির হয়ে জজ সাহেবকে বোঝালেন, যেহেতু সরকার আমার বইটিকে নিষিদ্ধ করেছে, সেহেতু ওটি খারাপ, এবং সে- সম্পর্কে সচিত্র সন্ধানী যা বলেছে সেটা ঠিকই আছে, মানহানিকর কিছুই হয়নি। আমার উকিল মিন মিন করে দুর্বল কণ্ঠে বললেন—সরকার ওই আদেশ তুলে নিয়েছেন, আগামী কালই আমরা সরকারি চিঠি দেখাতে পারব। জজ সাহেব শুনে বললেন—বেশ তো, আগামীকাল আবার কেস করবেন।
আমার আর অত ঝামেলা করার প্রবৃত্তি হয়নি। তবে স্বর্ণমৃগ এখনো নির্বিঘ্নে চলছে বাজারে।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ছে। সেইসব বড় বড় উকিলের মধ্যে আমাদের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানও ছিলেন। তিনি আমাকে বারান্দার একপাশে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘নবাব (আমার ডাক নাম), আমি বলি কী, কেসটা উঠিয়ে নাও… পারবে না। বলো তো কমেপ্রামাইজ করিয়ে দিই।’ আমার তখন মহা রাগ, অপমানে গা জ্বলছে। বললাম, ‘জিল্লুর ভাই, ও আমাকে ইত্যাদি ইত্যাদি…’ তিনি হেসে বললেন, ‘আমি সবই জানি।’ কিছুতেই রাজি হচ্ছি না দেখে শেষে বললেন, ‘হেরে যাবে। যা-ই হোক, বইটা লিখেছ কিন্তু দারুণ!’ এই একটি কথায় তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা বোধ করেছিলাম সেদিন।
প্রশ্ন : প্রথম দু-তিনটা বইয়ের পরই শুরু হলো ভাবানুবাদ বা অ্যাডাপটেশন। রানার কাহিনি সংগ্রহ করা হয়েছে অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলিন, জেমস হেডলি চেজ, রবার্ট লুডলাম, উইলবার স্মিথ, ক্লাইভ কাসলার, হ্যামন্ড ইনস, ডেসমন্ড ব্যাগলি, ইয়ান ফ্লেমিংসহ অসংখ্য লেখকের বই থেকে। মৌলিক রচনা দিয়ে শুরু করে চলে এলেন অ্যাডাপটেশনে। আপনার কি মনে হয়, মাসুদ রানা দিয়ে যে ধারার সূত্রপাত করেছেন, তা আমাদের রহস্যসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে পেরেছে?
উত্তর : আমার মনে হওয়ার কোনো গুরুত্ব বা মূল্য আছে বলে মনে করি না। আমি তো সমালোচক, বিচারক বা পাঠক নই। লেখক মাত্র।
আসল কথাটা বলি, আমি সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের সন্তান, লেখালেখিতে কিছুটা হাত ছিল। আমার পক্ষে দু-চারটে স্পাই থ্রিলার লিখে ফেলা কঠিন কিছু ছিল না, কিন্তু বিদেশি কাহিনির সাহায্য ছাড়া ৪১৩টা মাসুদ রানা লিখে নামাতে হলে আমার সময় লাগত কমপক্ষে ৪০০ বছর। সেই কারণেই আমার অ্যাডাপটেশন, বিদেশি কাহিনির অবলম্বন। এসব কাহিনি লিখতে হলে বিশাল ও বিচিত্র অভিজ্ঞতার ঝুলি থাকতে হয়, আমার পক্ষে সে অভিজ্ঞতা অর্জন করা কোনোক্রমেই সম্ভব ছিল না—সত্যি বলতে কী, কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। ইংরেজি সাহিত্যেও বড় বড় থ্রিলার রাইটারের মৌলিক লেখার সংখ্যা ১২-১৪টির বেশি নয়।
আমার অ্যাডাপটেশন যে ধারার সূত্রপাত করল সেটা ভালো কি মন্দ, পড়ে ভালো লাগে কি লাগে না, বা এর ফলে আমাদের বাংলা রহস্য-সাহিত্য সমৃদ্ধ হলো কি হলো না—এসবের বিচার করবে, রায় দেবে পাঠক ও উপযুক্ত সমালোচক—এ বিষয়ে আমার কিছুই বলার নেই।
