সমাজচিন্তা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমাজচিন্তা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

১৫ মে, ২০১২

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল নিজেই অসুস্থ: জরুরী চিকিৎসা প্রয়োজন

চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৬ সালে। বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় জনসাধারণের চিকিৎসাসেবা প্রদানের মহান লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল বর্তমানে নিজেই মুমুর্ষ অবস্থায় নিপতিত। এখানে প্রতিবছরই নতুন ডাক্তার নিয়োগ হয় এবং বছর শেষে চাকুরী ছেড়ে ডাক্তার চলে যায় অন্যত্র। কর্তৃপক্ষের টাকায় কেনা ঔষধ নিতে একই ব্যক্তিই ভুয়া রোগী হয়ে আসে প্রতিদিন। ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করা হলেও এখানে নেই কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার কিংবা পদ্ধতিগতভাবে কার্যকর আলাদা আলাদা ওয়ার্ড। কোটি টাকা ব্যয়ে পরিচালিত নাম মাত্র পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালটি বর্তমানে শুধুমাত্র প্রাথমিক চিকিৎসার কাজটুকুই করে যাচ্ছে। জরুরী বিভাগে গুরুতর কোন রোগী আসলে তা শুধু অন্যান্য হাসপাতালে রেফার করে দেয়া ছাড়া কর্মরত ডাক্তারদের কিছুই করার থাকে না। বর্তমানে হাসপাতালটিতে সর্বমোট নয়জন মহিলা ডাক্তারসহ আটাশ জন চিকিৎসক এবং একচল্লিশ জন নার্স কর্মরত রয়েছেন। অনুসন্ধান করে জানা যায় পদোন্নতির ব্যবস্থা না থাকা, কর্মরত চিকিৎসকদের পেশাগত উন্নয়নের সুবিধা না থাকা, দুর্নীতি, চিফ মেডিকেল অফিসারের পশ্চাতমুখী চিন্তাধারা এবং সঠিক পরিকল্পনা আর অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে চিকিৎসরা দীর্ঘদিন এই হাসপাতালে অবস্থান করতে অনীহা প্রকাশ করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ডাক্তার বন্দর হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার পদে যোগদান করেছিলেন পঁচিশ বছর আগে। জাতির দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের একজন মেধাবী ছাত্র এমবিবিএস পাশ করে বন্দর হাসপাতালে যে পদে যোগদান করেছিলেন পঁচিশ বছর পর তিনি একই পদে থাকা অবস্থায় অবসর গ্রহণ করছেন গত জানুয়ারীতে। জাতির সেরা মেধাবী ছাত্র হিসেবে ডাক্তারটিরও বিরাট সম্ভাবনা ছিলো কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ / প্রফেসর হয়ে কর্মস্থল থেকে অবসর গ্রহণ করার। শুধুমাত্র পরিবেশ এবং সুযোগের অভাবে তিনি জাতির চাহিদা পুরণে ব্যর্থ হয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা যেমন রয়েছে, তেমনি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষসহ রাষ্ট্রিয় ব্যর্থতাও এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। এখানে কর্মরত চিকিৎসকদের পেশাগত উন্নয়ণে এফসিপিএস কিংবা উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনে নিরুৎসাহিত করার ঘটনাও রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন মহিলা ডাক্তার বন্দর হাসপাতালে যোগদান করার পূর্বে শিশু বিষয়ে এফসিপিএস (শিশু), পার্ট - ১ পাশ এবং চুড়ানত্ম পরীক্ষা দেয়ার জন্য তিন বছর প্রশিক্ষণও সম্পন্ন করেন। বন্দর হাসপাতালে যোগদান করে তিনি দেড় বছর চাকুরী করেছেন, তবুও ছুটি মিলেনি এফসিপিএস ফাইনাল পরীক্ষা দিতে যাওয়ার। অভিযোগ পাওয়া গেছে, বন্দর হাসপাতালের প্রধান মেডিকেল কর্মকর্তা (সিএমও) তার জীবনের বঞ্চনার কথা ষ্মরণ করে বলেছেন, আমি কাউকে এফসিপিএস করার জন্য যেতে দেব না, এফসিপিএস এখানে প্রয়োজন নেই। অথচ বন্দর হাসপাতাল প্রবিধানে বা আইনী কোন বাধা না থাকা সত্ত্বেও তিনি সজোরে বাধা দিয়েছেন অপর মহিলা সহকর্মীর পেশাগত উন্নয়ণে। এ যেন অনেকটা শাশুড়ী তার শাশুড়ী কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে ছেলের বউয়ের উপর প্রতিশোধ নেয়ার মতো। এই ঘটনার পরে অবশ্য অনেক কাটখড় পুড়ে প্রথম ব্যাচ হারিয়ে, অনেক টাকা গচ্ছা দিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে মহিলা ডাক্তারটি তার ন্যায্য পাওনা এফসিপিএস ফাইনাল কোর্সে যোগদানে সমর্থ হয় আরো ছয়মাস পরে। ডাক্তার হয়ে অন্য ডাক্তারের পেশাগত উন্নয়ণে বাধাগ্রস্থ করা কখনো কাম্য হতে পারে না। এখানে যে চিত্র দেখা যায়, নারীর উন্নয়ণে নারীরাই বাধাগ্রস্থ করছে সচেতন কিংবা অবচেতন মনে। এই হীনমন্যতা শুধু বঞ্চিত মহিলা ডাক্তারটির ব্যক্তিগত উন্নয়ণ বাধাগ্রস্থ করেনি, পুরো দেশের নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর উন্নয়ণসহ গোটা জাতির মানবসম্পদ উন্নয়ণে অপুরণীয় ক্ষতি সাধন করবে। এই বাধা চিকিৎসা জগতে একজন নারীর নেতৃত্ব অংকুরেই বিনষ্ট করার সমতুল্য মনে করছেন সচেতন মহল। এই ব্যাপারে অনেক চেস্টা করেও চিফ মেডিকেল অফিসার (সিএমও) অঞ্জনা দত্তের সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। কর্মরত ডাক্তাররা যদি নিজের পেশাগত উন্নয়ণে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করতে না পারেন তাতে ব্যক্তিগত ক্ষতি যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে জাতিয় ক্ষতি। এতে করে দেশ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটে পড়বে এবং একজন মেধাবীর মেধার অপচয়ও ঘটে।

বন্দরে কর্মরত প্রকৌশলীরা অহরহ দেশী-বিদেশী উচ্চতর প্রশিক্ষণ করার সুযোগ পেলেও ডাক্তারদের ক্ষেত্রে চরম উদাসীন্য পরিলক্ষিত হয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বন্দর কর্তৃপক্ষ যন্ত্রের প্রতি যতটা মনোযোগী মানুষের প্রতি ততটা মনোযোগী নয়। যদিও যন্ত্র পরিচালনায় মানুষের সুস্থতা এবং কর্মক্ষমতা নিশ্চিত করা প্রধান শর্ত। সুতারাং বন্দরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রকৌশলীদের কর্মক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখতে হাসপাতালের উন্নয়ণ অপরিহার্য। চবক হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদের পেশাগত উন্নয়ণ ছাড়া হাসপাতালের উন্নয়ণ কখনো সম্ভব নয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বড়মাপের রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্টান। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণমুলক সেবা নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানটির কর্তব্য। বন্দর হাসপাতালে কর্মকতা-কর্মচারীদের পাশাপাশি বন্দর এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন। চবক হাসপাতাল শুরুতে সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও বর্তমানে বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যতীত বাইরের জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়। একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, বন্দরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা স্থাপন এবং রক্ষণাবেক্ষণে স্থানীয় জনগণের অনেক ত্যাগ ও সহযোগিতা রয়েছে। বন্দর হাসপাতালটিতে বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়া বাইরের জনগণের চিকিৎসা প্রাপ্তি বন্ধ করে দেয়ায় চট্টগ্রাম শহরের দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসকারী জনগণ বর্তমানে জরুরী চিকিৎসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভয়ংকরভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। শহরের দক্ষিণভাগে সরকারী কোন গণহাসপাতাল কিংবা ভাল ক্লিনিক নেই যে, উক্ত এলাকার জনগণ বিপদ-আপদ, রাত-বিরাতে জরুরী চিকিৎসা নিতে পারে। সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে, বিশাল অংকের বাজেটে পরিচালিত বন্দর হাসপাতালটিতে বন্দর এলাকায় বসবাসকারী জনগণ নয়, খোদ বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও জরুরী চিকিৎসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির এই যুগে শুনতে হাস্যকর মনে হলেও সত্যি, হাসপাতালটিতে যে ডাক্তার দিয়ে ডায়াবেটিক্স চিকিৎসা প্রদান করেন একই ডাক্তার দিয়ে গাইনী, হৃদরোগসহ সকল রোগের চিকিৎসা পরিচালিত করা হয়। প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতির সেই বিখ্যাত কবিরাজের মতো করে অসহায় চিকিৎসকরা এখানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সচেতন জনগন শুনলে অত্যন্ত মর্মাহত হবেন যে, অর্থ আছে, স্থান আছে, সুযোগ আর সম্ভাবনা সবই আছে শুধুমাত্র পরিকল্পনা আর আন্তরিকতার অভাবে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে হাসপাতালটি।

বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ে কম সুযোগ আর সীমাবদ্ধতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কাঠামো নিয়ে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল। বন্দর হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদের অবস্থা বলা যায় অনেকটা “ফাইস্যা গেছি মন্‌কার চিপায়” ধরণের ত্রাহি অবস্থা। প্রতিবার বছর শুরুতে ডাক্তার নিয়োগ হয় আর অধিকাংশ ডাক্তারই নিঃশর্তে চাকুরী ছেড়ে চলে যান বছর শেষে। আবারও নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি আসে, হাসপাতালটির অবস্থা না বুঝে আবেদন করেন অসংখ্য অভিজ্ঞ বা সদ্য পাশ করা ডাক্তার। বছর জুড়ে চলতে থাকে নিয়োগ প্রক্রিয়া। নিয়োগপ্রাপ্তির বছর না ফুরাতেই তারা বুঝতে পারে পেশাগত জীবন অন্ধকার। পদায়নের সুযোগ না থাকায় সারা জীবন মেডিকেল অফিসার হিসেবেই কালাতিপাত, ফার্মেসীর দোকানদারের মতো বসে বসে ঔষধের নাম লেখা ছাড়া বাইরের চিকিৎসা জগতের কোন কিছুর সাথে তাদের যোগাযোগ করার সুযোগ থাকেনা।বন্দরের যে ধরণের সুযোগ আর অর্থ আছে তা দিয়ে প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশীপ ব্যবস্থায় শহরের দক্ষিণাঞ্চলের জন্য এই হাসপাতালটিকে একটি অত্যন্ত উন্নতমানের মিলিটারী হসপিটাল (সিএমএইচ) এর আদলে রূপান্তর করা সম্ভব। ইতিপূর্বে আমরা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি, বহুবার বহু আঙ্গিকে এই হাসপাতালটিকে আধুনিক যুগপোযোগী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই যাচাই-বাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়া অথবা বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ সৃষ্টি করা ছাড়া কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

বাংলাদেশে বিশেষ করে সরকারী মেডিকেল কলেজে যে সব ছাত্র-ছাত্রী এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হয় তারা নিঃসন্দেহে দেশের সেরা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী। দেশের এই মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে পরিবার, দেশ ও জাতি অনেক কিছু আশা করেন এবং পাওয়ার অধিকারও রাখেন। যে পরিবারের একটি ছেলে কিংবা মেয়ে ডাক্তারী পড়েছেন সে পরিবারই সত্যিকারভাবে বুঝতে পারেন যে, একজন এমবিবিএস ডাক্তার তৈরীতে কী পরিমাণ কাটখড় পোড়াতে হয়। দেশের এই সম্ভবনাময় মেধাগুলোর পেশাদারিত্বের উন্নয়ণ বাধাগ্রন্থ করা, বিশেষজ্ঞ হওয়ার পথ রূদ্ধ করা দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। এটা অনেকটা পেশাগত ডিগ্রি প্রাপ্ত এমবিবিএস ডাক্তারদের অধিকার লংঘন করার শামিল। বন্দরের পাশ্ববর্তী আগ্রাবাদ এলাকায় বেসরকারী উদ্যোগে পরিচালিত চট্টগ্রাম মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল যেভাবে সীমিত সম্পদ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হিসেবে জনগণের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে তা বন্দর কর্তৃপক্ষ অনুকরণ করতে পারেন। একজন এমবিবিএস পাশ ডাক্তার অবশ্যই অধিকার রাখেন; কর্ম দক্ষতা, প্রশিক্ষণ আর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে সহকারী প্রফেসর, প্রফেসর হওয়ার মাধ্যমে নিজেকে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তপক্ষ (চবক) দেশের এধরণের মেধাবীদের বন্দরের লজিং মাস্টারের মতো ফেলে রেখে নিতান্তই তাদের অধিকার খর্ব করছেন, পাশাপাশি দেশের মেধা সম্পদ নষ্ট করছেন - যা মোটেও কাম্য নয়।

বন্দর কর্তৃপক্ষ এই হাসপাতালের মাধ্যমে ক্ষুদ্র আকারের বিশ সিটের একটি মেডিকেল কলেজ ও নার্সিং ইনষ্টিাটউটও চালু করতে পারেন, যাতে করে আমাদের দেশের চিকিৎসক আর নার্স তৈরীর জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা পুরণে সহায়ক হয়। বন্দরে নিয়োগকৃত ডাক্তারদের চাকুরীর বয়স এবং যোগ্যতা সাপেক্ষে প্রমোশনের স্তর সৃষ্টিকরণ, একই ডাক্তার দিয়ে যাবতীয় জটিল রোগের চিকিৎসার সনাতনী পদ্ধতি পরিহার, প্রতিটি ডাক্তারকে আলাদা বিষয়ে নিয়োজিত করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এফসিপিএস ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ তৈরীর পথ সৃষ্টি করা যায়। এধরণের যুগোপযোগী পরিকল্পনা কিংবা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হাসপাতালটির উন্নয়ণ ঘটানো গেলে বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ও আশ-পাশের জনসাধারন যেমন সূ-চিকিৎসার সুযোগ পাবে, তেমনি দেশে সৃষ্টি হবে বিভিন্ন রোগের ভাল ভাল বিশেষজ্ঞ। বন্দর কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনতিবিলম্বে পরিবর্তন না করলে প্রতিবছরই ডাক্তার নিয়োগ হবে আর অল্প ক’দিন পর চলে যাবে অন্যত্র। অবশ্য ডাক্তারদের এই গমনাগমনে বন্দর, দেশ কিংবা চিকিৎসা পদ্ধতির বিশাল ক্ষতি সাধিত হলেও একশ্রেনীর অসাধু দুস্কৃতিকারীর লাভ আছে বলে অনেকেই মনে করেন। বর্তমানে হাসপাতালে যে সমস্ত ডাক্তাররা কর্মরত আছেন তারা অনেকটা পিঞ্জিরাবন্দী পাখি কিংবা বন্দর কর্তৃপক্ষের জায়গীর মাস্টাররের মতো। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে কেনা ঔষধগুলোর নাম লিখাই যেন দেশের এই সেরা মেধাবী মানুষগুলোর কাজ। চট্টগ্রামের সাংসদ, রাজনীতিবিদ, বন্দরের সিবিএ নেতৃবৃন্দ, নৌ-মন্ত্রী, উপদেষ্টাসহ চট্টগ্রামের সচেতন জনগণ, সাংবাদিক ভায়েরা এগিয়ে আসলে পরিবর্তন আশা করা যায়। আসুন আমরা জাতির এই মেধাবী মানুষগুলোর মেধা ধ্বংস করা পরিহার করে মেধাগুলো আরো শানিত করে জাতীয় জীবন সমৃদ্ধ করি । মেধার সন্মান আর যথোপযুক্ত ব্যবহার ছাড়া দেশে মেধার বিকাশ কখনো সম্ভব নয়। আবহাওয়া পরিবর্তন আর ওজন স্তরের ক্ষয় হওয়ায় রোগের প্রকৃতি ও জটিলতা পরিবর্তনের সাথে সাথে চিকিৎসা পদ্ধতি বিশেষায়িত করার কোন বিকল্প নেই।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল নিজেই গুরুতর অসুস্থ: জরুরী চিকিৎসা প্রয়োজন।



সুত্রঃ  http://prothom-aloblog.com/posts/55/158982(ঈষৎ সংক্ষেপিত)


বিস্তারিত পড়ুন ... »

১ ফেব, ২০১২

হাত বাড়াও, বন্ধু

মাস কয়েক আগে প্রথম আলো পত্রিকায় ময়মনসিংহের রিকশাচালক জয়নাল আবেদিনের ওপর একটি প্রতিবেদন বের হয়েছিল। হতদরিদ্র এক দিনমজুর, তিলে তিলে সঞ্চয় করে প্রায় ৩০ বছরের এক টানা সাধনার পর নিজের অর্থে গড়েছেন একটি হাসপাতাল ও একটি স্কুল। অবিশ্বাস্য ঘটনা, কিন্তু সত্যি। বিনা চিকিৎসায় বাবার মৃত্যুর পর জয়নাল শপথ করেছিলেন একটি হাসপাতাল করবেন, যেখানে তাঁর বাবার মতো হতদরিদ্র মানুষ চিকিৎসার সুযোগ পাবে।
সন্দেহ নেই, জয়নাল সাহেবের অক্লান্ত পরিশ্রম ও একাগ্রতার ফসল এই হাসপাতাল। প্রতিবেদনটি ঘনিষ্ঠভাবে পড়লে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। একার কাজ, কিন্তু একা একা এ কাজ তিনি শেষ করেননি। বাবার মৃত্যুর পর সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন জয়নাল। শাহজাহানপুর রেল কলোনির পানির ট্যাংকের কাছে সে সময় তিনি আশ্রয় নিয়েছেন। অসহায় এই মানুষটিকে দেখে এগিয়ে আসেন স্থানীয় এক রিকশা মালিক মোশাররফ। নিজ থেকেই তাঁকে রিকশা চালানোর ব্যবস্থা করে দেন। টিকে থাকার জন্য ৫০ টাকা দেন, কী করে রিকশা চালাতে হয়, তা-ও হাতে ধরে শিখিয়ে দেন।
আরও একজন মানুষ তাঁকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন। রিকশা চালিয়ে যে অল্প-বিস্তর অর্থ জমত, তা আলাদা করে রেখে দিতেন জয়নাল তাঁর স্বপ্নের হাসপাতালের জন্য। খুব চেষ্টায় ছিলেন ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে। সবাই অবজ্ঞাভরে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে, বলেছে, রিকশা চালিয়ে আর কয় পয়সা জমানো যাবে। এমন সময় একজনের কাছ থেকে সাহায্যের আকস্মিক হাত এগিয়ে আসে। সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার সালেহা আক্তার তাঁকে সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে সাহায্য করেন। ২০ বছর পর তাঁর মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ ৮৪ হাজার টাকা। শুরু হয়ে যায় জয়নালের স্বপ্নের হাসপাতাল।
এ ঘটনাটা মাথায় রাখুন। এবার আমি আপনাদের ভিন্ন দুটি ঘটনা বলব, এর একটি মাইক্রোসফটের বিল গেটস, অন্যটি বিখ্যাত পপ গ্রুপ বিটলসকে নিয়ে। এঁদের মধ্যে সম্পর্ক কোথায়, সে কথায় পরে আসছি।
অবস্থাসম্পন্ন পিতা-মাতার সন্তান বিল গেটস বড় হয়েছেন সিয়াটলে। গোড়াতে পড়াশোনা করেছেন স্থানীয় সরকারি স্কুলে, সপ্তম শ্রেণী থেকে তাঁকে ভর্তি করানো হয় লেকসাইড নামে একটি প্রাইভেট স্কুলে। বড়লোকদের স্কুল, লেখাপড়ার বিস্তর সুযোগ সেখানে। এই স্কুলের মায়েরা মিলে একটি মাদার্স ক্লাব গড়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে এই ক্লাবের পয়সায় একটি কম্পিউটার ক্লাবের ব্যবস্থা করা হয়, গ্রীষ্মের ছুটিতে ছেলেমেয়েদের ব্যস্ত রাখাই তাঁদের উদ্দেশ্য। তখনো ঘরে ঘরে কম্পিউটার আসেনি, পুরো ব্যাপারটিই নতুন। যে কম্পিউটারটি কেনা হলো, তা ছিল এএসআর-৩৩ টেলিটাইপ, যা টাইম-শেয়ারিং ব্যবস্থায় সরাসরি যুক্ত ছিল সিয়াটলের শহরতলির মেইনফ্রেম কম্পিউটারের সঙ্গে। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র বিল গেটস প্রথমবারে মতো টাইম-শেয়ার ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হলেন। তখন থেকে বলতে গেলে প্রায় সারাক্ষণই সেই কম্পিউটার রুমে পড়ে থাকতেন বিল গেটস। এর সামান্য কিছু পরে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় একটি কম্পিউটার সেন্টার খোলে। সে সেন্টারের অন্যতম পরিচালক মনিক রোনার এক ছেলে পড়ত লেকসাইডে। তিনি উদ্যোগ নিয়ে লেকসাইড স্কুলের কম্পিউটার ক্লাবের সদস্যদের বিশ্ববিদ্যালয় সেন্টারের সফটওয়্যার পরীক্ষার ব্যবস্থা করে দিলেন। ছাত্ররা সে সফটওয়্যারের ব্যবহার যোগ্যতা টেস্ট করবে, বিনিময় শনি-রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার কেন্দ্রে নিখরচায় প্রোগ্রামিং করার সুযোগ পাবে। লাফিয়ে উঠলেন বিল গেটস। রাত তিনটায় ঘুম থেকে উঠে সাইকেল চালিয়ে কম্পিউটার সেন্টারে আসতেন, বাবা-মা জানতেও পারতেন না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে পড়ে থাকতেন। তিন বছর পরের ঘটনা। ওয়াশিংটন স্টেটের একটি বিদ্যুৎ কোম্পানি তাদের নতুন কম্পিউটার ব্যবস্থা ‘টেস্ট’ করার জন্য লোক খোঁজা শুরু করেছে। সময়টা ১৯৭১, তখনো কম্পিউটার প্রোগ্রামিং বোঝে এমন লোক বেশি ছিল না। বাড পেম্বরুক নামের এক ভদ্রলোক বিল ও তাঁর বন্ধুদের কথা জানতেন। তাঁরই উদ্যোগে বিলের জন্য ব্যবস্থা হয়ে গেল নতুন সেই কম্পিউটার পরীক্ষা করার। হাইস্কুল শেষ করার আগেই হাজার হাজার ঘণ্টা—সম্ভবত ১০ হাজার ঘণ্টা বা তার চেয়েও বেশি—কম্পিউটার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেরে ফেললেন বিল গেটস।