প্রশ্ন : তারপরেও কথা রয়ে যায়, কাজী আনোয়ার হোসেন মূল কাহিনি অনুসরণের পাশাপাশি গিলটি মিয়ার মতো চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। গিলটি মিয়া তো একাই ১০০। আছে রানার আদি-অকৃত্রিম ভালোবাসার মানুষ সোহানা, প্রাণের চেয়ে প্রিয় বন্ধু সোহেল, রাঙার মা, ইদু মিয়ারাও। আচ্ছা, আজকাল কি এই চরিত্রগুলোকে পাওয়া যায় না, নাকি খুব একটা মাসুদ রানা পড়ছি না এখন।
উত্তর : ওসব চরিত্র আপনার ভালো লেগেছিল জেনে ভালো লাগছে। ওইটুকুই আমার সার্থকতা। কেন, ওদের কেউ না কেউ তো প্রায় বইয়েই থাকছে। তা হলে কি আপনি…
প্রশ্ন : আমরা জানি, অনেক গোস্ট লেখক মাসুদ রানা লিখেন, শুরুর দিকে বোধ হয় প্রিন্টার্স লাইনে এঁদের কারও কারও নামও যেত, আপনি কি তাঁদের সবার নাম জানাবেন? নিদেনপক্ষে মাসুদ রানা নির্বাচন থেকে বই প্রকাশ সম্পর্কিত প্রক্রিয়াটি একটু বলুন।
উত্তর : প্রক্রিয়াটি এই রকম : কাহিনি বাছাই করি আমি, নিজেই বিস্তারিত একটা খসড়া তৈরি করি অথবা এককালীন বা মেয়াদি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে উপযুক্ত কাউকে সে কাজের ভার দিই। তারপর সেই খসড়াটি নিজ হাতে কাটাকুটির মাধ্যমে অনেক যোগ-বিয়োগ ও পরিবর্তনের পর একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে পরিণত করে ছাপতে দিই প্রেসে। কারও খসড়ায় সংশোধনের প্রয়োজন কম হয়, কারোটায় আবার গোটা কাহিনিই আমাকে রি-রাইট করতে হয়।
এই হচ্ছে মাসুদ রানার জন্ম বৃত্তান্ত।
সৌজন্যবশত কোনো কোনো ‘ভূত লেখক’ (গোস্ট রাইটার)-এর নাম একসময়ে মাসুদ রানার ভেতরের পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল বটে, কিন্তু এখন আর হয় না। কারণ, কেউ কেউ অর্থের বিনিময়ে রানার খসড়া রচনায় আমাকে সাহায্য করে উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাওয়ার পরেও পরবর্তী সময়ে নিজেই রানার স্রষ্টা হয়ে বসবার চেষ্টা করেছিলেন; আরও টাকার দাবি তুলে কোর্ট-কাচারির হুমকি দিয়ে উকিল নোটিস পাঠিয়েছিলেন। ইদানিং শুনছি কপিরাইট অফিসে দেন-দরবার করে আমার কোনো কোনো বইয়ের স্বত্ব নাকি তাঁরা পেয়েও গেছেন। এবার আমার আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পালা।
কেন কারও নাম বলা সম্ভব হচ্ছে না, বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়ই?
প্রশ্ন : আগেকার মাসুদ রানাতে বেশ একটা বুদ্ধি ও রোমাঞ্চের মারপ্যাঁচ পেতাম, সঙ্গে কাজী আনোয়ার হোসেনের স্বভাবসুলভ লেখনীর ধার তো থাকতোই, কিন্তু ইদানিংকার কিছু রানা সিরিজের বই পড়তে গিয়ে দেখলাম, সেই ঝাঁ-চকচকে চরিত্ররূপায়ণ ও লাস্যময়ী নায়িকাদের ভিড় ঠিকই আছে, অথচ নেই সেই বুদ্ধির খেলা, রহস্যের অদ্বিতীয় বুনোট। এরকমটা কেন?