এবার বিটলসের গল্প
ষাটের দশকের গোড়ার দিকে লিভারপুলে চার ইংরেজ তরুণ মিলে একটি গানের দল গড়ে তোলেন। খুব বেশি লোক তাঁদের কথা জানত না, তাঁদের গান পছন্দও করত না। এ সময় ব্রুনো নামের এক জার্মান লন্ডনে আসেন হামবুর্গে তাঁর নাইট ক্লাবের জন্য গানের দল ভাড়া করতে। এক ইংরেজ বন্ধুর কাছ থেকে তিনি বিটলসের খোঁজ পেলেন, গান শুনে ভালো লাগল, তাঁদের সঙ্গে চুক্তিও হয়ে গেল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গান গাইতে হতো বিটলসদের—কখনো কখনো ১০-১২ ঘণ্টা। কিছুটা নাম-ডাক হওয়ার পর প্রায় সাত দিনই তাঁদের গান গাইতে হতো। অন্যতম বিটলস জন লেনন পরে বলেছেন, হামবুর্গের সেই ক্লাবে গানের সুযোগ পাওয়ার ফলেই দল হিসেবে জমে ওঠে বিটলস। সে সময় কম করে হলেও ১০ হাজার ঘণ্টা তাঁরা গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন বৈকি।
গেটস ও বিটলসের এই গল্প আমি পড়েছি ম্যালকম গ্লাডওয়েলের আউটলায়ার্স নামের একটি বই থেকে (লিটল, ব্রাউন অ্যান্ড কোম্পানি, ২০০৮)। এ রকম আরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে বইটিতে। তার সবগুলোর একটি মোদ্দা বক্তব্য: সাধনা ও পরিশ্রম ছাড়া জীবনে বড় ধরনের সাফল্য পাওয়া কঠিন। সফল এমন সব মানুষই কঠোর পরিশ্রম করেছেন, গ্লাডওয়েলের কথামতো, ১০ হাজার বা তার চেয়েও বেশি ঘণ্টা ব্যয় করেছেন তাঁরা। কিন্তু শুধু সাধনা ও পরিশ্রমই যথেষ্ট নয়—প্রায় প্রতিটি সাফল্যের পেছনে রয়েছে সুযোগ (অপরচুনিটি)। একদম সাধারণ, তেমন উল্লেখ করার মতো কোনো ব্যাপার নয়, কিন্তু তাতেই সাফল্যের পথ খুলে যায়। আশপাশে মানুষ, যাদের গ্লাডওয়েল ‘কমিউনিটি’ নাম দিয়েছেন, তাঁরাই সে সুযোগ তৈরি করে দেন। বিল গেটস যদি ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোগ্রামিংয়ের সুযোগ না পেতেন, বিটলস দলের যদি হামবুর্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাওয়ার সুযোগ না আসত, তাহলে তাঁদের জীবনে এই অসম্ভব বাঁক ঘোরা কি সম্ভব হতো?
ম্যালকম তাঁর বইয়ে ক্রিস লানগ্যান নামে এক অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তির কথা বলেছেন। প্রতিভাবান, কিন্তু ব্যর্থ। সাধারণ মানুষের আইকিউ যেখানে ১০০, লানগ্যানের আইকিউ ১৯৮। তুলনা হিসেবে জানিয়ে রাখছি, বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের আইকিউ ছিল ১৫০। ক্রিস দরিদ্র ঘরের সন্তান, ছোট বেলায় বাবা নিখোঁজ হন, মা সামান্য লেখাপড়া জানতেন, খুব ক্ষুদ্র একটি চাকরি করতেন। তার ছেলে যে প্রতিভাবান, এ কথা বোঝা সেই মায়ের পক্ষে অসম্ভব ছিল। কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য স্কলারশিপের আবেদন করেছিলেন ক্রিস, কিন্তু তাঁর মা আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে ভুলে যান, ফলে স্কলারশিপ ফসকে যায়। তার পরও মন্টানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন অঙ্ক ও দর্শন নিয়ে পড়তে। বাড়ি থেকে প্রায় ১৩ মাইল দূরে ক্লাস। যাতায়াত করতেন ভাঙা একটা গাড়িতে। একদিন সে গাড়ি অকেজো হয়ে গেলে ক্রিস তাঁর অধ্যাপককে অনুরোধ জানান, সকালের ক্লাসের বদলে সন্ধ্যায় ক্লাস করার সুযোগ তাঁকে দেওয়া হোক। এক প্রতিবেশী সন্ধ্যায় এদিকে আসেন, তিনি তাঁকে তাঁর গাড়িতে নিয়ে আসতে পারেন। রাজি হলেন না সেই অধ্যাপক। বাধ্য হয়ে লেখাপড়া ছেড়ে দিলেন ক্রিস। এই লোকের কথা হয়তো আমরা জানতামই না, যদি না কয়েক বছর আগে ‘হু ওয়ান্টস টুবি মিলিয়নিয়ার’ টিভি অনুষ্ঠানে পাঁচ লাখ ডলার জিতে তিনি সাড়া না ফেলে দিতেন।
ম্যালকমের বক্তব্য, অসাধারণ প্রতিভাধর হওয়া সত্ত্বেও ব্যর্থ মানুষই হয়ে রইলেন ক্রিস লানগ্যান। যে সুযোগ বিল গেটস বা বিটলস পেয়েছিলেন, ক্রিস তা পাননি। পরিশ্রম তিনি কম করেননি, তাঁর একাগ্রচিত্ততারও কোনো অভাব ছিল না। সাফল্যের জন্য যে সিঁড়ি চাই, কেউ তাঁর পথ তাঁকে দেখিয়ে দেয়নি। জয়নাল আবেদিনের ব্যাপারটা অনেকটা তাই। তাঁর সাধনা ও পরিশ্রমের কোনো তুলনা নেই, কিন্তু বন্ধুপ্রতিম হাত না পেলে সাফল্যের সিঁড়ির খোঁজ তিনি কি পেতেন?
আরেকটি গল্প বলে এই লেখা আমি শেষ করব। গ্লাডওয়েলের বইটির কথা আমাকে জানান জিম্বাবুয়ের এক সহকর্মী। একদিন দুজন লাঞ্চ খেতে গেছি, সেখানেই বইটি নিয়ে কথা। হঠাৎ বন্ধুর মুঠোফোন বেজে ওঠে। কঙ্গোর একটি মেয়ে ফোন করেছেন, দেড় লাখ ডলারের একটি চাকরি তিনি পেয়েছেন, সে কথা জানাতেই ফোন। কিন্তু সে কথা তোমাকে জানাতে হবে কেন? জানতে চাইলাম। বন্ধুটি জানালেন, বছর দুয়েক আগে মেয়েটি তাঁর অফিসে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করতেন। সে সময় কথায় কথায় জানান, তাঁর ইচ্ছা আইনজীবী হওয়া, কিন্তু সে জন্য পরীক্ষা দিতে যে টাকা লাগে, তা তাঁর নেই। আমার বন্ধু ও তাঁর এক সতীর্থ মিলে সে টাকা জোগাড় করে দিই। এখন কৃতজ্ঞতা জানাতে সবার আগে তাঁকে এই ফোন।
আউটলায়ার্স বইটি পড়ে একটি বিষয় আমি শিখেছি। সাফল্য জিনিসটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। আমরা নিজেরাই কখনো কখনো অন্যের সাফল্যের কারণ হতে পারি। এর জন্য চাই মনটাকে উদার করা, চাই অন্যকে সাহায্য করার জন্য মানসিকতা। একদম তুচ্ছ কাজ, আমাদের আয়ত্তের ভেতর যে কাজ, তার মাধ্যমেই কারও কারও জীবন আলোকিত হতে পারে। সে আলোয় আমরাও উজ্জ্বল হই। আরও একটি কথা। স্বার্থহীন কোনো কাজের মূল্য দাম দিয়ে কেনা যায় না। আমার জিম্বাবুয়ের বন্ধুর গর্বিত মুখটি দেখে আমি সে কথা ঠিক বুঝতে পেরেছি।
বন্ধু, প্লিজ, আপনার হাতটি বাড়ান।

http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-01-20/news/217865
বিস্তারিত পড়ুন ... »

১৪ নভে, ২০১১

প্রিয় তরুণ প্রজন্ম!

আজকের পৃথিবীর সদা পরিবর্তনশীল টেকনোলজির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়াটা আমার প্রজন্মের মানুষদের জন্য কঠিন। আজকের তরুণদের কাছে ক্যালকুলেটর যেখানে প্রাগৈতিহাসিক টেকনোলজি, সেটা আমরা, আমি প্রথম চাক্ষুষ করেছি জীবনের ৩০তম বছরে। সহস্র ব্যস্ততার মাঝে তবু চেষ্টা করি ফেসবুক, বাংলা ব্লগ ও অনলাইন পত্রপত্রিকার পাঠক প্রতিক্রিয়ায় চোখ রাখতে। ইন্টারনেটে পরিচয়হীনতার কারণে অংশগ্রহণকারীদের মন্তব্যগুলো সাবলীল ও নিঃসঙ্কোচ (অবশ্য চোখরাঙানি দেখতে পাচ্ছি ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে; ব্লগ লেখার জন্যও মুচলেকা দিতে হয়েছে আসিফ মহিউদ্দিনকে); বলাই বাহুল্য, বহু ক্ষেত্রেই তরুণেরা আমাদের ওপর সদয় নন। সেটা বোধগম্য, সে বয়সে আমরাও ক্রোধকে উপলক্ষ করে খুঁজে ফিরেছি তারুণ্যের সারবত্তা। কিন্তু একটা ব্যাপার আমাকে ভাবায়, ভীষণ ভাবায়- এ জন্য নয় যে আমি রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট, বরং এ জন্য যে ভাবনাটা আমার বয়সীদের জন্য পুরো নচ্ছাড় : আমাদের সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে, সেটা হবে তো?

আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করি যে, আজকের তরুণদের অনেকেই ক্রোধ আর হতাশার মাঝে খেই হারিয়ে ফেলছে। তারা যেন স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে। দেশের ঘুরে দাঁড়ানোর সাথে নিজের উন্নয়নের এক অদ্ভুত দূরত্ব সৃষ্টি করে তারা মনে করছে, দেশের উন্নয়নটা যেন অন্য কারো কর্তব্য, যার জন্য বরাদ্দ আছে বিশেষ একটি দল; তাদের তাচ্ছিল্য করা যায়, দোষারোপ করা যায় কোনো পরীক্ষা ছাড়া, শুধু রাজনীতিবিদ বলে শনাক্ত করেই।

প্রিয় তরুণ প্রজন্ম : এ বাবদে আমার কিছু কথা বলার আছে আপনাদের, শুধু একজন অগ্রজ হওয়ার দাবিতে। শুরু করতে চাই নিজের জীবন থেকে, একটু সহ্য করুন।

আজকে আপনাদের যে বয়স, সে বয়সেই আমরা পেয়েছিলাম নতুন একটা দেশ, আর পেয়েছিলাম নতুন কিছু স্বপ্ন, যে স্বপ্ন আমাদের আগের কোনো প্রজন্ম দেখতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধে আমরা অবশ্যই গিয়েছিলাম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে
যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য, কিন্তু মনে ছিল তার চেয়েও বড় একটা আশা : স্বাধীনতার সুফলটা আমরা সবাই ভাগ করে পৌঁছে যাব উন্নতির দুয়ারে। আমরা কী রকম আশাহত হয়েছিলাম সে বয়ান আমার কাছে শুনলে আপনাদের মনে হতে পারে পক্ষপাতদুষ্ট, আপনার পাশের যে মানুষটা '৭২ থেকে '৭৫-এর সময়টাতে জীবিত ছিলেন, অতিবাহিত করেছেন তার যৌবন, তাকে একবার হলেও জিজ্ঞেস করুন।

সে টালমাটাল সময়ে আমি প্রবেশ করি চাকরিজীবনে, শিক্ষকতা পেশায়। আমার বন্ধুরা একের পর এক বিদেশে চলে যাচ্ছেন উচ্চশিক্ষায়। পিএইচডি করে প্রবাসে থিতু হওয়ার চিন্তা যে আমার মাথায় আসেনি তা নয়। সে সময়টাতে আপনাদের চেয়ে আমাদের জন্য উচ্চশিক্ষার্থে পশ্চিমে যাওয়াটা বোধহয় একটু সহজই ছিল। তবু মনের কোণে কোথায় যেন একটা আশা ছিল- একটু চেষ্টা করে দেখি না কী হয়?

দেখতে দেখতে অনেকটা সময় পার হয়ে যায়, চলে আসি সরকারি চাকরিতে। সেই চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে পুরোপুরি মনোনিবেশ করলাম রাজনীতিতে, যখন আমার বন্ধুরা ক্যারিয়ারের মধ্য গগনে। মাঝ বয়সে এসে আমি রাজনীতি শুরু করলাম একদম প্রথম সিঁড়িটায় পা রেখে, ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচন করে (অবশ্য ছাত্রজীবনে রাজনীতি করেছি সক্রিয়ভাবে, সেটা ষাটের দশকের কথা)। যেকোনো বিচারেই Bad Career Move.'৮৯ সালে আমার সামনে স্বভাবতই এমপি, মন্ত্রী কিংবা বিএনপির বড় পদ পাওয়ার সম্ভাবনা অথবা আশা, কোনোটাই ছিল না। তবে একটা আশা অবশ্যই ছিল : দেখি না একটু ধাক্কা মেরে, কতটুকু যাওয়া যায়।

আপনাদের কি মনে হয় সে সময়টা ছিল প্রত্যয়দীপ্ত হয়ে আগুনকে স্পর্শ করে অসীমকে জয় করার দিন? মোটেও নয়, আজকের মতো না হলেও সে দিনও সন্ত্রাস ছিল, পেছনের দরজার রাজনীতি ছিল। আপনাদের মতো আমিও সে দিন চিন্তিত ছিলাম, ক্রোধে জর্জরিত হয়েছিলাম। প্রায় ১৩ বছর আমি রাজনীতির জন্য পড়ে থেকেছি ঠাকুরগাঁওয়ে, আমার পরিবার তখন ঢাকায়। আমার ছোট্ট দু'টি মেয়ে শৈশব থেকে কৈশোর পার হয়ে তারুণ্য স্পর্শ করছে, আমি থাকছি দূরে, তাদের সময় দিতে পারি না। একজন পিতার জন্য কী কষ্টের এই বন্দোবস্ত সেটা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। আমিও ভেঙে পড়েছি বহু সময়, সম্মুখীন হয়েছি দ্বিধা ও প্রশ্নের। বহু সহকর্মীর অনৈতিকতা আমার মাঝে বিবমিষা জাগিয়েছে, বীতশ্রদ্ধ হয়েছি আর দশজনের মতোই। কিন্তু আশা হারাইনি। আমার বয়স এখন ৬৩; আমি যদি এ বয়সেও দেশটা ঘুরে দাঁড়াবে এই স্বপ্ন দেখতে পারি, আপনারা কেন পারবেন না?

প্রিয় তরুণ প্রজন্ম : আমাদের প্রজন্মের ব্যর্থতা অনেক। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে আমাদের অনগ্রসর মনোভাব ও রাষ্ট্র পরিচালনায় পেশাদারিত্ব ও মহানুভবতার অভাবে এ দেশ তার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু আমরা আপনাদের জন্য অন্তত এনে দিয়েছি স্বাধীনতা, যেটি অর্জনের জন্য একেকটি জাতিকে শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আপনারা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। এর গুরুত্ব ও অপার সম্ভাবনা উপলব্ধি করুন। স্বাধীনতার মানে যা ইচ্ছে তা-ই করা না কিংবা যাকে ইচ্ছে তাকে ভোট দেয়াও নয়। বরং বেছে নেয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য আপনার যে আজীবন প্রচেষ্টা সেটাই স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। আজ সময় এসেছে নিজেকে প্রশ্ন করার। যে তথ্য, শ্রম, অর্থ ও কাণ্ডজ্ঞান সহযোগে আমরা একটা মোবাইল ফোন কিংবা কম্পিউটার বেছে নিই, সে প্রেরণা ও প্রজ্ঞা আমাদের রাষ্ট্রভাবনায় বরাদ্দ আছে কিনা?