উত্তর : কারণটা সম্ভবত, ভালো কাহিনির অভাব। অথবা আমার অক্ষমতা।
প্রশ্ন : সেবার একটা নিজস্ব ভাষা আছে, থ্রিলার লিখতে গিয়ে যে ভাষাটা আপনাকে তৈরি করতে হয়েছে। ভাষা তৈরির নেপথ্যের গল্পটা কি আমাদের বলবেন?
উত্তর : প্রথম যখন লিখতে বসলাম, টের পেলাম বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্লাসে দুটো বছর যা শিখেছি সেই ভাষায় কাজ হচ্ছে না। ওই শ্লথ ভঙ্গির ঢিলেঢালা বাংলা অন্য ধরনের রচনার জন্য উপযোগী হলেও আমার বিষয়বস্তু কিছুতেই ফুটিয়ে তুলতে পারছি না। থ্রিলার লিখতে দরকার এমন একটি টান টান ভাষা, যা দ্রুত ঘটে যাওয়া উত্তেজনাপূর্ণ বিপজ্জনক ঘটনাগুলোকে ঠিকমতো ধারণ করতে পারে। লিখি, কাটি আর ছিঁড়ে ফেলি… এভাবে বেশ কিছুদিন প্রচুর পরিশ্রমের পর একটু একটু করে আয়ত্তে আসতে শুরু করল আমার পছন্দসই ভাষাটা। এখনো শিখছি।
প্রশ্ন : কাজী আনোয়ার হোসেন ভাষা তৈরির পাশাপাশি একটা লেখক গোষ্ঠী তৈরি করলেন, তাঁরা হলেন শেখ আবদুল হাকিম, রকিব হাসান, রওশন জামিল, শওকত হোসেন, ইফতেখার আমিন, টিপু কিবরিয়া, নিয়াজ মোর্শেদ প্রমুখ। এই লেখকদের কেউই এখন আর সেবার সঙ্গে নেই। কেন এমনটা হলো?
উত্তর : সেবার বয়স কত হলো তা জানেন তো? সাতচল্লিশ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে অনেকেই এসেছেন সেবার সংস্পর্শে, আবার নানান কারণে ছিটকে চলেও গেছেন একেকজন একেক দিকে। কেউ বিদেশে চলে গেছেন, কেউ সরে গেছেন ভিন্ন পেশায়, কারও চাকরিতে এতই পদোন্নতি হয়েছে যে, অতিব্যস্ততার কারণে লেখা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, কেউ লিখছেন ভিন্ন প্রকাশনীতে, মারাও গেছেন কেউ কেউ, আবার কেউ কেউ এখনো রয়ে গেছেন সেবার সঙ্গেই।
আপনার উল্লিখিত ওই ক’জনই শুধু নন, সেবা পরিবারের আকার আরও অনেক বড়। ওঁরা ছাড়াও সেবা প্রকাশনী আরও এক শ’র বেশি লেখক তৈরি করেছে, যাঁদের প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে এখান থেকেই। কয়েকটি নাম উল্লেখ করছি—আসাদুজ্জামান, খসরু চৌধুরী, জাহিদ হাসান, রোকসানা নাজনীন, মাসুদ মাহমুদ, ইসমাইল আরমান, শামীম হোসেন, অনীশ দাস অপু, শরীফুল ইসলাম ভূঁইয়া, রাহাত খান, সাগর চৌধুরী, শামসুদ্দীন নওয়াব, সুধাময় কর, কাজি মাহবুব হোসেন, মো. মুমিনুর রহমান, বিশু চৌধুরী, কাজী শাহনূর হোসেন, হাসান উত্পল, হিফজুর রহমান, কাজী মায়মুর হোসেন, সেলিম হোসেন টিপু, মামনুন শফিক, মেজর আনোয়ার হোসেন ও এ. এইচ. রনজু, ডা. আলীমুজ্জামান, খন্দকার মজহারুল করিম, আলীম আজিজ, আনোয়ার জাহিদ বাদল, কাজী রওনক