আমি নিঃসঙ্কোচে জানাতে চাই যে শুধু একটি রাজনৈতিক দল দেশকে বদলাতে পারবে না, পারবেন আপনারা। আমার দাবি শুধু এতটুকু যে বিএনপি এই মহাযজ্ঞে আপনার ও দেশের জন্য একটি বেটার প্ল্যাটফর্ম। কথাটা বলছি সস্তা বিরোধিতার জন্য না, দুটো দলের চরিত্র বিশ্লেষণ করে; আর সে জন্য আপনাদের কাছে আমি সমর্থন আশা করছি না, করছি অবজেক্টিভ থিঙ্কিং। বিএনপি কোনো অতীতমুখী দল নয়, তাদের মনোজগৎ অতীতে অবরুদ্ধ নয়। অতীতের অর্জন আর ট্র্যাজেডি নিয়ে মানুষের সহানুভূতি আর অনুকম্পা আশা করে না বিএনপি। বিএনপি শুরু থেকেই একটি ভবিষ্যৎমুখী দল। পৃথিবীতে এমন কোনো জাতি নেই যার অতীত রক্তরঞ্জিত নয় কিংবা পাপবর্জিত। তারা তাদের অতীত বেদনাকে ভুলে থেকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়, প্রতিনিয়ত অতীত ক্ষতকে সজীব করার রাজনীতি করে না। নাৎসি উত্থান-পর্ব (যেটা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ছিল!) নিয়ে জার্মানরা রাজনীতি করে না, অস্ট্রেলীয় আদিবাসীরা তাদের ওপর সংঘটিত অবিচার নিয়ে প্রতিনিয়ত আলোচনা করে নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও হীনম্মন্যতা সৃষ্টি করে না। আমাদের রাষ্ট্রের ইতিহাস অন্যান্য আর দশটি রাষ্ট্রের মতোই ভুলে ভরা। আমাদের প্রজন্মের বহু লোক ভুলের এই ফিরিস্তি নিয়ে আলোচনা করাকে তাদের জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেছে। দয়া করে আপনারা এই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবেন না। আমরা এগিয়ে যেতে চাই, এগিয়ে যেতে চাই আমাদের অন্ধকার অতীতকে ভুলে গিয়ে নয়, ভুলে থেকে। এই এগিয়ে যাওয়ায় বিএনপি আপনার সামনে নয়, সাথে থাকতে চায়, কেননা চারিত্রিকভাবে বিএনপি একটা ইনক্লুসিভ দল আর আওয়ামী লীগ হলো এক্সক্লুসিভ দল। তাদের রাজনীতি ধর্মাচারের নিকটবর্তী।

অন্য দিকে বিএনপি চায় সব মতের সম্মিলন, শুধু একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে দেশের উন্নয়নে অংশ নেয়া। আপনাদের কি মনে হয় রাজনৈতিক দল হিসেবে তা আমাদের জন্য সহজ একটা কাজ? মোটেও না। বিভিন্ন মতের মানুষকে এক প্ল্যাটফর্মে আনা কতটুকু কঠিন তা খালেদা জিয়াকে বলুন, সাত খণ্ডে বই লিখে উত্তর দেবেন। তবু আমরা এ লক্ষ্যে অবিচল থাকব; সুবিধাবাদিতার জন্য না, কাণ্ডজ্ঞানের জন্য। বৈচিত্র্যে অবগাহনের চেষ্টাটি বিপদসঙ্কুল ও দুরূহ; কিন্তু সেটিই আমাদের রক্ষাকবচ সময়ই বলে দেবে। আমরা সময়ের সাথে নিজেদের বদলাতে চাই; যে জন্য বিএনপির রাজনীতি সাসটেইনেবল, আওয়ামী লীগেরটা না।

আমরা রাজনীতিবিদেরা দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয়তাবোধ কথাগুলোকে অনেক সময়েই পাঞ্চ লাইন হিসেবে ব্যবহার করি; সব সময় খারাপ উদ্দেশ্যে করি তা না। কিন্তু একবার নিজেকে সততার সাথে প্রশ্ন করুন তো দৈনন্দিন জীবনে কতবার আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা জাতীয়তাবাদের কথা সাগ্রহে চিন্তা করেন? চার ঘণ্টা ব্যয় করে অফিসে যাওয়া-আসার সময়, দশ ঘণ্টার লোডশেডিংয়ে নেতিয়ে পড়ার সময়ে কিংবা চোখের সামনে কাউকে পিটিয়ে মারার দৃশ্য দেখার সময় কি আপনি অতীতের অর্জন নিয়ে উদ্বেলিত হন, না বর্তমানের যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠেন? আমাদের রাজনীতি এই বর্তমানকে ঘিরে এবং আমি নিঃসন্দেহে দাবি করতে পারি যে আমরা আওয়ামী লীগের চেয়ে বেটার ম্যানেজারস।
আপনাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের জিজ্ঞেস করুন, তাদের জীবনে, এমনকি পাকিস্তান আমলেও সরকারি ব্যবস্থাপনার এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তার প্রত্যক্ষ করেছেন কি না। বাংলাদেশের বর্তমান সড়ক পরিবহনব্যবস্থা কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সাথে তুলনীয়, দু-দুবার শেয়ার মার্কেট লুণ্ঠনে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত, সর্বক্ষেত্রে দলীয়করণের কারণে মেধাবী তরুণদের মামা-চাচা ছাড়া চাকরি পাওয়া আজ এক অসম্ভব ব্যাপার। রাষ্ট্রের যেখানে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয়ার কথা সেখানে সাধারণ নাগরিকদের ট্যাক্সে পোষা পুলিশ বাহিনীর অত্যাচারে বিরোধীদলীয় নেতাদের তো বটেই, সাধারণ নাগরিকদেরও মৃত্যু ঘটছে। সেই সাথে আছে দ্রব্যমূল্যের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতি। আমি দাবি করি না যে আমাদের সময়ে বাংলাদেশ এক মধুময় দেশ ছিল, ছিল না কোনো সমস্যা। কিন্তু সততার সাথে নিজেকে প্রশ্ন করুন তো, ২০০৫ সালে আপনার পরিপার্শ্ব ও ব্যক্তিগত অবস্থা ভালো ছিল, না আজ ভালো?

বলা হয়ে থাকে যে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে বার্মায় কারাবাসে প্রেরণ করার সময়ে কেবল একটি প্রধান খাদ্য নেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তার পাচক বেছে নিয়েছিল ছোলা। অবশিষ্ট কারাজীবনে বৃদ্ধ বাহাদুর শাহ জাফরকে তার পাচক একটি ডিশ নাকি কখনো দ্বিতীয়বার পরিবেশন করেননি। এটাই হলো ম্যানেজমেন্ট। সেটা না থাকলে অবস্থা কী হয় তার প্রমাণ মিলবে যোগাযোগ ও অর্থমন্ত্রীর পারফরম্যান্সে। জনৈক বাংলাদেশী তরুণের ফেসবুক স্ট্যাটাস আনা হয়েছিল আমার নজরে, মোক্ষম কি না সে পর্যবেক্ষণ আপনারাই পরখ করুন : এই আবুল বলে ওই আবুলের দোষ, ওই আবুল বলে এই আবুলের দোষ। আবুল-বাবুলে দেশটা শেষ।

হ্যাঁ, আমি বুঝি যে পরিস্থিতি খুব আশাব্যঞ্জক না। মাথার ওপর ভর করে আছে পাহাড়সমান সঙ্কট অথচ সরকার পড়ে আছে 'অতীত সমীকরণ' প্রকল্পে। তবু আমি অনুরোধ করব, আশাহত হবেন না। জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে যে তার আশার সাথে আপস করে না সে-ই বিজয়ী। কালের পরিক্রমায় আমাদের রাজনীতি যদি কখনো আপনাদের কাছে সেকেলে হয়ে পড়ে, তাহলে সেটাকে বদলে দিয়ে দেশটাকে সামনে নিয়ে যাবেন। আমরা অবশ্যই মাথা উঁচু করে দাঁড়াব। মনে রাখবেন কোনো মহাপুরুষ, ত্রাতা কিংবা শক্তিধর রাষ্ট্র আমাদের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। আমাদের সঙ্কট আমাদেরই কাটিয়ে উঠতে হবে। আপনার রাজনৈতিক দল বিএনপি এই মহান যাত্রায় কখনো হতোদ্যম হবে না- এই অঙ্গীকার করছি।
বিএনপি আপনার দল, এর দরজা আপনার জন্য খোলা আছে। আসুন, একে বদলে দিন আপনার সময়ের উপযোগী করে।

লেখক : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব
[সূত্রঃ নয়া দিগন্ত, ১৫/১০/১১]


মূল লিঙ্কঃ http://www.sonarbangladesh.com/article.php?ID=7103
বিস্তারিত পড়ুন ... »

জাফর ইকবাল স্যার সমীপেষু,

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

কৃপণ হিসেবে আমার একটা বদনাম আছে। ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র থাকাবস্থায় সোবহানবাগ থেকে কার্জন হল অবধি সাইকেল চালিয়ে যেতাম বলে বন্ধুরা এ মর্মে নির্দোষ টিটকারি মারত যে আমি যেন সাইকেলের বদলে রিকশা চালিয়ে যাই; এতে আমার ভার্সিটি যাওয়ার খরচ তো বাঁচবেই সাথে দু'পয়সা কামাইও হবে। বিদ্রুপ বন্ধুত্বসুলভ হলেও দাগ কিন্তু মনে একটু কাটেই। এই আমি যখন মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের "তোমাদের প্রশ্ন আমার উত্তর"- পড়লাম তখন সেই সব দাগ মুছে অহংকারের আল্পনা আঁকলাম মনে – আমার ছোট বেলার হিরো সাইকেল চালিয়ে কার্জন হলে যেত, আমিও যাই – বড় হয়ে আমি নিশ্চয়ই তার মত হতে পারব! আমার এ হিরোভক্তি নিয়েও কথা শুনতে হয়েছে – আমরা নাকি জাফর ইকবাল জেনারেশন – তার মত লেখার চেষ্টা করি, তার মত করে কথা বলি। কথাটা সত্য বিধায় খারাপ লাগলেও আপত্তি করিনি।

আমার হিরোর অবস্থান থেকে জাফর ইকবাল স্যারের পতন শুরু হয় একটা সাক্ষাতকার পড়ার পর থেকে। তিনি এক প্রশ্নের উত্তরে বললেন "মানুষের
উৎপত্তি ক্রমবিবর্তন থেকে তা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মত ধ্রুব সত্য" লেব্বাবা! আমি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র হিসেবে ক্রমবিবর্তন নিয়ে অনেক ঘাটাঘাটি করেও তো কোন বড় মাপের বিজ্ঞানীকে নিঃসন্দেহ প্রমাণ দিতে দেখলাম না। এরপর স্যারের আরো সব আচরণে খটকা বাড়তেই থাকল। উনাকে মেইল করলাম – স্যার, আমি অধম আপনার বড় ভক্ত। আমার কটা প্রশ্নের উত্তর দেবেন দয়া করে –
১. আপনি কি আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে বিশ্বাস করেন?
২. মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহর প্রেরিত রসুল হিসেবে বিশ্বাস করেন?
৩. পরকালে সব কিছুর হিসাব নিকেশ হবে এটা মানেন?

তিনি আমার মেইলের উত্তরে বললেন তোমার যা খুশি ভেবে নাও। আমি তাজ্জব হয়ে উত্তর দিলাম – হ্যা না তো কিছু বলুন, আপনি যেটা সত্য মনে করেন সেটা স্বীকার করতে আপত্তি কোথায়? তিনি উত্তর দিলেন "আই লাভ হেট মেইলস, আই হ্যাভ আ লার্জ কালেকশন অফ দেম" যাচ্চলে! এটাই আমার আশৈশবলালিত মহাপুরুষের আসল চেহারা? এরপরে পদে পদে তার আদর্শের প্রতি আমার মনে ঘৃণা তৈরী হয়েছে, তিনি যা কিছু আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন তার মোহনী লেখনীর মাধ্যমে - তার প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মেছে। ইসলামবিরোধীতাকে যারা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে তার মধ্যে প্রথম আলো অন্যতম। সেখানে জাফর ইকবাল স্যারের সাম্প্রতিক লেখাটা পড়ে মনে হল তিনি তার মুখোশ ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন। ইসলামের ব্যাপারে তার যে চরম আপত্তি আছে সেটা বলার সৎ সাহস তিনি অর্জন করেছেন। তিনি আমার এ খোলা চিঠির উত্তর দেবেন এত বড় আশা করি না, কিন্তু তার বিবেকে যদি ন্যুনতম সৌজন্যতাবোধ অবশিষ্ট থাকে তবে হয়ত তিনি এ লেখাটা পড়ে একবার ভেবে দেখবেন -

১.
স্যার, ফতুয়া পড়া মেয়ে বিজ্ঞাপনের সুবাদে তরুন প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি হল, আর যে মেয়েটা নিজেকে গুনহীন পণ্যের মত বিক্রি করতে চাইল না সে হল ঘরে বন্দী? কখনও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কোন মুসলিমাকে জিজ্ঞাসা করে দেখেছেন সে কেন পর্দা করে? আমার স্ত্রী মুসলিম হবার পরে তার বিধর্মী মায়ের বাসায় পর্দা না করে যাবার চাইতে না যাওয়াই বেছে নিয়েছিল। আমাকে বোঝাতে পারবেন কেন সে জন্মদাত্রী মায়ের চেয়ে এই পর্দাকে অগ্রাধিকার দিল? ইসলামের প্রতি কতটা ভালবাসা থাকলে নিজের মায়ের ভালবাসাকে উপেক্ষা করা যায়? একজন মানুষের ভালোবাসাকে অপমান করার অধিকার আপনাকে কে দিল? আপনি তো আমাদের ছোটবেলা থেকে কেবল ঘৃণা করে শিখিয়েছেন, ভালোবাসার মূল্য আপনি কি বুঝবেন? পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ৭১ যা করেছিল সেই জন্য যদি সে সময়ে জন্ম না নেয়া পাকিস্তানীদেরও ঘৃণা করতে হয় তাহলে তো বাংলাদেশের মানুষ যত বাংলাদেশীকে মেরেছে সে কারণে সব বাংলাদেশীদেরও আমাদের ঘৃণা করতে হবে? কবে শেষ হবে এই ঘৃণার শৃঙ্খল বিক্রিয়া? যারা অপরাধ করেছিল তাদের তো আপনারা কিছু করতে পারেননি, সসম্মানে দেশে ফিরে যেতে দিয়েছিলেন। আমাদের প্রজন্মে বিদ্বেষের বীজ ছড়িয়ে আসলে কি আপনাদের ব্যর্থতার দায় মিটবে?

দুঃখিত স্যার, আমরা আপনার এই ঘৃণা-ব্যবসায় সঙ্গ দেব না। সৌদি আরবে বিচার করে দেয়া মৃত্যুদন্ডকে 'হত্যাকান্ড' বলা আমরা মেনে নেব না। কারণ যেদিন ১৬ বছরের আবদুর রহমান আল আওলাকিকে তার ১৭ বছরের ভাই সহ ড্রোন বিমান থেকে মিসাইল ছুড়ে মারা হয়েছিল সেটাকে আপনার হত্যাকান্ড মনে হয়নি। ফেলানিকে যখন মেরে কাটাতারের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল সেটাকে আপনার নিষ্ঠুর মনে হয়নি। যে নিজেকে মুসলিম বলে দাবী করে তাকে আমরা ভাই মনে করি। বাংলাদেশী মুসলিম যেমন আমার ভাই, আমেরিকান মুসলিম যেমন আমার ভাই, পাকিস্তানী মুসলিমও আমার ভাই, সৌদি মুসলিমও আমার ভাই। পাকিস্তানীরা বর্বর, সৌদিরা নিষ্ঠুর - এই ঘৃণার বীজ আমরা বুক থেকে বের করে ফেলেছি। আমাদের ভালবাসা আল্লাহর ওয়াস্তে, তাকে খুশী করার জন্য। এই ভালোবাসা কি যারা বুঝতে পেরেছে, তারা জানে একদিন এই মুসলিম ভাইরা আমাদের বিপদে পাশে এসে দাঁড়াবে। ইঙ্গ-মার্কিনীরা আমাদের গ্যাস তুলতে না পারলে আগুনে জালিয়ে দেবে, ভারতীয়রা আমাদের ফারাক্কা-তিস্তা-টিপাইমুখ বাঁধে, ফেনসিডিলের বন্যায় আমাদের তিলে তিলে হত্যা করবে। ওদের কাছে আগে আপনারা আকাশ বিক্রি করেছিলেন, এখন মাটি বিক্রি করছেন – আমরা কিন্তু ঠিকই বুঝি কে আমাদের ভালোবাসে আর কে আমাদের বাঁশ দেয়! আপনি যাদের ভালোবাসতে বলবেন আমরা তাদের ভালোবাসি না, আমরা বড় হয়েছি স্যার; কে বন্ধু কে শুত্রু সেটা আমরা চিনতে পারছি।

২.
কওমি মাদ্রাসা নিয়ে আপনার মায়াকান্না দেখে আমার শুকনো ঠোঁটে হাসতে গিয়ে রক্ত ঝরেছে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে না এবার মাদ্রাসার ছাত্রদের ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ না দেয়ার পায়তারা ছিল? শেষে মানবিক বিভাগের ভর্তিপরীক্ষায় এক মাদ্রাসা ছাত্র প্রথম হয়ে দেখিয়ে দিল যে মাদ্রাসা শিক্ষার যেটুকু সীমাবদ্ধতা আছে তা আপনার মত মানুষদের উন্নাসিকতার কারণে। শিক্ষার মূল্য আপনি বোঝেন টাকা কামাই করার মানদন্ডে – তাই একটা ছেলের কলা বিক্রিকে আপনার কাছে জীবনের অপচয় মনে হয়। আমার কাছে তাকে পাকা মানুষ মনে হয়, রিকশাওয়ালা তরুণকে খাঁটি মানুষ মনে হয়। এরা নিজেদের শরীরের ঘাম ঝরিয়ে টাকা কামাই করে বাসায় নিয়ে যায়, অভুক্ত ভাই-বোন দের মুখে তুলে দেয়। এরা মগজ বিক্রি করে দেশের ক্ষতি করে না, দেশের মানুষকে অন্যদের কাছে বিক্রি করে দেয় না। সৌদি শ্রমিকদের নিয়ে তো অনেক মায়াকান্না কাঁদলেন – এদের দেশে করার মত কাজের ব্যবস্থা করার তো কোন কথা বললেন না। পরিবার ছেড়ে মানুষ কি বিদেশে গতর খাটে নিজের সুখের জন্য? জানেন দেশে পাঠানো টাকায় সময় আমার ১৮ মাসের ছেলেটাকে দেখার জন্য কতটা হাহাকার মিশে থাকে? আপনারা হিসাব করেন 'ফরেন রেমিটেন্স' – আমার স্ত্রীর, আমার মায়ের অশ্রুর দাম আছে আপনাদের কাছে? আমাদের জন্য আপনার কোন স্বপ্ন নেই – আমরা দেশে এসে যেন কিছু করতে পারি সেই ইচ্ছাও নেই। বিদেশে থাকুক, পিএইচডির কামলা খাটুক কিংবা আকাশ-ছোঁয়া দালানের মিস্ত্রী হোক – টাকা পেলেই তো আপনারা খুশি তাই না? সৌদি জল্লাদ এক কোপে কল্লা নামায় কি ভয়াবহ কথা! আপনারা সুশীল কসাই – টাকা কামানোর হাইড্রোলিক প্রেসে চিপে চ্যাপ্টা করে তিলে তিলে মারবেন – এই না হলে সুখের মৃত্যু!

স্যার, পারবেন কখনও আপনার পশ্চিমা শিক্ষার মোড়কটা ছেড়ে বেরিয়ে এসে দেখতে কেন একটা ছেলে কওমি মাদ্রাসায় যায়? কারণ – দুটো: হয় তাদের বাপেদের সরকারী প্রাইমারী স্কুলে পড়ানোরও সামর্থ্য থাকে না, নয়ত তাদের বাবারা চায় তাদের সন্তান আলিম হোক। আলিম মানে কি বোঝেন? যে মানুষকে আল্লাহর পাঠানো জ্ঞান শেখায়। এই জ্ঞান 'থিওরি অফ রিলেটিভিটির' মত কয়েকদিন পর পর হুমকির মুখে পড়ে না, ' সেন্ট্রাল ডগমা অফ লাইফের' মত একদিন হঠাৎ উলটো পথে হাঁটা ধরে না। এটা বিবিএ ডিগ্রী না স্যার, যাতে মানুষকে ভুলিয়ে 'গ্রোথ' এর কার্ভ উর্ধমুখী রাখতে শেখান হবে। এটা বার-এট-ল না যাতে চোর-ছ্যাচ্চরকে মুক্তি দেয়ার রাস্তা বাতলানো শেখাবে। যেটা পড়লে টাকা আসে না সেটা পরে কি লাভ সেটা আমি আপনাকে বোঝাতে পারব না। যারা ইসলাম শিখেছে, বুঝেছে তাদের কাছে এই দুনিয়ার ব্যাংক ব্যালেন্সের কোন দাম নেই – এরা টাকা কামাই করার মেশিনের জায়গা থেকে মানুষের পর্যায়ে উঠতে পেরেছে। ইসলাম শেখা আর শেখানোর জন্য যে মানুষগুলো নিজেদের জীবনের পার্থিব সুখ-স্বচ্ছলতাকে পরিত্যাগ করল তাদের অপমান করার অধিকার কে দিল আপনাকে?

৩.
স্যার, অর্থনীতিতে শ্রমবন্টনের কথা পড়েছেন নিশ্চয়ই। আমাদের দেহের কোষ আর টিস্যুর মত আল্লাহ সমাজেও শ্রমবন্টন করে রেখেছেন সমাজটা যাতে চালু থাকে। মেয়েরা কোমল তারা এক ধরণের কাজ করবে, পুরুষরা রুক্ষ তারা অন্য ধরণের কাজ করবে। গাড়ীর টায়ার থাকবে বাইরে, সে শক্ত রাস্তার ঘর্ষণ সহ্য করবে, টিউব থাকবে ভিতরে – সে টায়ারটাকে ফুলিয়ে সচল রাখবে। টিউব কেন সারাজীবন ভিতরে থাকবে – এই বৈষম্য মানি না বলে সে যদি রাস্তায় নামে তবে কতদূর চলবে গাড়ী? মেয়েরা অবশ্যই শিক্ষিত হবে কিন্তু টাকা কামাই তাকে করতেই হবে এ দিব্যি কে দিয়েছে? শিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবল ডিগ্রি নেয়া আর চাকরি করা? আমার স্ত্রী যদি আমার ছেলের সাথে আরো দশটা বাচ্চা পড়ায় আমার আপত্তি নেই, কিন্তু তাকে কেন আমি শতাব্দী বাসের দমবন্ধ ধাক্কাধাক্কির মধ্যে ঝুলতে ঝুলতে গুলশানে অফিস করতে পাঠাব? সে যে টাকা কামাই করে আনছে তা যদি ডে-কেয়ার আর রেডিমেড ফুডেই খরচ হয়ে যায় তাহলে লাভটা হল কি? আমার স্ত্রী যদি ব্যাংকে বা মোবাইল কোম্পানীর কাস্টমার কেয়ারে হাজারো অজানা মানুষের সেবা করার চেয়ে তার প্রিয়জনদের সেবা করা বেশী পছন্দ করে তাহলে কেন আমি তাকে ঘরের বাইরে যেতে বাধ্য করব? সামর্থ্যনুযায়ী আমি তাকে ডাল খাওয়ালে সে যদি খুশী থাকে তাহলে আমি প্রতিদিন মাংশ খাওয়ার লোভে কেন নটা-পাঁচটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর দাসীগিরি করতে বাধ্য করব? সে ঘরে থাকবে এটা তার 'চয়েস' – এখানে আপনার এত গাত্রদাহ কেন?

পথে খালি পায়ে বের হলে পায়ে ময়লা লাগে, শক্ত নুড়িকণা পা ক্ষত-বিক্ষত করে। সারা পৃথিবী চামড়ায় না ঢেকে নিজের পাটা জুতোয় পুরে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ। দেশ স্বাধীন হবার পরে আধুনিকতার জোয়ারে আপনারা সমাজকে যে স্রোতে চালিয়েছেন তাতে আত্মসম্মান রক্ষা করার সবচেয়ে ভাল উপায় পর্দা করা। একটা মেয়ে এই সরল যুক্তিটা বুঝে নিজেকে ঢেকে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলে আপনার পরমতসহিষ্ণুতা হঠাৎ পালিয়ে যায় কেন? আপনাকে কেন আপনার ছাত্রীর চেহারা দেখে চিনতে হবে? চিনলে আপনার কটা পেপার বেশি পাবলিশ হবে? তার গ্রেড কত বাড়বে? সে তো দেহে পর্দা করেছে, মগজে না, তার মেধা দিয়ে তাকে পরিমাপ করতে আপনার কেন এত আপত্তি?

ভাষা আন্দোলনের বোরখার অনুপস্থিতি যদি নারী প্রগতি হয় তাহলে আজ কেন শাড়ির অনুপস্থিতি ক্ষয়িষ্ণু বাঙ্গালীত্ব না হয়ে আধুনিকতার চেহারা নিল? শাড়ি পড়া মেয়েরা আন্দোলন করে যে ভাষা আনল সেটাতে কেন জিন্স-ফতুয়া পড়া মেয়েরা কথা বলছে না? তারা যে ভাষায় কথা বলছে তার নাম কী? সুদূর আমেরিকাতে কেন বাংলাদেশের তরুন প্রজন্ম ভারতীয়দের সাথে হিন্দিতে কথা বলে? বাড়িতে বাড়িতে বিয়েতে হিন্দি গান বাজে, আপনাকেও সেই চটুল কথা-সুরের সাথে নাচতে দেখেছি। আপনার আপত্তি কি আসলে এখানে যে আমাদের হিন্দি গানের সাথে নাচতে রুচিতে বাধে? একটা মেয়ে স্বামীর বদলে হাজারো মানুষের সামনে বিকৃত অঙ্গভঙ্গি করে মনরঞ্জন করবে এটাকে আমরা প্রগতি বলি না স্যার, নোংরামো বলি। একটা ছেলে ছটা মেয়ের সাথে শুয়ে বাপের পয়সা গুণে সপ্তমটাকে বিয়ে করবে – এটা আমাদের কাছে পবিত্র প্রেম মনে হয় না স্যার, দুঃখিত। এটা লুইচ্চামি, ভন্ডামী। আমি লম্বা জামা পড়ে, মুখে দাড়ি রেখে, গোড়ালি অবধি প্যান্ট গুটিয়ে মাথা নিচু করে পথ চলব, আমি আমার তরুণ ভাইদের তা করতে বলব। আপনি আমার গায়ে মৌলবাদের তকমা দেন, আমার একটুও যায় আসে না।

৪.
স্যার আপনি যেমন আপনার আত্মাকে এক অজানা প্রভুর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন তেমন আমিও আমার দেহ-মন-জীবন-মরণ আমার প্রভু আল্লাহর কাছে বিক্রি করে দিয়েছি। স্ত্রী- সন্তানসহ পুরো পরিবারকে উৎসর্গ করেছি। শুধু আমি না স্যার, আমার মত লাখো মুসলিম তরুণ আছে যারা নিজেদের এভাবেই আল্লাহর রাস্তায় কুরবানী করে দিয়েছে নিজেদের। পাকিস্তানে কেন এত জঙ্গী জানেন স্যার, কারণ সে দেশের কিছু মানুষ দেশটিকে আমেরিকার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। আমরা আমাদের দেশকে কারো কাছে বিক্রি করতে দেব না, তাতে আপনি আমাকে হিজবুত তাহরির ভাবেন আর শিবির। জঙ্গী ব্যবসা মাল্টিমিলিয়ন ডলারের ব্যবসা, দেশে জঙ্গী আছে এই হুজুগ তুলতে পারলে অনেক টাকা ভিক্ষে পাওয়া যায়। আমাদের তরুণ সমাজকে লুলা-কানা বানিয়ে সুশীল সমাজকে ভিক্ষে ব্যবসা করতে দেব না, যদি মরে যাই তো যাব – আপনারা জঙ্গী বললেও আল্লাহ জানেন আমরা আমাদের দেশকে কত ভালবাসি, দেশের মানুষকে কত ভালবাসি। কারণ আমি মুসলিম, আমি নিজের জন্য বাঁচিনা, আল্লাহর জন্য বাঁচি।

আপনি আমাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেন না কিন্তু আমরা আমাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখি। কিন্তু সেই স্বপ্ন শুধুই পার্থিব ভোগ-বিলাসের সুখস্বপ্ন না। প্রত্যেকটা পুরুষ যেন হালাল রুযি কামাই করে পরিবারসহ দু'বেলা খেতে পারে সেই স্বপ্ন। প্রত্যেকটা মেয়ে যেন শিক্ষিত হয়, সন্তানকে নিজের সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে শেখায়, নীতিবোধ শেখায় সেই স্বপ্ন। আমরা শুধু স্বপ্ন দেখি না স্যার পরিকল্পনাও করি। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করি। আমাদের এ চেষ্টায় আপনার প্রভু যেমন খাপ্পা তেমনি আপনিও। কিন্তু বিশ্বাস করেন আমরা আপনার উপর ক্ষুব্ধ নই, আপনার জন্য শঙ্কিত। আপনি যাকে প্রভু হিসেবে নিয়েছেন সে মানুষকে প্রতারণা করে স্যার, সে মিথ্যা আশ্বাস দেয়। আপনার জন্য করুণা হয় স্যার, আপনি এত কিছু বুঝলেন – ইসলামটা বোঝার চেষ্টা করলেন না? যিনি আপনাকে মাথা ভরে মেধা দিলেন, সোনা দিয়ে গড়া লেখার হাত দিলেন তার বিরুদ্ধে কতক্ষণ যুদ্ধ করবেন স্যার? আর কতদিন যুদ্ধ করবেন? আপনি যে হেরে যাচ্ছেন সেটা কি আপনার চুলের পাক বলে দিচ্ছে না?

শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যার, আমি আপনার হিদায়াতের জন্য দু'আ করি যেন আপনি ইসলামের মর্ম বুঝে মুসলিম হয়ে মারা যেতে পারেন। আমি যেন আমার শৈশবের হিরোর জানাযা পড়তে পারি।

মূল লিঙ্কঃ http://www.sonarbangladesh.com/blog/monpobon/74759
বিস্তারিত পড়ুন ... »

সময়ের লেজকাটা শিয়াল পণ্ডিত মোহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারকে বলছিঃ স্যার আগে নিজের উঠান পরিস্কার করেন, পরে না হয় আমারটা…

আমরা ইচ্ছা করলে জদু, মধু, কদু হতে পারি, কিন্তু জাফর ইকবাল হতে পারবো না। এটা আমার কথা না, উনার এক ভক্তের কথা ,এ জন্যই উনি যা বলেন তা মানতে হবে এমনটাই সেই ভক্তের ভাষ্য।  এই যে স্যার বলিনি তাতেও অনেকের লেগেছে। জাফর ইকবাল স্যারের পরিচয় নতুন করে কিছু দেওয়ার নেই। আমি তার লেখনী শক্তির অনেক বড় ভক্ত, কিন্তু তার চিন্তা চেতনা, বিশ্বাসের বিরোধী। আমি বিশ্বাস করি তিনি নবী নন(নাউজুবিল্লাহ) বা তিনি যা বলেন তা ওহি(নাউজুবিল্লাহ) নয়। তাই আমি তার অনেক কথার সাথেই একমত হতে পারি না।সত্যি বলতে কেউ যদি নিজের ভার নিজে রক্ষা করতে না পারেন সে দোষ কি আমার?? 
জানি এতটুকু পড়ার পর অনেকে আর পড়বেন না, কিন্তু তাঁতে কি?? তাও আজ আমি লিখবো, নিজেকে ক্ষমা করার জন্য লিখবো। যদি আমার লেখার পাঠক একমাত্র আমি হই তারপর ও আমি লিখবো। আমি লিখবো একটি জলজ্যান্ত ভ্রান্ত বিশ্বাসকে নিঃশেষ করতে, পড়বেন কিনা তা একান্তই আপনার ব্যাপার।
অনেকে স্যারকে প্রভু মানেন, উনার কথাকে চির সত্য মনে করেন।উনার কথায় কোন ভুল থাকতে পারে তা বিশ্বাস করতে চান না।
আমিও বিশ্বাস করি তার লেখায় কোন ভুল নেই, ভুল আছে তার চিন্তা চেতনায়, মানসিকতায়, বিশ্বাসে। বিশ্বাস যেটা করবেন সেটাই তো উনার লেখায় ফুটে উঠবে তাই নয় কি?? মুখে বাঙ্গালিয়ানার বুলি আউরিয়ে, বুকে লালন করেন পশ্চিমা সংস্কৃতি। এখানেই উনার সাথে আমার যত মাতামাতি। অবশ্য আমার মতো একজন আনস্মার্ট তরুন মাতামাতি করলেও উনার কিছু যায় আসে না, কেননা আমাকে নিয়ে তো আর উনার কোন স্বপ্ন নেই!!!
আজ কেন এত কথা আসছে জানেন?? এত কথা আসছে
প্রথম আলোতে প্রকাশিত স্যার এর একটি লেখার জন্য। যার জবাব দিতে আজ আমি লিখতে বসেছি।
গত ৪/১১/২০১১ তারিখে প্রথম আলোতে তার একটা লেখা প্রকাশিত হয় "তরুণ প্রজন্মঃ ওদের নিয়ে কেন স্বপ্ন দেখব না?"নামে।
এখানে লেখাটি পাবেন

যেখানে তিনি তরুন প্রজন্মকে সংজ্ঞায়িত করেছেন টি-শার্ট পরা সুদর্শন কিছু তরুণ ও উজ্জ্বল রঙের ফতুয়া পরা হাসিখুশি কিছু তরুণীর চেহারার সাথে। তার এই ধারনা এসেছে মোবাইল কোম্পানি গুলোর বিজ্ঞাপন দেখে। আমি উনাকে দোষ দিবো না।টিভি মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দেখে  সমাজের বৃহত্তর অংশ বিচ্যুত যে কারো এমন ধারনা হওয়াই স্বাভাবিক। অবশ্য নিজেকে তিনি তরুন প্রজন্মের কাছাকাছি একজন ভাবেন। তারপরও আমি তরুন প্রজন্মের একজন হয়ে বলতে পারি, তার সংজ্ঞা কোনভাবেই ঠিক না। উনার লেখায় উনি বলতে চেয়েছেন, উনার সংজ্ঞায়িত 'তরুন প্রজন্ম'কে নিয়ে তিনি সপ্ন দেখেন, কিন্তু আমি বলতে চাই টি শার্ট পড়লেই সুদর্শন হওয়া যায় না কিংবা উজ্জ্বল রঙের ফতুয়া পড়ে গগন বিদারী হাসি দিলেই বলা যাবে না সে দেশের সম্পদ, তাকে নিয়ে সপ্ন দেখো।মূলত তিনি এর মাধ্যমে তরুনীদেরকে এই বানী পৌঁছে দিলেন যে, তোমরা যদি ফতুয়া পরে রাস্তায় না বের হও তোমাদেরকে সত্যিকার অর্থে সম্ভাবনাময় তরুণী বলা যাবে না!আর যদি তাই হতো, তা হলে প্রতি বছর নোবেল পুরস্কারটা বোধহয় সখ,তিন্নি,মিলা, তিশা কিংবা নাফিজারা নিয়ে আসতো।তাই বলা যায় তার কাছে তরুন প্রজন্মের চেহারাটা এমন-


এটাই কি স্যারের কাছে তরুন প্রজন্মের সংজ্ঞা


স্যার সংজ্ঞায়িত ড্রেস কোড তো এমনি হওয়া উচিত। তাই নয় কি?? 
তিনি লিখেছেন," বেশ কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছেলেমেয়েরা ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটা আলোকচিত্র প্রদর্শনী করেছিল। আমি আর আমার স্ত্রী সেটা দেখতে গিয়েছিলাম। বড় বড় ছবি দেখতে দেখতে আমার স্ত্রী আমাকে বলল, 'একটা জিনিস লক্ষ করেছ?' আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী জিনিস? আমার স্ত্রী বলল, 'ভাষা আন্দোলনে কত মেয়ে! কিন্তু একটি মেয়েও বোরকা পরে নেই, একটি মেয়েও হিজাব পরে নেই।' আমি তাকিয়ে দেখি, তার কথা সত্যি। ষাট বছর আগে এ দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের বোরকা পরতে হতো না, এখন মেয়েদের বোরকা পরতে হয়।"

৬০ বছর আগে কোন পুরুষ ছাত্রী হোস্টেলে ঢুকতে পারতো না, সে সম্পর্কে যেই হোক না কেন।(যেটা আপনি করেছেন)
৬০ বছর আগে কোন মেয়ে মদ,সিগারেট, ইয়াবাতে আসক্ত ছিলো না।
৬০ বছর আগে শিক্ষকরা পরিমল ছিলো না।
৬০ বছর আগে কেউ পরিমলদের সমর্থন দিত না।
৬০ বছর আগে দেশে যৌন হয়রানি/ ইভ টিজিং হতো না।
৬০ বছরে দেশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, যা আগে ছিল না। ৬০ বছর আগে কোন নারী একা সমাজে চলতো না।সঙ্গী হিসাবে থাকতো বাবা, ভাই কিংবা স্বামী। এখন একজন নারী একাই সমাজে চলতে পারে।
আর বোরকা?? বড়ই হাসির কথা বললেন জনাব। বোরকা পর্দার জন্য আবশ্যক নয় এটা আপনার মতো নাস্তিক কিভাবে বুঝবে?? ডঃ জাকির নায়েক একটা কথা বলেছিলেন,"মানুষ কম জানলে হয় নাস্তিক, আর বেশী জানলে হয় আস্তিক"। আপনি বোরকা আর পর্দা দুটিকে গুলিয়ে ফেলেছেন। একটাকে আরেকটার প্রতিশব্দ বানিয়ে ফেলেছেন।
বোরকা বর্তমান বাঙালি সমাজের একটা কালচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন ধর্ম-বর্ন নির্বিশেষে মেয়েরা বোরকা পড়ে। কেন শুনেন নি, ঝিনাইদহের শৈলকূপায় মুসলমান- হিন্দু- আদিবাসী মেয়েরা স্বেচ্ছায় বোরকা পড়ে স্কুলে যায়?? এর জন্য তাদের কেউ বাধ্য করেনি। এমন হাজারো উদাহরণ রয়েছে এই সমাজে। আর মুসলিম মেয়েরা বোরকাকে বাড়তি পর্দা কিংবা পর্দাকে একটু শক্ত করার জন্য ব্যাবহার করে এটা আপনাকে কে বুঝাবে???

আপনার মতে বোরকা পড়লে মেয়েদের সব শক্তি, সৃষ্টিশীলতা বোরকার নিচে আটকা পড়ে যায়।আপনি বোরকা পড়া মেয়েদের নিয়ে সপ্ন দেখতে পারেন না। এটা বোরকার দোষ নয়, এই দোষ আপনার বিশ্বাসের, আপনার মানসিকতার। আপনি বিশ্বাস করতে চান না, বরকা/হিজাব পড়েও বিশ্ব জয় করা যায়।  তাহলে এই মেয়েগুলোর কথা কি বলবেন??
Ruqaya al Ghasara, 100m and 200m for Bahrain


Najmeh Abtin, archery for Iran
বাহরাইনের দৌড়বিদ রুকায়া- আল-গুলশানার, ইয়েমেনের অওাসিলাহ ফিদেল সাদ,ইরানের আর্চারি খেলোয়াড় নাজমেহ আবতিনরা কিভাবে বেইজিং অলিম্পিকে আসতে পেরেছে?? কেন হিজাব না পড়েও বাংলাদেশ প্রমিলা ফুটবল দল, হিজাব পড়া ইরানি ফুটবল দল থেকেও এত্ত নিচে???প্রশ্ন থেকে যায় এদের দেখে আপনি কি বলবেন???

পরিমলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্ল্যাকার্ড নিয়ে এই ছোট্ট আপুটি, সে কি হিজাব দিয়ে ঘরের কোনে বসেছিলো?? তার হিজাব কি তাকে ক্ষুদ্র জায়গায় আবদ্দ করে দিয়েছিলো??

\
জগন্নাথ আন্দোলনের সেই বিখ্যাত আপুটি, মনে পড়ে??

আমি বুকে হাত রেখে বলতে পারি, বোরকা সৃজনশীলতা শক্তি নষ্ট করে না বরং বেহায়াপনা, মাদক,লিভ টুগেদার মানুষের ভেতরের শক্তি নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। যার মধ্যে শক্তি থাকবে, মেধা থাকবে, সৃষ্টিশীলতা থাকবে সে এমনিতেই উপরে উঠে আসবে। আপনাদের ওসব খোঁড়া যুক্তি কোন কাজের না।
"জাতীয় তেল গ্যাস ইস্যুতে যখন আমরা সাধারণ ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিলাম তখন ড: জাফর ইকবাল সাহেব একটা কলাম পর্যন্ত লিখেননি ! কেন কেউ বলতে পারবেন ?অথচ এর আগের সরকারের সময় কিন্তু ঠিকই অবাধে লিখে গেছেন তিনি।
স্যার অনেক গর্বের সাথে জানালেন, শিক্ষানীতি করার কমিটিতে আপনিও ছিলেন। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক করার কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন আপনিও। কিন্তু জানেন, এ শিক্ষানীতিতে ধর্মীয় শিক্ষাকে চরমভাবে অবহেলা, অবজ্ঞা করে লালিতকলার উপরে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার মানে সাধারণ শিক্ষার সাথে মিশিয়ে ফেলা নয়। কিন্তু এই শিক্ষানীতিতে মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার ও আধুনিকায়নের নামে যেভাবে ধর্মীয় ও আরবি বিষয়ের উপর ছুরি চালিয়েছেন তাঁতে ২০১২ সালের আগেই না সাধারণ শিক্ষার মাঝে মাদ্রাসা শিক্ষার বিলুপ্তি ঘটে। অবশ্য আপনারা এটাই চান, তাহলে আপনাদের ভ্রান্ত পাশ্চাত্য ধারণাগুলো সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।
আপনারা বিশ্বাস করেন, মাদ্রাসা শিক্ষার কারণে দেশে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের উত্থান ঘটেছে। ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়ায় সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে??
আচ্ছা ভাই এই কথা বললে তো আজ পাগলেও হাসবে। যখন সমাজে ইভটিজিং, এইডস এগুলো থেকে বাঁচার জন্য সমাজে ধর্ম চর্চার কথা বলা হচ্ছে তখন এদের এই কথাগুলো পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।
 তিনি বড়ই হতাশ মাদ্রাসার ছেলেমেয়েরা ঠিকভাবে লেখাপড়া করার সুযোগ পাচ্ছে না বলে ,দেশের জন্য তারা কি করেছে বা করতে পারবে তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। তারা দেশকে কিছু দিতে পারে তা তিনি বিশ্বাস করতে পারেন না। তাইতো সেদিন তার গালে চপেটাঘাত করলো মাদ্রাসার ছাত্র জামিল। শাবিপ্রবিতে(শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশ্ববিদ্যালয়) এবার ৭ টি বিভাগে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য দরজা বন্ধ, কারন তারা এগুলা পারে না। আর এর পিছনে মূল হোতা হিসাবে কাজ করেছে সিএসসি ডিপার্টমেন্টের প্রধান মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যার। অথচ সেই বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ভর্তি পরীক্ষায় কিনা প্রথম হলো এক মাদ্রাসা ছাত্র!!! সত্যি অবাক করা বিষয়, তাই নয় কি???