হোসেন, বাবুল আলম, বজলুর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান, সাদেকুল আজিজ, মোনা চৌধুরী, জি. এইচ. হাবীব, শাহরিয়ার শামস, হাসি সিদ্দিকী, আসজাদুল কিবরিয়া, মিলা মাহফুজা, সরওয়ার পাঠান, হেলেন নওশীন, শায়লা মমতাজ, আ. ন. ম. হানিফ, সায়েম সোলায়মান, মাসুদ আনোয়ার, ইশতিয়াক হাসান ফারুক, মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ, আবু মাহদী, সেলিনা সুলতানা, সালেহ মো. তানভীর, সুস্ময় আচার্য, ডা. রেজা আহমদ, কাজী সারওয়ার হোসেন, মুশফিকুল আলম, পার্থ তানভীর নভেদ্। আরও অনেকে ছিলেন, এই মুহূর্তে সবার নাম মনে পড়ছে না। কেউ আছেন, কেউ নেই—এটাই বোধহয় জগতের নিয়ম। আমরা সবাই সবার কাছ থেকে সরে যাচ্ছি দূর থেকে দূরে। তারপর একসময় মিলিয়ে যাব, থাকব না আর কেউ।
প্রশ্ন : সেবা প্রকাশনী থেকে এককালে খুবই অসামান্য কিছু ক্লাসিক সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত অথচ মূলের একদম খাঁটি নির্যাসটুকু রয়েছে এমন অনুবাদ-বই বের হয়েছিল, এখন আর সেই সিরিজটি সেভাবে চলমান নেই। সেবার আরও কিছু সিরিজ ছিল বলে মনে পড়ছে—কৌতুক সিরিজ, ক্রীড়া সিরিজ, আজব সিরিজ, সেসব সিরিজ এখন এক্কেবারেই দেখা যায় না। সেবা থেকে এককালে বড়দের রহস্য পত্রিকার পাশাপাশি ছোটোদের জন্য কিশোরপত্রিকা নামে একটা ম্যাগাজিনও বের হতো, সেটাও পরে বন্ধ হয়ে যায়। এগুলো প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে সেবার পিছিয়ে পড়ার দৃষ্টান্ত বলে মনে করতে পারি আমরা?
উত্তর : পারেন। মনে করায় কোনো দোষ নেই। তবে এ-ও স্মরণ রাখতে হবে, সেবা প্রকাশনী কোনো অ্যাকাডেমি নয়, একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে আজ পর্যন্ত দু হাজারেরও বেশি বিভিন্ন ধরনের বই প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু কালের আবর্তে টিকে রয়েছে কেবল কতিপয় ব্যবসাসফল বই ও সিরিজ। অর্থাত্ পাঠক যেগুলো পছন্দ করেননি সেগুলো ঝরে গেছে, রয়েছে কেবল তাঁদের পছন্দের বইগুলো। আমরা ছড়া-কবিতা ছেপেছি, নাটক ছেপেছি, কিশোরপত্রিকা ছেপেছি, ছেপেছি সায়েন্স ফিকশন, শিকার কাহিনি, রহস্য-রোমান্টিক উপন্যাস, কিশোর রোমাঞ্চ, প্রবন্ধ, ছোট গল্প ছেপেছি; এমনকি আমি নিজেও অনেক খেটে-পিটে কিশোর উপন্যাস লিখেছিলাম বেশ কয়েকটি—কিন্তু চলেনি। কাজেই ওসব বাদ পড়েছে। হা-হুতাশ করিনি—পাঠকের ভালো লাগবে বলেই তো প্রকাশনা, না কিনলে সেটা ছাপব কেন?
বিস্তারিত পড়ুন ... »

bdnews24.com - Home

ইরান বাংলা নিউজ

বিবিসি বাংলা

দৈনিক সংগ্রাম