এবার আসি একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে। কেন তিনি তারুন্যের সংজ্ঞাটা এভাবে দিলেন তা পরিস্কার করি। তার মেয়ের নাম ইয়েশিমা ইকবাল , জানা যায় তিনি কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে এখন হার্ভার্ড থেকে মনোবিজ্ঞানে পিএইচডি করছেন। তার স্বাভাবিক জীবনের কয়েকটি ছবি শেয়ার করছি-

জাফর কন্যার বাঙালীয়ানা পোশাক ও আচরনে ফুটে উঠেছে। এই জাফর ইকবালেরাই বাঙালীত্ব কপচিয়ে হাজারো তরুনের ব্রেন ওয়াশ করে


প্রগতিশীল হতে হলে মদ খাওয়া ধরতেই হবে। বাবা জাফর ইকবাল কি এই শিক্ষাই দিয়েছেন কন্যাকে?


আহারে বাঙালি সংস্কৃতি লালনের অবস্থা??? খাড়া গজব পড়ুক এদের উপর


এটা স্যারের তরুণ প্রজন্মের ড্রেস কোড
হয়তো আপনারা প্রশ্ন তুলতে পারেন, আরেকজনের ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলার কি আছে?? অনেক কিছু আছে। তিনি যদি বোরকার অন্তরালে থাকা মা- বোনরা দেশের জন্য কি করেছে , কতটুকু করেছে, কাউমি মাদ্রসার আলেম ওলামারা দেশের জন্য কি করেছে বা কি করতে পারে এমন প্রশ্ন তুলতে পারেন, তাহলে আমাদের ও অধিকার আছে , মগজে-বুকে--মনে পশ্চিমা সংস্কৃতি লালন করা তার মেয়ে দেশের জন্য কি করার ক্ষমতা রাখে?? তিনি কি পারেন তার মেয়েকে বাঙালি সংস্কৃতিতে ফিরিয়ে আনতে?? না, তিনি পারেন না। তাই তো সমাজকে গড়তে চাচ্ছেন তার মেয়ের লাইফ স্টাইলের মতো করে। সবাইকে স্মার্টনেসের নামে অশ্লীলতার বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন।
অনেকটা শিয়ালের গল্পের মতো,গল্পটি দিয়ে শেষ করছি আজকের লেখাঃ
একবার এক শিয়াল গভীর বনে শিকার করতে গিয়ে ফাঁদে আটকা পড়ে। অনেক কষ্টে উদ্ধার পেলেও হারায় তার লেজ। মনের কষ্ট নিয়ে স্বজাতির কাছে ফিরে যায়,মান সম্মান রক্ষা করতে নতুন বুদ্ধি  ফাঁদে লেজকাটা শিয়াল। শিয়াল সম্প্রদায়কে একসাথে ডেকে নিজেকে আধুনিক হিসাবে প্রকাশ করতে তার লেজ কেটে ফেলেছে বলে ঘোষণা দেয় এবং সবাইকে স্মার্ট হওয়ার জন্য তাদের লেজ কেটে ফেলার উপদেশ দেয়। কিন্তু এক বৃদ্ধ শিয়াল তার লেজ কাটার সত্য ঘটনা প্রকাশ করে দিলে বন ছেড়ে পালাতে হয় লেজকাটা শিয়াল পণ্ডিতের।
উৎসর্গঃ সময়ের লেজকাটা শিয়াল পণ্ডিত মোহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারকে।
(মনে রাখবেন, উন্নতি হলে নিজ সংস্কৃতি, ধর্ম দিয়েই সম্ভব। অন্ধভাবে কাক হয়ে বকের হাঁটা অনুকরন করতে গেলে পাছে হয়তো কাকের হাঁটাও ভুলে যাবেন। তাই সাধু সাবধান।)
** লেখাটা শেয়ার করা উচিত নয় কি?? ধন্যবাদ কষ্ট করে পড়ার জন্য
বিস্তারিত পড়ুন ... »

ওদের নিয়ে কেন স্বপ্ন দেখব না?

'তরুণ প্রজন্ম' বললেই আমাদের চোখে টি-শার্ট পরা সুদর্শন কিছু তরুণ ও উজ্জ্বল রঙের ফতুয়া পরা হাসিখুশি কিছু তরুণীর চেহারা ভেসে ওঠে। আমাদের দেশে মোবাইল ফোন আসার পর কোম্পানিগুলো পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন দিয়েছে, আর এ বিজ্ঞাপনের কারণেই সম্ভবত তরুণ-তরুণীদের এ ছবি আমাদের মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে আমি অবশ্য বিজ্ঞাপনের তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে কাছাকাছি বাস করি, তাই মাঝেমধ্যেই আমি ভুলে যাই যে ছবিটি সম্পূর্ণ নয়।
সৌদি আরবে মাত্র কয়েক দিন আগে আটজন বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ করা হয়েছে (খোদা যেন আমার ওপর করুণা করেন, জীবনে আর কোনো দিন যেন আমাকে এ শব্দটি লিখতে না হয়), পত্রপত্রিকায় তাঁদের যে বয়স লেখা হয়েছে, তাতে তাঁদের কিন্তু আমাদের তরুণ প্রজন্মের মাঝেই ফেলতে হবে। বাংলাদেশের ঠিক কতজন মানুষ প্রবাসে আছেন, এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ৬০ থেকে ৮০ লাখ, এ রকম একটা সংখ্যা শুনে থাকি। এই বিশালসংখ্যক মানুষের একটা বড় অংশ আমাদের তরুণ প্রজন্মের অংশ, আমি তাঁদের নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখতে পারি না। আমি জানি, অত্যন্ত অল্প কিছু
অর্থের জন্য তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যযুগীয় দেশে পরিবার-পরিজন ছাড়া নিঃসঙ্গ একধরনের জীবন যাপন করেন। এ দেশের অর্থের সবচেয়ে বড় অংশটুকু তাঁদের শ্রম দিয়ে আসে। কিন্তু এ দুর্ভাগা মানুষগুলোর জন্য এ দেশের সরকারের বিন্দুমাত্র মমতা নেই। সৌদি আরবে আটজন বাংলাদেশির নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর আমাদের পররাষ্ট্রসচিব ঘোষণা দিয়েছেন, সবকিছু ঠিকভাবে হয়েছে। আমরা আমাদের কমনসেন্স দিয়ে জানি, ভয়ংকর একটি অবিচার হয়েছে, টুকরো টুকরো ঘটনার যেসব ছিটেফোঁটা আমাদের পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, সেখান থেকে আমরা কোনোভাবেই হিসাব মেলাতে পারি না। বিদেশের মাটিতে কষ্ট করে বেঁচে থাকা এই বিশাল তরুণ প্রজন্ম নিয়ে আমার ভেতরে কোনো স্বপ্ন নেই, কিন্তু দুঃখ, বেদনা ও ক্ষোভ আছে।
বাংলাদেশের অর্থের জোগান দেওয়ার জন্য প্রবাসী শ্রমিকের পরপরই যাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁরা হচ্ছেন আমাদের গার্মেন্টসের মেয়েরা। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির কাজ শেষ হওয়ার পর দল বেঁধে যখন এই মেয়েরা কথা বলতে বলতে হাসতে হাসতে তাঁদের ঘরে ফিরে যেতে থাকেন, যারা তাঁদের দেখেছে তারা সবাই জানে, এ মেয়েগুলোর প্রায় সবাই কম বয়সের তরুণী। আমাদের দেশের যাঁরা বড়লোক, তাঁদের সবারই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আছে এবং তাঁরা সবাই আমাদের এ মেয়েগুলোকে শোষণ করে বড়লোক হয়েছেন। শুধু যে শোষণ করেছেন, তা-ই নয়, তাঁদের মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করেননি। আমার মনে আছে, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে শ্বাসরোধ হয়ে মারা যাওয়া একটি নিয়মিত ঘটনা ছিল। মৃত্যুর পর তাঁদের প্রাণহীন দেহগুলো সারি সারি ফেলে রাখার দৃশ্যগুলো খবরের কাগজে ছাপা হতো, সেই দৃশ্যগুলো দেখে আমরা হতবাক হয়ে যেতাম। কিন্তু তার পরের অংশটুকু ছিল আরও অনেক ভয়াবহ। আমার স্পষ্ট মনে আছে, খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে, মৃত্যুর পর ক্ষতিপূরণ হিসেবে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আড়াই হাজার টাকা করে দিয়েছে। এত অল্প দামে মানুষের প্রাণ কিনে নেওয়ার রেকর্ড পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির এ মেয়েগুলো আমাদের তরুণ প্রজন্ম, কিন্তু তাঁদের নিয়েও আমি কেন জানি কোনো স্বপ্ন দেখতে পারি না।
কিছুদিন আগে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে একটা বই বের হয়েছে। অত্যন্ত চমৎকার একটা বই। বাংলাদেশের মেয়েরা শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি—এ ধরনের নানা বিষয়ে কী ধরনের কাজ করছে, কী অবদান রাখছে, তার ওপর চমৎকার প্রবন্ধ। কিন্তু গার্মেন্টসের মেয়েদের নিয়ে একটি লাইনও লেখা নেই! তাঁদের জীবনটুকু নিশ্চয়ই এ দেশের অন্য নারীদের জীবনের তুলনায় এত তুচ্ছ যে একটি গবেষণা গ্রন্থের পৃষ্ঠায় তাঁদের কথা উঠে আসার কোনো সুযোগ নেই। যাঁরা দেশের নারীদের নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন, তাঁরাই যদি তাঁদের হিসাবের মধ্যে না ধরেন, আমি কেমন করে এসব প্রজন্মকে নিয়ে স্বপ্ন দেখব?
ইদানীং গাড়ি দুর্ঘটনা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছে। সবাই জানে, এর বড় কারণ ড্রাইভারদের দায়িত্বহীনতা। পরিবহন-শ্রমিকদের নেতা, যিনি ঘটনাক্রমে একজন মন্ত্রী, তিনি অবশ্য তাঁর পুরো বাহিনী নিয়ে দেশে আন্দোলন করে চলেছেন। খুব মোটা দাগে তাঁর আন্দোলনের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা যায় যে তাঁরা গাড়িচাপা দিয়ে পথচারী যাত্রীদের মেরে ফেলার একটা লাইসেন্স চান। এ ব্যাপারে আরেকজন প্রতিমন্ত্রীও যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। তিনি বলে দিয়েছেন, প্রতিটি মৃত্যু পূর্বনির্ধারিত, তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর সঠিক সময়ে মারা গিয়েছেন (অর্থাৎ বেপরোয়া ড্রাইভারদের কোনো দোষ নেই, তাঁরা আল্লাহর ইচ্ছাকে বাস্তবায়ন করে সম্ভবত সঠিক কাজটি করেছেন)। সবকিছু মিলিয়ে একটা জটিল অবস্থা এবং যাঁরা আমার পরিচিত, তাঁরা কেউ আমাকে রাস্তায় গাড়িতে করে সিলেট থেকে ঢাকায় যেতে দেন না। তাই ইদানীং আমি ট্রেনে যাতায়াত করি। ট্রেনে যাতায়াত করায় আমি ইদানীং আরও একধরনের তরুণ প্রজন্মকে নতুন করে দেখতে পাচ্ছি। তাদের স্কুল-কলেজে পড়ার কথা, কিন্তু তারা মাথায় কলার ঝাঁকা নিয়ে কলা বিক্রি করে, প্লাস্টিকের প্যাকেটে করে পপকর্ন বিক্রি করে, বগলে খবরের কাগজ চেপে ধরে খবরের কাগজ বিক্রি করে। তাদের কারও কারও কী অসম্ভব মায়াকাড়া চেহারা! দেখে মনে হয়, পরিপাটি করে সাজিয়ে তাদের কোনো একটা গাড়িতে তুলে দিলে কেউ বুঝতেই পারবে না যে সে একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যাচ্ছে না! এই তরুণ প্রজন্ম বড় হয়ে কী করবে? একটি কিশোরের কি কলা বিক্রি করে করে বড় হওয়া সম্ভব? সেই কিশোরটি কী স্বপ্ন দেখে? আমি কি তাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারি?
বেশ কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছেলেমেয়েরা ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটা আলোকচিত্র প্রদর্শনী করেছিল। আমি আর আমার স্ত্রী সেটা দেখতে গিয়েছিলাম। বড় বড় ছবি দেখতে দেখতে আমার স্ত্রী আমাকে বলল, 'একটা জিনিস লক্ষ করেছ?' আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী জিনিস? আমার স্ত্রী বলল, 'ভাষা আন্দোলনে কত মেয়ে! কিন্তু একটি মেয়েও বোরকা পরে নেই, একটি মেয়েও হিজাব পরে নেই।' আমি তাকিয়ে দেখি, তার কথা সত্যি। ষাট বছর আগে এ দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের বোরকা পরতে হতো না, এখন মেয়েদের বোরকা পরতে হয়। ষাট বছর আগে এ দেশের মেয়েরা ধর্মহীন ছিল, এখন মেয়েরা ধর্মভীরু হয়ে গেছে—আমি সেটা বিশ্বাস করি না। যাঁরা জ্ঞানীগুণী গবেষক, তাঁরা প্রকৃত কারণটি খুঁজে বের করবেন। আমি সোজাভাবে বিষয়টি এভাবে দেখি, যে সমাজে পুরুষ আর নারী সমান সমানভাবে পাশাপাশি থেকে কাজ করে, সেই সমাজকে মৌলবাদীদের, ধর্ম ব্যবসায়ীদের খুব ভয়। তাই মেয়েদের ঘরের ভেতর আটকে রাখতে পারলে সবচেয়ে ভালো। একান্তই যদি ঘরের ভেতর আটকে রাখা না যায় অন্তত বোরকার ভেতর আটকে রাখা যাক।
আমাদের সমাজে মেয়েদের পিছিয়ে নেওয়ার এ পরিকল্পনাটুকু কারা করেছে, তারা কীভাবে কাজ করেছে, গবেষকেরা সেগুলো বের করতে থাকুন। কিন্তু আমরা জানি, এ কাজ করেছে পুরুষেরা। কক্সবাজারের পথে একবার হঠাৎ একটি মেয়ের সঙ্গে দেখা। মেয়েটি বলল, 'স্যার, আমি আপনার ছাত্রী।' আমি খুবই অপ্রস্তুত হলাম, নিজের ডিপার্টমেন্টের একটা ছাত্রীকে আমি চিনতে পারছি না। আমি এত বড় গবেট! ছাত্রীটি তখন নিজেই ব্যাখ্যা করল। বলল, 'স্যার, আমি তো ডিপার্টমেন্টে বোরকা পরে যাই, তাই আপনি চিনতে পারছেন না।' আমি তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। ক্লাসে যার শুধু এক জোড়া চোখ দেখেছি, তাকে আমি কেমন করে চিনব? কিন্তু গত ৫০ বছরে যে মেয়েদের একটি প্রজন্মকে ঘরের ভেতর আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, সেই প্রজন্মকে নিয়ে আমরা কী স্বপ্ন দেখব?
পাকিস্তান নামক দেশটি লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে। সেই দেশে জঙ্গিদের ভয়াবহ একটা উত্থান হয়েছে। ভয়ংকর ভয়ংকর কাণ্ড করার জন্য তারা যাদের ব্যবহার করে, তাদের বেশির ভাগই কিন্তু তরুণ। আমাদের দেশেও এর চেষ্টা করা হয়েছিল। জোট সরকার তাদের উৎসাহ দিয়ে খাল কেটে কুমির ডেকে এনেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার খাল কাটা বন্ধ করেছে। আর আওয়ামী লীগ সরকার খাল বুজিয়ে কুমিরগুলোকে বংশবৃদ্ধি করতে দিচ্ছে না। আমাদের দেশে পাকিস্তানি সর্বনাশ ঘটতে পারেনি, কিন্তু তার পরও আমরা হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাই, হিজবুত তাহ্রীর বা তাদের সমমনা সংগঠন ঝটিকা মিছিল করছে, আমি তখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাদের চেহারাগুলো দেখি। সবাই কম বয়সী তরুণ। যেভাবেই হোক, তরুণ প্রজন্মের একটা অংশকে মৌলবাদে দীক্ষা দেওয়া হয়েছে, সেই তরুণদের সংখ্যা কত? মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জন্য তাদের মমতা নেই, ৩০ লাখ মানুষ হত্যাকারী পাকিস্তানের জন্য এখনো তাদের ভেতর মমতা কেমন করে বেঁচে আছে? যুদ্ধাপরাধীদের জন্য তাদের এত ভালোবাসা কেন? এই তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আমরা কী স্বপ্ন দেখব?
শিক্ষানীতি করার কমিটিতে অন্যদের সঙ্গে আমিও ছিলাম। সেখানে অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে মাদ্রাসার লেখাপড়াটাকেও আধুনিক করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। লেখাপড়ার ব্যাপারে মাদ্রাসার ছেলেমেয়েরা যে বৈষম্যের মধ্যে পড়ে, সেটা দূর হয়ে যাওয়ার কথা। যত উৎসাহ নিয়ে শিক্ষানীতি করা হয়েছে, এত উৎসাহে সেটা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আমরা দেখেছি, শিক্ষা খাতে টাকাপয়সাও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাজেই ভবিষ্যতে কী হবে, আমরা জানি না। যা-ই হোক, ভবিষ্যতে কখনো হয়তো মাদ্রাসার ছেলেমেয়েরা ঠিকভাবে লেখাপড়া করার সুযোগ পাবে, কিন্তু তার পরও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ব্যাপারটা কিন্তু এখনো অমীমাংসিতই থেকে গেল। তারা মূলধারায় আসতে চাইছে না। যদি না আসে, তাহলে তারা কওমি মাদ্রাসার লেখাপড়া শেষ করে কী করবে? তারা সমাজকে কী দেবে? দেশকে কী দেবে? আমরা এ মুহূর্তে তাদের নিয়ে কী স্বপ্ন দেখব?
উচ্চশিক্ষা বললেই আমাদের চোখে দেশের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছবি ভেসে ওঠে। আমরা ভুলে যাই যে আসলে এ দেশে সবচেয়ে বেশি ছাত্রছাত্রীর উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে যে বিশ্ববিদ্যালয়টি, তার নাম 'ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি' বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা কি জানি, বড় বড় হাইফাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যখন তাদের চাকচিক্য নিয়ে সাঁই সাঁই করে ওপরে উঠে যাচ্ছে, তখন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির লাখ লাখ ছাত্রছাত্রী (হ্যাঁ, হাজার হাজার নয়, লাখ লাখ) ধুঁকে ধুঁকে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কী চরম অবহেলায়, শিক্ষক ছাড়া, ক্লাসরুম ছাড়া, কোনো ধরনের মমতা ছাড়া আমরা কত লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর শিক্ষাজীবনটুকু নষ্ট করে দিচ্ছি! আমরা আমাদের এ তরুণ প্রজন্ম নিয়ে কী স্বপ্ন দেখব, কেউ কি বলে দেবে?
আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন অসম্ভব সৌভাগ্যবান মানুষ। আমি যে কাজগুলো করতে সবচেয়ে ভালোবাসি, সারাটি জীবন সে কাজগুলোই করার সুযোগ পেয়েছি। আমার চমৎকার সব সহকর্মী, তরুণ প্রজন্মের বিশাল একটা অংশের সঙ্গে আমার যোগাযোগ। তাদের নিয়ে আমরা গণিত অলিম্পিয়াড করি, ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াড করি, সায়েন্স অলিম্পিয়াড করি (দাবা অলিম্পিয়াড প্রথমবারের মতো শুরু করার একটা দুঃসাহসিক পরিকল্পনা করা হয়েছে), মোবাইল টেলিফোনে ভর্তি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন করিয়ে ফেলি, নতুন নতুন কাজ করার স্বপ্ন দেখি। সবকিছু করার পরও আমার বুকের ভেতর কোথায় যেন টনটন করতে থাকে। দেশের সবচেয়ে সৌভাগ্যবান তরুণ প্রজন্মের একটা ক্ষুদ্র অংশ নিয়ে আমাদের সবার স্বপ্ন, আমাদের উচ্ছ্বাস, আমাদের গর্ব আর অহংকার।
অন্যরা কী দোষ করেছে? তাদের নিয়ে আমরা কোনো দিন স্বপ্ন দেখব না, এটা কেন এত সহজে আমরা মেনে নিলাম?
মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক। অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

মূল লিঙ্কঃ http://www.prothom-alo.com/detail/date/2011-11-04/news/199007
বিস্তারিত পড়ুন ... »

৯ নভে, ২০১১

এই নোট পড়ে খারাপ লাগলে নির্দ্বিধায় আমাকে আনফ্রেন্ড করতে পারেন

আমার ভেতর থেকে প্রচন্ড তাগিদ না পেলে আমি লিখতে বসিনা। ওটা আমার কাজও না। ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতেও আমার আপত্তি নেই যতটা আপত্তি এই লিখার ক্ষেত্রে। এই লিখা যখন লিখছি তখন প্রচন্ড রাগে আমার গা জ্বলছে।
আমি এত ভূমিকা না করে সরাসরি আসল কথায় আসি। স্পা না করলে কি মেয়েরা মরে যাবে? বাঙ্গালী মেয়ারা যথেষ্ঠ রূপবতী। এই রূপ গত কয়েক বছরে ধুম করে জেগে ওঠেনি। তারা আগেও রূপবতী ছিল এখনো আছে। আমি জানিনা যে স্পা তে এমন কি আছে যে তার রূপে এমন বিশেষ কিছু অ্যাড করবে যা না থাকলে তার জীবন চলবেনা? যার কারনে অন্য একজন মানুষের সামনে আধা নগ্ন হয়ে body message করাতে হবে। লজ্জা শরমের মাথা কি কাঁচাই খেয়ে ফেলছি আমরা?
আমাদের মায়েরা ,দাদীরা,নানীরা তো কোনদিন এইসব করেনি। তাতে কি আমাদের বাবারা, নানারা,দাদারা তাদের ছেড়ে চলে গেছে? না তাদের বিয়ে হয়নি? কি ক্ষতি হয়েছে তাদের যারা নিজেদের অন্যের সামনে কাপড় খুলে শরীর মর্দন করান নি?
আমি নিজে মেয়ে মানুষ। আমি খুব ভাল করেই জানি মেয়েরা এত সাজ গোজ কেন করে। খুবই সিম্পল উত্তর। মানুষ তাদের দিকে তাকাবে , প্রশংসা করবে। কার না ভাল লাগে প্রশংসা শুনতে! আমারো ভাল লাগে।কিন্তু আপারা দুনিয়ায় খালি আমরা মেয়েরাই নাই। আমাদের ভাইরাও আছে। সৃষ্টিগতভাবে যারা আপনাদের উপর এবং আপনারা তাদের উপর দুর্বল। কিন্তু এইটা ভাইদের ক্ষেত্রে একটু না অনেক বেশি। এই কথাগুলা বলতে আমার খুবই খারাপ লাগে। অনেক বেশি লজ্জা লাগে এই জন্য যে
এত ব্যাখ্যা করে আমার বোনদেরকে এসব আমার বলতে হয়। আমি বাংলায় এসব লিখতে পারবনা।
Most of the man gets sexually aroused when---
আপনি টাইট ফিটিং কাপড় পরেন।
আপনি ওড়না পরেন না/ গলায় ঝুলায় রাখেন/ একপাশে ঝুলায় রাখেন।
আপনি যখন অর্ধস্বচ্ছ কাপড় পরেন।
আপনার পেট/পা/পীঠ যখন দেখা যায়।
আপনি যখন ঠোঁট রাঙ্গান।
আপনি যখন চোখে স্মোকি সাজ পরেন।

আরও শত শত কারন থাকতে পারে।

কি ? মনে হচ্ছে যে ছিঃ ছিঃ ছেলেরা এত খারাপ! তাইনা? The fact is that they are CREATED like this. Do you understand my dear sisters? THEY ARE CREATED BY ALLAAH LIKE THIS.

শুধু আল্লাহ্‌র ভয়/সমাজের ভয়/ ভালত্ব/ সুস্থ বিবেক আছে দেখেই এখনো কোন ভাই এই ধরণের আপাদের রাস্তায় ধরে কষে কষে কয়েকটা চড় বসান নি।[আল'হামদুলিল্লাহ। এই বিপদ আমার উপর আসার আগেই আল্লাহ্‌ আমাকে রক্ষা করেছেন।একবার কি হল, তখনো আমি ঠিকমত হিজাব করিনা, মাথায় একটু আধটু কাপড় দেই। একদিন প্রচন্ড গরমের মধ্যে ক্লাসে গেছি। মাথায় কাপড় দেইনি। আমাদের সাথে সিনিয়র অফিসাররাও ক্লাস করতেন। এঁদের মধ্যে একজন ভাই পুরো ক্লাসের মধ্যে আমাকে এমন ঝাড়ি দিলেন! টিচার ছিল, সব স্টুডেন্ট ছিল। আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, ক্লাস থেকে বের হয়ে গেছি। অনেক কান্নাকাটি করেছি। ভাইয়া আমাকে বলেছিলেন, "The Jews know our scriptures better than us, but they do not follow.[Inspite of knowing about hijab you don't wear it properly,so] Do you think you are better than that Jew?" এই একটা কথা আমার ভেতরটা কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আমি বলেছিলাম হিজাব পরলে আমার কষ্ট হয়, দম বন্ধ হয়ে যায়, এ সি রুমেও ঘামতে থাকি। উনি বললেন, " Did you ask Allaah to help you with this?" আসলেই তো, যার জন্যে হিজাব করছি তাঁর কাছেই তো সাহায্য চাইনি। আমি আর কোন উত্তর দিতে পারিনি ভাইয়াকে। উনি ঠিক কথাই বলেছিলেন আমাকে। হয়ত রুক্ষভাবে বলেছেন,কিন্তু ওই সময় আমার জন্য ওগুলো থাপ্পড়ের কাজ করেছে, আল'হামদুলিল্লাহ এখন তীব্র গরমেও মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঢেকে রাখলেও আমার কোন অসুবিধা হয় না। আমি গরম লাগার দোহাই দিই। কিন্তু ওইদিন কি হবে যেদিন সূর্য মাথার এক হাত উপরে থাকবে। আল্লাহ্‌ মাফ করুন। ]

আপারা,আরো কয়েকটা uncensored কথা বলি। এটা জানেন তো যে মানুষ(অধিকাংশ) খুব সহজেই বোর হয়ে যায় আর নতুন কিছু খুঁজতে থাকে যা তাকে আনন্দ দেবে। পশিমাদের মধ্যে হোমসেক্সুলালিটি এত বেশি এর কারন নিয়ে কখনো চিন্তা করেছেন? কেন যেখানে চাইলেই মানুষ আপনার বিছানায় আসতে রাজী সেখানে কেন মেয়ে মেয়ের সাথে ছেলে ছেলের সাথে যেতে চায়? এরা নারী দেহ দেখতে দেখতে ক্লান্ত। এদের রূচি আস্তে আস্তে বিকৃত হয়ে গেছে। এখন তারা নিজেদের মধ্যে থেকেই সংগী খোঁজে। আল্লাহ্‌ মাফ করুন। হেদায়েত দিন।

আপারা, আমার লেখা এলোমেলো হচ্ছে আমি জানি। রেগে আছি তো তাই।
একটা কথা বলি শোনেন। আপনি মানুষকে যা দেখাবেন তা দেখেই তারা আপনার মূল্যায়ন করবে। মানুষের শরীরের সৌন্দর্য এক সময় শেষ হয়ে যায়। তাই আজকে যারা আপনাকে বলছে, তোকে তো দারুন লাগছে/ আপনার ফেসবুকের ছবিতে প্রশংসার পর প্রশংসা করে যাচ্ছে...... ।।আর এই সব দেখে আপনি খুশিতে ডগমগ করেন।।আজ থেকে ২০ বছর পরের কথা চিন্তা করেন...এই ছেলেরা তখন ৩৮/৪০ ।তখন আপনার প্রশংসা করবেনা। তারা কিন্তু ঠিকই ১৬-২৫ দেরকেই খুঁজবে।

কিন্তু আপারা, একটা কথা জানেন? মনের সৌন্দর্য শেষ হয় না। মন জরাগ্রস্ত হয়না। একটা সুন্দর মন, শালীন দেহ সর্ব কালে সর্ব যুগে প্রশংসিত। আজকের বোরকা পরা মেয়েকে দেখলে যেমন আপনার যারা প্রশংসা করে সেই ছেলেরাও মাথা নামিয়ে নেয়,আমার দাড়ি টুপি ওয়ালা ভাইরাও নামিয়ে নেয়। আজ থেকে ২০ বছর পর দেখলেও তারা দৃষ্টি নামিয়ে নিবে, ইনশা'আল্লাহ। আমার এই বোনেরা আজকেই সম্মানিত। কালকেও থাকবে ইনশাআল্লাহ্‌। আর আপনাদের কি হবে? আজকে আপনারা যাদের চোখ জুড়াচ্ছেন কাল তারা আপনার দিকে তাকাবেই না। আর সম্মান??? সেটা আজকেও কেউ আপনাদের করেনা, ভবিষ্যতে করবে কি আল্লাহ্‌ ভাল জানেন।

আপারা, চাকরানী চেনেন??? দাসী চেনেন??? আপনার হলেন পুরুষদের চাকরানী নয়তো মেকাপের দাসী। ঘন্টার পর ঘন্টা সময় নিয়ে এত সাজ গোজ যে করেন...পরে তো সেগুলো তত কষ্ট করেই ঘষে ঘষে তুলে ফেলতে হয়। কি লাভ এই কৃত্তিমতার?

এই যে একেকজন ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং , ভার্সিটিতে পড়ছেন অথচ নিরেট মূর্খের মত আচরণ কেন করছেন?

আপনার এত এত বিদ্যা আপনাকে কেন রঙ চঙ্গের আশ্রয় নেয়া থেকে বাঁচাতে পারেনা???

কেন অফিসে/অফিসিয়াল কনফারেন্স/কনভোকেশন/নবীন বরণ/ ফেয়ারওয়েলে যাবার আগে আপনার নিজের চেহারায় এত ঘষা মাজা করতে হয়? এসব যায়গার তো আপনি আপনার লেখাপড়ার কল্যানেই যাচ্ছেন তাই না? তাহলে কেন সব কিছু ছাপিয়ে আপনার সাজ গোজ সেখানে প্রাধান্য পাবে???

কি করলেন এত লেখাপড়া করে যা আপনার মানসিকতাকে বদলাতে পারেনি?

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়েও কেন আপনাকে ছোট ছোট কাপড়, কিছু রঙ চঙ্গের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। বলতে পারেন?

আপারা বলেন তো দেখি আপনার এক মাসের পার্লারের খরচ দিয়ে কয়জন ক্ষুধার্ত মানুষকে খাওয়ানো যায়? আচ্ছা ধরলাম চালের কেজি ৫০ টাকা। ২০০০ টাকা হলে এক মণ চাল হয়। একটা ছোট পরিবারের ১৫-২০ দিনের খাবার ব্যবস্থা হয়ে যায়। কোনদিন ৫০০ টাকা খরচ করে ১০ কেজি চাল কিনে কোন দরিদ্র মানুষকে দেয়ার কথা ভেবেছেন কখনো? অথচ আপনার পা ঘষে দিলেই আপনি ৫০০ টাকা পার্লারে দিয়ে আসেন। কি আশচর্য! আপনি যখন পা দলাই মলাই করে নিচ্ছে তখন কোথাও কোন সনাবরু না খেতে পেয়ে গলায় দড়ি দিচ্ছে।

আপনি যখন সেজে গুজে বন্ধু বান্ধবের সাথে নবীন বরণ বা ফেয়ারওয়েল এ নাচানাচি করছেন তখন আপনার বোন আফিয়া সিদ্দিকা/ফাতিমেকে প্রতি রাতে ১০ জন মার্কিন সৈন্য ধর্ষন করছে।RAPE. কখনো এদের জন্য আপনার চোখে পানি এসেছে? একবার চিন্তা করুন তো, আপনাকে বানরের মত খঁচায় রাখা হয়েছে যেখানে আপনি সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারেন না, আপনার গায়ে কাপড় পর্যন্ত রাখা হয় নি, আপনার সামনে আপনার দুই সন্তানকে জবাই করা হয়েছে,আপনার একটা একটা করে চুল টেনে টেনে উপড়ে ফেলা হয়েছে, আপনার পেটে গুলি করা হয়েছে, ইলেক্ট্রিক শক দেয়া হয়েছে, তার সাথে সাথে যখন তখন আপনাকে ধর্ষন করা হচ্ছে। কি ...বেশি বলে ফেললাম???

__________________________________________________________

[ফাতিমার চিঠি।][কপি পেষ্ট করলাম]

একটি হাতে লেখা দলিল সম্প্রতি ইরাকের আবু গারীব কারাগার থেকে উদ্ধার হয়। ফাতেমা ঐ এলাকার একজন খ্যাতিমান মুজাহিদের বোন। আমেরিকান সৈন্যরা কিছুদিন পূর্বে ঐ মুজাহিদের বাড়িতে হটাত হামলা চালায়। কিন্তু তাকে পায় না। তারা তার বোনকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যায় যেন ঐ মুজাহিদ নিজ থেকে ধরা দেয়।ফাতেমার মূল চিঠিটি এখানে দেয়া হল যা মাফকারাট আল ইসলামে(আরবী নিউজ এজন্সি) ইংরেজী অনুবাদসহ আরবীতে ছাপা হয়েছিল।


ফাতেমার চিঠি


"পরম করুনাময় আল্লাহতা'য়ালার নামে

(হে মুহাম্মদ) তুমি বলো, তিনিই আল্লাহ তিনি এক একক। তিনি কারোর মুখাপেক্ষী নন, তার থেকে কেউ জন্ম নেয়নি, আর তিনিও কারো থেকে জন্ম গ্রহন করেননি। আর তার সমতুল্য দ্বিতীয় কেউ নেয়।(সূরা আল-এখলাস)

আমি আল্লাহর গ্রন্থ আল-কোরআন থেকে হতে এই পবিত্র সূরাটি পছন্দ করেছি কারন এর দারুন প্রভাব পড়েছে আমার উপর এবং আপনাদের সবার উপরে ও বিশ্বাসীদের হদয়ের এক প্রকার ভয় ও শ্রদ্ধা মিশ্রিত বোধের জন্ম দেবে। আমার ভাই মুজাহীদিন আল্লাহর পথে আছে।আপনাদের আমি কি বলবো?

আমি আপনাদের বলছি : আমাদের গর্ভ বানর ও শূকুর জাতীয় লম্পটদের সন্তানে ভর্তি হয়ে আছে। যারা আমাদের ধর্ষণ করেছে। অথবা (আমি) আপনাদের বলতে পারি যে, তারা আমাদের দেহকে বিকৃত করেছে। আমাদের মুখমন্ডল জলসে দিয়েছে এবং আমাদের ঘাড়ে ঝোলানো কোরআনের ছোট কপিটি অযথা ছিড়ে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলেছে। আল্লাহু আকবার, আপনারা কি পরিস্থিতি অনুদাবন করতে পারছেন না? এটা সত্য আপনারা জানেন না আমাদের সাথে কি ঘটেছে। আমরা আপনাদের বোন। আল্লাহ হিসাব নিকাসের সময় ভবিষ্যতে এ সম্পর্কে আপনাদের জিজ্ঞাসা করবে। আল্লাহর কসম কারাগারে আসা পর্যন্ত আমাদের এমন কোন রাত কাটেনি যে রাতে বানর ও শুকুর জাতীয় অমানুষরা আমাদের উপর ঝাপিয়ে পড়েনি। তারা তাদের পূর্ণ স্বাদ মিটিয়ে নিস্তেজ হওয়া অবধি আমাদের দেহকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করতে থাকে। আমরাই তারা যারা আল্লাহর ভয়ে সব সময় সতীত্বকে কে রক্ষা করে এসেছি। আল্লাহকে ভয় করুন। আমাদের মেরে ফেলুন। আমাদের ধংস করে দিন। তাদের আনন্দ উপকরন হিসাবে আমাদের রেখে যাবেন না। এভাবে সর্বশক্তিমান আল্লাহর মহাকৃতিত্ব মর্যাদা সম্পন্ন করা হবে। আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন। তাদের কামান ও উড়োজাহাজ গুলো বাইরে রেখে আসুন। আবু গারীব কারাগারে আমাদের কাছে আসুন। আমি আপনাদের ধর্ম বোন। তারা আমায় একদিন নয়বারেরও বেশী ধর্ষন করেছে। আপনারা কি অনুধাবন করতে পারছেন? চিন্তা করুন আপনাদের এজন বোন ধর্ষিত হচ্ছে। আপনারা কেন ভাবতে পারছেন না আমি আপনাদের বোন? আমার সাথে আরো ১৩ জন মেয়ে আছে। সবাই অবিবাহিত। সবাই সবার সামনে প্রকাশ্য ধর্ষিত হচ্ছে। তারা আমাদের নামায পড়তে দেয় না। তারা আমাদের পোশাকগুলো নিয়ে নিয়েছে। আমাদের কাপড় পরতে দেয়না। আমাদের মধ্যে একজন মেয়ে আত্নহত্যার প্রতিজ্ঞা করেছে। তাই আমি এই চিঠিটি লিখছি। সে নৃশংসভাবে ধর্ষিত হয়েছে। একজন সৈনিক তাকে ধর্ষনের পর তার বুক ও উরুতে আঘাত করেছে। সে অবিশ্বাস্য অত্যাচারের দ্বারা তাকে ভোগ করেছে। মেয়েটি তার মাথা জেলের দেয়ালে সাথে আঘাত করতে লাগল যতক্ষন না তার মৃত্যু হয়, মেয়েটি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। যদিও ইসলামে আত্নহত্যা নিষিদ্ধ। কিন্তু আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আশা করছি আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। কারন তিনি(আল্লাহ) সবার প্রতি অসীম দয়ালু। ভাই আপনাদের আবারও বলছি আল্লাহকে ভয় করুন। আমাদের মেরে ফেলুন। তাহলেই আমরা হয়ত শান্তি পাব। সাহায্য করুন। সাহায্য করুন। সাহায্য করুন।
 

ড. আফিয়া সিদ্দিকা আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন স্নায়ু বিজ্ঞানী। অসামান্য ধীসম্পন্ন পি.এইচ.ডি ডিগ্রীধারী এ মহিলার সম্মানসূচক অন্যান্য ডিগ্রী ও সার্টিফিকেট রয়েছে প্রায় ১৪৪টি। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রন্ডেইস বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে Neurology বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করে। তিনি হাফিযে কুর'আন ও আলিমা। পবিত্র কুর'আন ও হাদীসে পারদর্শিনী এ মহিলা ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত দ্বীনদার ও পরহেযগার। ইসলামী আদর্শ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি রয়েছে তাঁর স্ট্রং কমিটমেন্ট। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফ.বি.আই পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় আল কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কথিত অভিযোগে ২০০৩ সালে ড. আফিয়াকে তাঁর তিন সন্তান আহমদ, সুলায়মান, ও মরিয়মসহ করাচীর রাস্তা থেকে অপহরণ করে। পাকিস্তানের কোন কারাগারে না রেখে এবং পাকিস্তানী আদালতে উপস্থাপন না করে পাঁচ বছর ধরে তাঁকে আফগানিস্তানের বাগরাম সামরিক ঘাঁটিতে বন্দী করে রাখা হয়। এরপর চলে তাঁর উপর অমানুষিক শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন। বাগরামে কুখ্যাত মার্কিন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা বলেছেন, 'নির্যাতনের সময় একজন নারী বন্দির আর্তচিৎকার অন্য বন্দিদের সহ্য করাও কষ্টকর ছিল.........।

দেখুন আফিয়ার ছবি। অত্যাচারের আগের ও পরের ছবি।



জি, আফিয়া ,ফাতিমাদের সাথে এরকমই করা হচ্ছে। যেখানে তারা নিজেদের আব্রু বাঁচাতে পারছেনা সেখানে আপনি নিজের আব্রু বিলিয়ে দিচ্ছেন?

বোন...লজ্জা কর, ভয় কর আল্লাহকে।



মূল লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/notes/collected-notes-and-discussion/%E0%A6%8F%E0%A6%87-%E0%A6%A8%E0%A7%8B%E0%A6%9F-%E0%A6%AA%E0%A7%9C%E0%A7%87-%E0%A6%96%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AA-%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%97%E0%A6%B2%E0%A7%87-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%86%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A6%AB%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A1-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8/298203060195615
বিস্তারিত পড়ুন ... »

নারী, পেশা এবং এ সময়ের ভাবনা

ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর কি কাজ করা উচিত না'কি উচিত না? এ'নিয়ে চিন্তাগবেষনার অন্ত নেই। যারা মনে করেন নারীর কাজ করা উচিত না তাদের বক্তব্য হোল এতে নারীর মাতৃত্বের দায়িত্ব বিঘ্নিত হয়। যারা মনে করেন নারীর কাজ করা উচিত তাদের বক্তব্য হোল নইলে মেয়েদের এত কষ্ট করে লেখাপড়া করার প্রয়োজন কি? উভয়েক্ষেত্রেই এমন একটি সরল দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে বিবেচনা করা হচ্ছে যা বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। কয়েকটি বাস্তব ঘটনা পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হবে কেন বিষয়টিকে এত সরলভাবে দেখা সম্ভব নয়। ৫ নং ঘটনা ব্যাতীত প্রতিটি ক্ষেত্রে গোপনীয়তার স্বার্থে ব্যাক্তির নাম পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছেঃ-

১. অধিকাংশেক্ষেত্রে সন্তান কিছু জিজ্ঞেস করলে মায়েদের বলতে শোনা যায়, "তোমার আব্বু এলে জিজ্ঞেস করে জানাব"। লেখাপড়ার চর্চা থেকে দূরে থাকতে থাকতে তারা একসময় অনেক সাধারন জ্ঞানের বিষয়াবলীও ভুলে যান। ফলে সন্তানের স্বাভাবিক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সন্তানের সামনে লজ্জায় পড়ে যান এবং সন্তানের শ্রদ্ধা হারান। তবে এই ভুলে যাওয়ার পরিধি যে কত ব্যাপক হতে পারে তা দেখে আমি এতটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলাম যে আমার প্রথম সন্তানের জন্মের দ্বিতীয় দিন থেকেই তাকে একহাতে খাওয়াতাম এবং আরেক হাতে বই নিয়ে পড়তাম। আমাদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার আগে লিখিত পরীক্ষা নেয়া হয়। একবার এক শ্রদ্ধেয়া ভাবী এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে এসে কাঁদতে কাঁদতে চলে যান। ভাবী বিদেশে বড় হয়েছেন, মাস্টার্স করেছেন, বিয়ে করে ছয় ছয়টি সন্তান বড় করেছেন। সবাই আমাকে দোষারোপ করতে শুরু করে, আমি হয়ত প্রশ্নপত্র অতিরিক্ত কঠিন করেছি! খাতা চেক করতে গিয়ে দেখি খাতা সম্পূর্ণ খালি, পরীক্ষার্থীর নামের বানানটিও ভুল। পরে ভাবী ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে জানালেন তিনি বিয়ের পর থেকে আর কলম হাতে নেননি; প্রথমত তিনি কলম ধরতে ভুলে গিয়েছেন এবং দ্বিতীয়ত তিনি তাঁর নামের বানান পর্যন্ত লিখতে ভুলে গেছেন! উল্লেখ্য, তাঁর স্বামী একজন প্রফেসর। কিন্তু তিনি স্ত্রীকে জ্ঞানার্জন দূরে থাক, জ্ঞানের চর্চার জন্য পর্যন্ত কোনপ্রকার সহযোগিতা করেননি। ছয়টি সন্তান এবং সংসারের পরিপূর্ণ দায়িত্ব স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়ে তিনি নিজের জ্ঞানচর্চার জন্য সময় করে নিয়েছেন। দু'জনের জ্ঞানের পার্থক্য যত বেড়েছে, তাঁর স্ত্রীর প্রতি সম্মান তত কমেছে। একসময় তিনি স্ত্রীর প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েছেন এবং একপর্যায়ে তিনি শুধু ঘুমানো ছাড়া বাসায় সময় দেয়াই বন্ধ করে দেন।

২. রাহির বিয়ে হয় এক বিরাট যৌথ পরিবারে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী
পরিবারের বড় ছেলে। ঘরে বাবামা, বিবাহযোগ্যা বোন, বিভিন্ন স্তরে লেখাপড়া করা অনেকগুলো ভাইবোন এবং এই পরিবারের ওপর নির্ভরশীল ব্যাক্তিবর্গ। রাহির সামনে দু'টি পথ- স্বামীকে আরো বেশী উপার্জন করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা অথবা সবার চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটানো। রাহি তৃতীয় একটি পথ বেছে নিলো। সে একটি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনে কাজ নিলো। ফলে স্বামী তার সম্পূর্ণ উপার্জন পরিবারের জন্য ব্যায় করতে সম হলেন এবং রাহির টাকায় নিজেদের চলে যা উদ্বৃত্ত থাকে তাও পরিবারের পেছনে খরচ করা সম্ভব হোল। স্বামীর সমস্যা বুঝে চলা এবং অহেতুক চাপ সৃষ্টি না করার কারণে দু'জনের বন্ধুত্ব মজবুত হোল এবং সংসারের দায়িত্ব দু'জনে ভাগ করে নেয়ায় কেউ অতিরিক্ত চাপ বা বিরক্তির সম্মুখীন হোলনা।

৩. দু'টি বাচ্চা শামার হাতে দিয়ে ওর স্বামী ক্যান্সারের কাছে পরাজিত হলেন। শোকে কাতর শামা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর শ্বশুরবাড়ীর আত্মীয়স্বজন স্বামীর সমস্ত সম্পদ হস্তগত করে তাকে কেবল দয়া করে একটি রুম দিল থাকার জন্য। গ্রামের পুকুরপাড় থেকে কচুঘেচু তুলে পেট তো চলছিল কোনক্রমে কিন্তু বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাবার সংস্থান নেই, বইখাতা কাপড় কিনে দেবার পয়সা নেই, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার মত কোন আত্মীয়স্বজন নেই, চাকরী ছেড়ে দিয়েছে বহুদিন তাই চাকরীর জন্য যোগাযোগ করবে এমন পরিচিত কেউ নেই। বাড়ীর কাছের এক ভদ্রলোকের দয়া হোল। তিনি শিক্ষিতা মেয়েটিকে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দিলেন। আজ শামা বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছে, ছোট মেয়েকে ভালো স্কুলে পড়াচ্ছে এবং শ্বশুরবাড়ীর লোকজনকেও সাহায্য সহযোগিতা করছে সেই চাকরীর বদৌলতে।

৪. কামিনীর বিয়ের পর ওর স্বামী ওর গহনাপাতি নিয়ে নেয় ওর নামে বাড়ী করার জন্য। স্বামীর পরিবারে অর্থ জোগান দেয়ার জন্য ওকে চাকরীতে ঢুকতে হয়। নতুন পরিবারে সবার জন্য কিছু করার এই সুযোগ পেয়ে খুব খুশী কামিনী। পরে সন্তানাদি হয়ে গেলে কামিনী চাকরী ছেড়ে দেয়, স্বামীও ততদিনে ভালো চাকরী পেয়েছে। একসময় সে জানতে পারে বাড়ী করা হয়েছে স্বামীর নামে। আস্তে আস্তে দেখা যায় স্বামী সব সিদ্ধান্তই ওর ওপর চাপিয়ে দিতে শুরু করেন, আলোচনার কোন সুযোগ নেই। স্বামীর কাছে মূল্য নেই বলে সন্তানদের কাছেও সে মূল্যহীন। এখন কামিনীর মা অসুস্থ, সে মায়ের চিকিৎসার জন্য স্বামীর কাছে কিছু টাকা চায়। স্বামী সাফ বলে দেন শ্বাশুড়ী বিনা চিকিৎসায় মরে গেলেও তিনি তার জন্য কোন টাকা দিতে পারবেন না, তাঁর কষ্টের টাকা তিনি কি পানিতে ফেলবেন? কান্না ছাড়া কামিনীর অসুস্থ মাকে দেয়ার আর কিছুই নেই। উল্লেখ্য, কামিনীর স্বামী একজন ইঞ্জিনিয়ার।

৫. একসময় বাংলাদেশের ঘরে ঘরে গৃহিনীরা হাঁসমুরগী, গরুছাগল, পায়রা পালতেন- এতে ডিমদুধের চিন্তা থাকতনা, উপরন্তু প্রয়োজনমত মাংসের জোগানও হত। একতু খোলা জায়গা পেলেই লাগানো হত শাকসব্জী, ফলমূল; অন্তত ফুলপাতালতা। আমি ঢাকার ধানমন্ডির মত অভিজাত এলাকাতেও এই প্রচলন দেখেছি ছোটবেলায়। মহিলারা পাটি বুনতেন, মোড়া বানাতেন, সেলাইফোঁড়াই করতেন সব বাসায় বসে বাচ্চাদের পড়াতে পড়াতে। আজকাল ঐ সময়টুকু গিন্নীরা আরাম করেন সিরিয়াল দেখে দেখে এবং ব্লাডপ্রেশার আর ডায়াবেটিসের বড়ি গিলে গিলে। মিসেস আনিস আন্টি ছিলেন ব্যাতিক্রম। তিনি এই সময় ব্যায় করতেন পোশাক ডিজাইন করে, বুটিক চালাতেন, অ্যাকুয়ারিয়াম ফিশ চাষ করতেন, এক্সটিক পাখী চাষ করতেন- গরীব দুঃস্থদের জন্য কয়েকটি স্কুল চলত এই পয়সায়। এই বিশাল ব্যাবসা চালানোর জন্য তিনি নিয়োগ দিয়েছিলেন অনেক মানুষজন, অনেক ভাগ্যাহত নারীর অন্নসংস্থান হত তাঁর প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করে, আমার পরিচিত লোকজনকে তিনি কাজ দিয়েছেন তাদের বিপদের সময়। সন্তানদের দেখাশোনার সুবিধার জন্যই তিনি বাইরে কাজ না করে বাসায় কিছু করেছেন। তাঁর নিজের মত করে সমাজের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন।

৬. লাকীর স্বামী ওকে বাংলাদেশে রেখে অ্যামেরিকায় গেলেন স্বপ্নের সন্ধানে। তিনটি সন্তানের দেখাশোনা নিয়েই ব্যাস্ত লাকী স্বপ্ন বোনে আজই হয়ত স্বামী তাকে নিজের কাছে ডেকে পাঠাবেন। তিনবছর পেরিয়ে যায়। স্বামী ব্যাস্ততার মাঝে ফোন করারও সময় পাননা, লাকী ফোন করলে তড়িঘড়ি রেখে দেন। স্বামী আগের মত নিয়মিত টাকা পাঠান না, যে টাকাপয়সা বিপদআপদের জন্য দিয়ে গেছিলেন তাও প্রায় শেষ। বিরহে চিন্তায় পাগলের মত হয়ে যায় সে। স্বামী অসুস্থ নয়ত? তার কোন বিপদ হয়নি তো? চতুর্থ বছরে এক অ্যামেরিকাপ্রবাসী ভাই ছুটিতে এসেছে খবর পেয়ে তাঁর কাছে ছুটে যায় স্বামীর খবর জানার জন্য। ভদ্রলোক প্রথমে কিছুতেই বলবেন না পরে বললেন, "স্বামীকে এত বিশ্বাস করা ঠিক নয়"। "স্বামীকে বিশ্বাস করবনা তো কি আপনাকে বিশ্বাস করব?" রেগে গিয়ে বাসায় চলে যায় লাকী। পরে মাথা ঠান্ডা হলে আরেক বিদেশফেরত ভাইকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে এক শ্বেতাঙ্গিনীকে বিয়ে করে দেদারসে সংসার করছেন স্বামী গত তিনবছর ধরে! লেখাপড়া করেনি বেশি, বাবামা বেঁচে নেই, কোন ভাই নেই। কি করবে, কোথায় যাবে লাকী?

৭. সিমি তার দুই ছেলেকে মানুষ করার জন্য কোনদিন চাকরী করেনি, বন্ধুবান্ধবের সাথে যোগাযোগ রাখেনি, পৃথিবীর সব কিছু ভুলে স্বামী সংসার আর সন্তান নিয়েই সে মেতে ছিল। প্রজাপতির রঙ্গিন পাখায় ভর করে কবে যে কেটে গেল এতগুলো বছর, সে টেরই পায়নি। বছর দুই হোল ছেলে দু'টোরই বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেবৌরা ওর সাথেই থাকে। কিন্তু ছেলেরা এখন আর কাজ থেকে ফিরে সারাণ ওর গলা জড়িয়ে ধরে বসে থাকেনা, কিছু সময় মায়ের সাথে কাটিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে বৌদের সাথে সংসারের হিসেবনিকেশ করে, বাবামা'র খবর নেয়। স্বামী থাকেন পড়াশোনা আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা নিয়ে, রিটায়ার করে আর কিইবা করার আছে সময় কাটানোর জন্য? সিমির কেমন যেন একা একা লাগে। বৌগুলো খুব লক্ষ্মী। ঘরের কোনকিছুতে হাত দিতে হয়না ওকে, দু'জনে মিলে গল্প করতে করতে টুকটুক করে সব করে ফেলে দুই বৌ। তবুও ওরা ওর কাছ থেকে ওর ছেলেদের কেড়ে নিয়েছে ভেবে ওর ওদেরকে সহ্য হয়না। সিমি পড়াশোনা ভুলে গেছে সেই ত্রিশ বছর আগে, বন্ধুদেরও ছেড়ে দিয়েছে তখনই। কি করে কাটবে ওর অফুরন্ত সময়?

৮. মনোয়ারা বেগমের বয়স হয়েছে ৫৫। শরীরে এমন এক অসুখ বাসা বেঁধেছে যার চিকিৎসা আর ঘরোয়া পদ্ধতিতে সম্ভব হচ্ছেনা। শহরে নিয়ে যাবার সামর্থ্য নেই তার দিনমজুর ছেলের। সে মাকে সাধ্যসাধনা করে গ্রামের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। কিন্তু ডাক্তারসাহেব তাকে পরীক্ষা করার জন্য বোরকা খুলতে বললে তিনি রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে বাড়ী ফিরে এলেন। একবছর ভুগে, পরে শয্যাশায়ী হয় বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন মনোয়ারা বেগম। এই মৃত্যুটি কিন্তু সহজেই এড়ানো যেত। গ্রামে যদি একজন নারী ডাক্তার থাকতেন হয়ত মনোয়ারা সুচিকিৎসা পেতেন।

৯. লামিয়া মাত্র বয়োঃপ্রাপ্র হয়েছে। ওর জন্য কিছু ব্যক্তিগত সামগ্রী কেনার জন্য ওর মা বাজারে গিয়ে ঘুরে ঘুরে হয়রান। সব দোকানে পুরুষ সেলসম্যান। কয়েকবার সাহস করে কাছাকাছি গেলেও লজ্জায় বলতে পারলেন না তাঁর কি প্রয়োজন। কেন যে মেয়েদের জন্য মহিলা সেলসম্যান দিয়ে দোকান করা হয়না! বিদেশে কি সুন্দর একেকটি পরিবারের সকল সদস্য মিলে দোকান চালায়। বাবা দোকানে বসলে মা গিয়ে রান্না সেরে আসেন, বড় ছেলে স্কুল থেকে ফিরে দোকানে বসলে বাবা শুতে যান, বাচ্চারা কাউন্টারে বসে হোমওয়ার্ক করে। আর একটি মুসলিম দেশে মহিলাদের পুরুষ সেলসম্যানের কাছে নারীদের জিনিস চাইতে গিয়ে বিব্রত হতে হয়!

১০. আমার ছোটবেলায় পাশের বাসায় এক দাদু থাকতেন। ওনার ফ্রিজে সবসময় আমার জন্য ফিরনী করা থাকত। বাসায় হরেক রকম বয়মে থাকত তেঁতুল, গুড়, মুড়ি, নারকেলের বরফি আরো নানারকম লোভনীয় খাবার। উনি আমাকে খাওয়াতেন আর ফাঁকে ফাঁকে নানারকম সুরা, দুয়া, নামাজ শেখাতেন। খাবার লোভে গিয়ে কতকিছু শিখে আসতাম তার ইয়ত্তা নেই। যেবার আমি প্রথম রোজা রাখি দাদু প্রায় পনেরো বিশরকম আইটেম করে ইফতার খাইয়েছিলেন। এত আদর করতেন বলে তাঁকে আমি মিষ্টিদাদু ডাকতাম। তবে উনি যে আমার কি উপকার করেছেন তা আমি বুঝতে পারি বড় হয়ে। তিনি শুধু আমাকেই নয়, পাড়ার অনেক শিশু এবং তাঁর বাসায় কাজের লোকদের নামাজদুয়া শেখাতেন। এভাবে নিজের পয়সা এবং সময় নষ্ট করে অন্যের সন্তানকে মানুষ করার মত সোনার মানুষগুলো হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজ থেকে।

ওপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা একপ্রকার নিশ্চিত হতে পারি যে মানুষের জীবনকে কোন নির্ধারিত ফর্মুলায় ফেলা যায়না। সুতরাং, সবার জন্য একই সমাধান কার্যকর হতে পারেনা। তবে ইসলামে কয়েকটি ফর্মুলা নারীপুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য অবশ্যপালনীয় করে দেয়া হয়েছেঃ

১. আল্লাহ মানবজাতির জন্য রাসূল (সাঃ) এর মাধ্যমে প্রথম যে নির্দেশ প্রেরণ করেছেন তা হলো "পড়"। এর সাথে এ'রকম বাক্যাংশ সংযোজিত হয়নি "এই নির্দেশ কেবলমাত্র পুরুষদের জন্য, নারী এই নির্দেশের আওতাবহির্ভূত" অথবা "পড় এবং অতঃপর ভুলে যাও"। কেবলমাত্র এ'কারণেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে একজন ব্যাক্তির আজীবন সাধনা হতে হবে জ্ঞান অর্জন করা এবং চর্চার মাধ্যমে তাকে সতেজ রাখা। জ্ঞানার্জনকে জীবনের ল্য স্থির করার পেছনে কোন অর্থনৈতিক বা পার্থিব স্বার্থকে উহ্য করা হয়নি। নারী পুরুষ উভয়কেই জ্ঞানার্জন করতে হবে নিজের স্বার্থে এবং সমাজের স্বার্থে- কেননা একজন আলোকিত মানুষ সমাজকে উপহার দেবে প্রথমত একজন আলোকিত নাগরিক যে হবে সমাজের জন্য কল্যাণকর, এবং দ্বিতীয়ত পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি আলোকবর্তিকা যা তাদের পথ দেখাতে সহায়তা করবে। জ্ঞানার্জনের জন্য এর চেয়ে বেশী আর কোন কারণ বা প্রেষণার প্রয়োজন নেই। এর বাইরে যা পাওয়া যায় সব বোনাস।

২. জ্ঞানপ্রাপ্ত হবার সাথে সাথে জ্ঞানী ব্যাক্তির দায়িত্ব হয়ে পড়ে এই জ্ঞান চতুষ্পার্শে ছড়িয়ে দেয়া যার জন্য বলা হয়েছে যে ব্যাক্তি একঘন্টা জ্ঞানসংগ্রহ করে এবং অতঃপর একঘন্টা জ্ঞানবিতরণ করে তার ঘুম মূর্খ ব্যাক্তির রাতব্যাপী নামাজের সমান। এই দায়িত্বের ক্ষেত্রেও পুরুষ এবং নারীর বিভাজন করা হয়নি। অতঃপর পুরুষের ওপর তার জ্ঞান ব্যাবহার করে অন্নসংস্থান করার দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে, নারীর ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অধিকার এবং পেশা গ্রহন করার ব্যাপারে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে কিন্তু তার অর্জিত অর্থ কারো জন্য ব্যায় করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। কিন্তু তাই বলে এ'কথাও কোথাও বলা হয়নি যে নারী কোন কাজ করতে পারবেনা বরং এক মহিলা সাহাবী যখন রাসুল(সাঃ)কে জানান যে তাঁর স্বামী পঙ্গু এবং তিনি কাজ করে স্বামীসন্তানের ব্যয়নির্বাহ করেন তখন রাসুল(সাঃ) তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে এর জন্য তিনি আল্লাহর কাছে উত্তম পুরস্কারের হকদার হবেন। রাসুল (সাঃ)এর স্ত্রী খাদিজা (রাঃ) ব্যাবসায়ী ছিলেন, আয়শা (রাঃ) কুর'আন এবং হাদীসের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষিকা ছিলেন, আয়শা (রাঃ)র বোন আসমা (রাঃ) স্বামীর তেখামার দেখাশোনা করতেন, রাসুল(সাঃ)এর আরেক স্ত্রী হাতের কাজ করে বিক্রি করতেন অতঃপর সম্পূর্ণ উপার্জন সদকা করে দিতেন, খাওলা (রাঃ) ছিলেন কবি, যুদ্ধেক্ষেত্রেও নারীরা পিছিয়ে ছিলেন না। রাসূল(সাঃ) এঁদের কি পরিমাণ সম্মান করতেন তা উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন, আসমা (রাঃ) কেমন মা ছিলেন এবং তিনি কেমন সন্তান গড়ে তুলেছিলেন তার জন্যও ইতিহাসের স্যাই যথেষ্ট। উল্লেখ্য এই কাজগুলোর পেছনে অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য মূখ্য ছিলোনা বরং সমাজের জন্য কিছু করার, পরিবারের সহযোগিতার, সৃষ্টিশীলতার উদ্দেশ্যই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

৩. কাজ করা বলতে শুধু চাকরী করা বোঝায় এবং জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য কেবল একে ব্যবহার করে ফায়দা হাসিল করা এটি অত্যন্ত সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী। একজন ব্যাক্তির বেড়ে ওঠা এবং একজন ব্যাক্তিমানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পেছনে অসংখ্য মানুষের প্রত্য এবং পরো অবদান থাকে। নিজের স্বার্থ লাভ হয়ে যাবার সাথে সাথে শুধুমাত্র একজন সঙ্গী এবং নিজের ক'টি সন্তান ছাড়া পৃথিবীর আর সবার অধিকার ভুলে যাওয়াটা ইসলাম কেন মানবতার সংজ্ঞায়ও সঠিক হতে পারে, এটা মেনে নেয়া কষ্টকর। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণে নয়, নৈতিক কারণেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে সবার কিছু করা উচিত তার নির্ধারিত কাজের বাইরে। তবে অর্থনৈতিক বিষয়টিও একেবারে ফেলনা নয়। ইসলামে নারীকে ধনসম্পদে যে অধিকার দেয়া হয়েছে তা কেবল ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার জন্যই নয় বরং দায়িত্বশীলতা শিক্ষা দেয়ার জন্যও বটে। পাশাপাশি টাকাপয়সা ছাড়া অনেক নধংরপ ইবাদাত করা সম্ভব নয় যেমন সদকা, যাকাত এবং হাজ্জ্ব। তাছাড়া সামাজিক ক্ষেত্রে মেলামেশার কারণে মানুষের সামাজিক প্রতিভা, মনের বিস্তৃতি এবং পরিচিতের পরিধি বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে নারীর সহযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় ত্রেগুলোতে মেধাবী এবং দায়িত্বশীলা নারীদের এগিয়ে আসা উচিত। মনে রাখা উচিত, বাবামায়ের প্রতি দায়িত্বও আল্লাহ কেবল পুরুষের জন্য নির্ধারণ করে দেননি এবং এই ব্যাক্তিগত দায়িত্বগুলোর জন্য নারীর স্বামী তাকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিতে বাধ্য নন।

সুতরাং, এই ব্যাপারে আমরা একমত হতে পারি যে নারীপুরুষ নির্বিশেষে সবার একটি মূখ্য ক্যারিয়ার থাকতে হবে- জ্ঞানার্জন এবং জ্ঞান বিতরণের ক্যারিয়ার। দ্বিতীয়ত, জীবনধারণের জন্য কাজ করতে হবে বটে তবে ক্যারিয়ার যেন ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ না করে বরং ক্যারিয়ার যেন ব্যাক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কেননা, নারী বলুন আর পুরুষ বলুন, কোন মানুষই টাকা কামানোর বা ঘর সংসার সামলানোর মেশিনে রূপান্তরিত হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে বিশ্রামের, আনন্দের, নিজের জন্য সময় ব্যয় করার। তৃতীয়ত, প্রত্যকেটি মানুষের চিন্তা করতে হবে আমাকে আল্লাহ কোন নিয়ামতটি দিয়েছেন যা দিয়ে আমি মানুষের সেবা করতে পারি?

এবার ক্যারিয়ারের বিষয়টিকে নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করি। নারীর কাছে পারিবারিক জীবনে সফল হওয়া পূর্ণতার অনুভূতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। এর একটি বিরাট অংশ মাতৃত্ব। তবে এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে মাতৃত্ব একটি সাময়িক দায়িত্ব এবং সন্তান বড় হয়ে গেলে মায়ের দায়িত্ব কমে যায় এবং সে বাইরে সময় দিতে পারে। মাতৃত্বের দায়িত্ব একটি ষরভবষড়হম দায়িত্ব যার শেষ কেবল কবরে গিয়ে। এর একেক পর্যায়ে একেকভাবে সময়, শ্রম এবং মেধা ব্যায় করার প্রয়োজন হয়, কিন্তু এই দায়িত্ব আমৃত্যু শেষ হয়না। সুতরাং, এর জন্য আর সব দায়িত্ব ঠেকিয়ে রাখা বা একে ব্যক্তির ব্যাক্তিগত বিকাশের প্রতিবন্ধকতা মনে করা সঠিক হতে পারেনা। ইসলামে পরিবারের ওপর এতটা গুরুত্ব দেয়ার মূল কারণই এটা যেন পুরুষ ও নারী সন্তান এবং সংসারের দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নিতে পারে, নারী যেন বিবাহিত থেকেও single mother রূপান্ত্রিত না হয়। দ্বিতীয়ত, সময়ের সুষ্ঠু ব্যাবহার এবং কো-অর্ডিনেশনের মাধ্যমে মানুষ অল্প সময়ে অনেক কাজ করতে পারে। আর যদি অতিরিক্ত পরিশ্রমের কথা বলা হয় তাহলে Robert Robert Browning এর মত আমাকেও বলতে হয়ঃ
'Ah, but a man's reach should exceed his grasp
Or what's a heaven for?' (Andrea de Sarto)

জীবনটা পরীক্ষা ক্ষেত্র এবং এই পরীক্ষার সময় নির্ধারিত, তবে সনাতন পরীক্ষার মত এক্ষেত্রে আমরা জানিনা এই নির্ধারিত সময় কার জন্য কতটুকু। সেক্ষেত্রে কোন কাজটি যুক্তিযুক্ত? দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করা নাকি বি সি এসের মত যে ক'টি সম্ভব প্রশ্ন একটির পর একটি উত্তর দিতে থাকা? কোন পদ্ধতিতে পাশের সম্ভাবনা বাড়ে?

সুতরাং, সন্তান লালন পালনের জন্য গৃহিনী হলেই ভালো মা হতে পারবেন আর কাজ করলে ভালো মা হওয়া যাবেনা এটা কোন যুক্তি হতে পারেনা। একজন গৃহিনী কি সারাণ সন্তান নিয়ে বসে থাকেন? প্রথমত, যদি থাকেন তাহলে এটা সুস্থতার লণ নয়। একটি শিশুর সুষ্ঠুভাবে বেড়ে ওঠার জন্য কিছু পরিমাণ স্বাধীনতার প্রয়োজন যখন সে দুষ্টুমী করবে, গায়ে কাদা মাখাবে, গাছে চড়বে এবং মা দেখবেন না। দ্বিতীয়ত, একজন মানুষের নিজের এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশে বসবাসকারী মানুষজনের প্রতি কিছু দায়িত্ব আছে। পরিপার্শ্ব হতে বিচ্ছিন্ন একজন মানুষ একসময় তার আশেপাশের মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ সম্পর্কে অসচেতন হয়ে পড়েন এবং তখনই সমাজ বঞ্চিত হয়। কিভাবে তা একটু পরেই আলোচনা করছি।

একসময় মানুষের পনেরো বিশটা করে বাচ্চা হত। তাঁদের জিজ্ঞেস করলে তাঁরা মনেই করতে পারতেন না কি করে বড় হোল এতগুলো ছেলেপুলে। এর একটা কারণ হোল তখন মানুষ অনেক নিঃস্বার্থ ছিল। কার বাচ্চা কে খাওয়ায়, কে গোসল করায়, কে শাসন করে এসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাপার নিয়ে তখন কেউ তেমন মাথা ঘামাত না। মায়েরা সন্তানদের যে সময় দিতেন তা quantity নয় quality দিক থেকে সর্বোচ্চ মানের ছিল। যেটুকু সময় তারা সন্তানদের কাছে পেতেন সে সময়টুকু তারা সন্তানদের নীতিনৈতিকতা এবং পড়াশোনা শিক্ষা দেয়ার জন্য কাজে লাগাতেন। পরম ঔদার্য্যে লালিত পালিত এইসব মানুষগুলো প্রত্যকেই সোনার মানুষ হতেন যারা দেশ এবং দশের জন্য করতেন, যাদের কথা আমরা আজও গল্পেপ্রবন্ধে পড়ে উজ্জীবিত হই।

এখন একজন মা তার সন্তানের জুতোর ফিতা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চান, ফলে ন্যূনতম স্বাধীনতাবঞ্চিত একটি শিশু ছোটবেলা থেকেই কষ্ট আর লাঞ্ছনা নিয়ে বেড়ে ওঠে। অধিকাংশ শিশু বাবাকে মনে করে একজন ** যাকে মাঝেমাঝে দেখা যায় এবং যার কাছ থেকে টাকা পাওয়া যায়। তাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয় টেলিভিশন যাকে ছাড়া তারা খেতে পারেনা, ভাবতে পারেনা, চিন্তাশীলতার বিকাশ ঘটাতে পারেনা। এই মায়ের নিজের শিশুটি ছাড়া আর কারো জন্য কিছু ভাবার বা করার নেই। তাই তিনি তাকে বাংলা সিনেমার নায়কের মত নাচেগানে সুপারদর্শী, তর্কালংকার, মহানহৃদয়, মারদাঙ্গা, ব্ল্যাকবেল্টধারী ডাক্তার বানাতে চান। ফলে আমাদের সমাজ আজ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, ব্যাঙ্কার, বিজনেসম্যানের ভারে ন্যুব্জ, কিন্তু এর মাঝে 'মানুষ' খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অন্যদিকে আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের সন্তানদের জন্য যতটুকু করতে পারতাম, যা দেখে আমার সন্তান উদার হতে শিখত, তা না করে জন্ম দিচ্ছি ঈভটিজার, গুন্ডা এবং চোরডাকাতশ্রেণীকে। একদিকে আমার ছেলের জন্য ভিডিও গেম কেনা হচ্ছে হাজার হাজার টাকা খরচ করে, অন্যদিকে প্রতিবেশী বস্তির মেয়েটি না খেতে পেয়ে আত্মহত্যা করছে।

সুতরাং, মায়েদের আগে মানুষ হবার চিন্তা করা উচিত যারা শুধু নিজের সন্তানের জন্য নয়, সবার জন্য করার মানসিকতা রাখবেন। বাবাদের চিন্তা করা উচিত স্ত্রী কেবল সংসার সামলানোর মেশিন নন এবং সন্তানগুলো তিনি একা জন্ম দেননি। সুতরাং বাবাও মাঝে মাঝে রান্না করবেন, ঘরের কাজে হাত লাগাবেন, সন্তানদের নিয়ে খেলবেন, স্ত্রীর সাথে গল্প করবেন, বাচ্চাদের বাইরে নিয়ে গিয়ে স্ত্রীকে পড়াশোনা করার সময় দেবেন। এই সন্তান বাবামা'র বন্ধুত্ব দেখে আত্মবিশ্বাস এবং নিরাপত্তার অনুভূতি নিয়ে বড় হবে এবং বাবামায়ের পারস্পরিক সম্মানবোধ তাকে উভয়কে যথাযথভাবে শ্রদ্ধা করতে শেখাবে। উভয়ে কাজ করবেন সন্তানের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তোলার জন্য, একটি সুন্দর সমাজ তাকে উপহার দেবার জন্য- যেখানে টাকাপয়সা ও ধনসম্পদ গৌণ এবং জ্ঞান, দায়িত্বশীলতা এবং সৌহার্দ্য মূখ্য।

পরিশেষে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ দিয়ে ইতি টানছি। আমি বিয়ের আগে একটা স্কুলে চাকরী করতাম, বিয়ের পর মাস্টার্সের রেজাল্ট বের হলে ইউনিভার্সিটিতে চাকরী পাই। আমার প্রথম সন্তান হলে আমি চিন্তা করি চাকরীতে একবছর গ্যাপ দেব, বাচ্চা বড় হলে আবার কাজে ফিরে যাব। হাফিজ সাহেব আমাকে বলেন, "তুমি যদি চাকরী ছেড়েও দাও আমার আপত্তি নেই। কিন্তু ভেবে দেখ, কর্মেক্ষেত্র তোমার উপস্থিতিই কিন্তু একটা আদর্শের প্রতীক। তোমার শূণ্যস্থান হয়ত খালি থাকবেনা। ঐ জায়গায় আরেকজন আসবে। তবে সেই ব্যাক্তি হয়ত একে নিছক পেশা হিসেবেই নেবে।তুমি যে ল্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে পড়াও, অন্যের সন্তানকে নিজের সন্তানের মত মানুষ করতে চাও, সেটা হয়ত সে অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা মনে করবে। তার চেয়ে বরং আমরা এটা করতে পারি- তুমি কাজের পরিমাণ কমিয়ে নাও, কাজের জায়গায় আমরা একটা রুমের ব্যাবস্থা করি, বাচ্চা আমাদের সাথে প্রতিদিন যাবে, একটা উদার এবং শিক্ষিত পরিবেশে সমাজের নামীদামী মানুষের সাহচর্যে বড় হবে। তোমার কাস থাকলে আমি বাচ্চাকে দেখব, বাকী সময় তুমি ওর সাথে কাটাতে পারবে"।

বাচ্চা হাঁটতে শিখলে পরে এই কেন্দ্রিক একজন মহিলার কর্মসংস্থান হয় যে আমি কাসে থাকাকালীন বাচ্চার সাথে থেকে ওকে পাহাড়া দেবে, ওর খাবার আর গোসলের পানি গরম করে দেবে, ওর কাঁথাকাপড় ধুয়ে দেবে। বাচ্চা বড় হয়ে গেলে আমি আবার আমার স্বাভাবিক কাসলোড নিতে শুরু করি। এভাবেই বড় হয়েছে আমার দু'টি সন্তান। ঘরের সমস্ত কাজ হাফিজ সাহেব আর আমি ভাগ করে করি যাতে কেউ অতিরিক্ত কান্তি বা চাপ অনুভব না করি। উল্লেখ্য, আমি সবসময় যৌথ পরিবারে ছিলাম। কিন্তু আমার সন্তান আমার দায়িত্ব, তাকে আমি কোনদিন কারো ওপর বোঝার মত চাপিয়ে দেয়া সমীচিন মনে করিনি। দু'জনে মিলে বাচ্চাদের দেখাশোনার দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেয়ায় আমাদের বাচ্চাদের কখনো কোন অসুবিধা হয়নি কেননা বাচ্চারা দায়িত্ব, বাচ্চার অসুখ সব দু'জনে মিলেই সামাল দেয়া গেছে। আমাদের কারো কর্মেক্ষেত্রেও কোন প্রমোশন দেরী হয়নি, কোথাও কোন সমস্যা হয়নি। প্রয়োজন ছিল শুধু দু'জনের কো-অর্ডিনেশন। একপর্যায়ে আমি প্রফেসর হবার পাশাপাশি ক্যাম্পাসের কোঅর্ডিনেটর ছিলাম, দায়িত্ব ছিল অনেক বেশী- কিন্তু স্বামী, সন্তান, তাঁর পরিবার এবং আমার পরিবারের সবার প্রতি দায়িত্ব জোগান দিয়েও বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ রা করতে কোন অসুবিধা হয়নি। আমাকে যারা চেনেন তারাই বলবেন আমার দু'টি বাচ্চা মানুষ হয়েছে কি হয়নি। তবে আমি আজ আনন্দিতচিত্তে বলতে পারি আমার হাজার হাজার সন্তান মানুষ হয়েছে!

এবার আপনারাই সিদ্ধান্ত নিন নারীর কাজ করা উচিত কি উচিত নয়।


মূল লিঙ্কঃ http://www.sonarbangladesh.com/article.php?ID=7055
বিস্তারিত পড়ুন ... »

৬ নভে, ২০১১

জাগোর ইতিহাস, একটি ব্লগ এবং তার জবাব

This is a reply to this blog post: http://www.somewhereinblog.net/blog/engla/29477684 

গত ৩রা নভেম্বর বিশ্ব শিশু দিবস বা Universal Children's Day উপলক্ষে জাগো ফাউন্ডেশন এর পক্ষ থেকে একটি ইভেন্টের আয়োজন করা হয়। শুধু এবারই নয়, গত তিন বছর ধরেই এটা তারা এটা আয়োজন করে আসছে। সামনে কিছু বলার আগে জাগো সম্পর্কে একটু ধারনা দিয়ে দেই। সংক্ষেপে বলা যায় জাগো হচ্ছে পথশিশু/সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটা ফ্রী স্কুল যেখানে শুধু ফ্রী শিক্ষা দানই করা হয়না, তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ছাড়াও ফ্রি চিকিৎসা, নিয়মিত খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চার ব্যবস্থা, ইউনিফর্ম, ইউনিফর্ম পরিস্কার রাখার জন্য সাবান, সুস্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টিকর খাবার, পেস্ট, ব্রাশ ইত্যাদির ব্যবস্থাও করা হয়। এমনকি জাগোর শিক্ষার্থীদের মা-বাবাদের জন্য কাজের সুযোগও তৈরি করে দেয়া হয়। সে ব্যাপারে বিস্তারিত একটু পরে জানাচ্ছি। তবে তার আগে আবার সেই ইভেন্টের কথায় আসা যাক, এদিন তিন হাজারেরও বেশি সুবিধাবঞ্চিত শিশু যারা পথে পত্রিকা, ফুল ইত্যাদি বিক্রি করে তাদের ওয়ান্ডারল্যান্ড নিয়ে যাওয়া হয়। ফ্রী রাইডসহ তাদের টি শার্ট, সুস্বাদু খাবারের ব্যবস্থা তো করা হয়ই সাথে তাদের আনন্দের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। নিঃসন্দেহে পুরো দিনটিই তাদের আনন্দে কাটে। আর তাদের জায়গায়  দশটি জেলায় পথে নামে সাত হাজার জাগোর ভলান্টিয়ার। তারা সেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মতই পথে পথে ফুল ও পেপার বিক্রি করে ফান্ড কালেক্ট করে যেই ফান্ড সেই সুবিধাবঞ্চিত শিশু, তাদের পরিবার এবং জাগো স্কুলের কাজেই ব্যবহার করা হবে । সারাবছরই জাগো এমন ইনোভেটিভ কিছু ইভেন্টের মাধ্যমে ফাণ্ড কালেক্ট করে থাকে।
কিন্তু ইভেন্টটা শেষ হতে না হতেই কিছু ব্লগ পোস্টের মাধ্যমে
কিছু মানুষ এমন মহৎ একটা উদ্যোগের বিরুদ্ধেও কথা বলতে শুরু করে। আর হুজুগে বাঙালির মত সঠিক তথ্য না জেনে আমাদর মতই অনেকে এসব পোস্ট শেয়ার করছে। সাধারনত সমালোচনা করা ছাড়া এসব মানুষের কোন কাজ থাকেনা। সঠিক তথ্য জানার কোন ইচ্ছাই তাদের নাই, সমালোচনা করতে পারলেই  যেন তারা পরম আনন্দ পান। আর সঠিক তথ্য জানবেনই বা কী করে, ঘরে পিসিতে বসে নেট থেকেই কিছু ছবি কালেক্ট করে এসব ফাকা বুলি উড়ানোর মাঝেই তাদের সীমাবদ্ধতা। যে বা যারা এসব লিখছে তাদের সবাই বাইরে নেমে প্রতক্ষ্যভাবে ভলান্টিয়ারদের কাজ করতে দেখেছে কিনা সেটা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যাই হোক, এই ব্লগ পোস্টটার জবাব দেয়ার জন্যই আমার এই নোটটা লেখা।
এজন্য প্রথমেই জাগোর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস দিয়ে শুরু করি, আশা করি পুরো ইতিহাস জানার পর একটু হলেও আপনাদের বোধদয় হবে। আমাদের মতই একজন তরুণের ব্যক্তিগত ইচ্ছা থেকেই জাগো ফাউন্ডেশন এর শুরু, সেই তরুণের নাম Korvi Rakshand। একজনের ব্যক্তিগত ইচ্ছা থেকে যে কত বড় কিছু হতে পারে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই জাগোই। মাত্র সাতজন ভলান্টিয়ার ও সতের জন সুবিধাবঞ্চিত শিশু নিয়ে জাগোর পথচলা শুরু। বিভিন্ন দেশী ও বিদেশী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সহায়তায় রায়েরবাজারে জাগো স্কুলের প্রথম ভবনটা গড়ে তোলা হয়, সেটা রং ও করা হয় এবং একটা পূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়। এভাবে সবার সহায়তায় শিক্ষার্থীদের ফ্রী শিক্ষা উপকরণও দেয়া হয়। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকে, অনেকেই সহয়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। এমনি করে একজন ব্যক্তি  একদিন বেশ ভালো এ্যামাউন্টের টাকা ডোনেট করে। যেহেতু স্কুল ভবনও হয়ে গেছে এবং সব শিক্ষা উপকরণেরও ব্যবস্থাও করা হয়ে গেছে তাই সেই টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিফর্মের ব্যবস্থা করা হলো। নতুন ইউনিফর্ম পেয়ে সব বাচ্চাসহ জাগো টিমের সবার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু সপ্তাহখানেক পড়ই তা অনেকটাই মলিন হয়ে যায় কারন বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নোংরা ইউনিফর্ম পরে আসতে শুরু করে। বাচ্চাদের সাথে কথা বলে জানা যায় ওরা দু বেলা ঠিকমত ভাতই খেতে পারেনা, ইউনিফর্ম পরিস্কার রাখার সাবান কোথায় পাবে? এই সমস্যার সমাধানে ভলান্টিয়ারদের সহযোগিতায়ই বাচ্চাদের ইউনিফর্ম পরিস্কার রাখার জন্য সাবানের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর থেকে ওদের নিয়মিত সাবান দেয়া হয়।
জাগোর কার্যক্রম ভালোই চলতে থাকে, এভাবে একটা বছর কেটে যায়। কিন্তু নতুন বছর শুরুর পর নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়। গত বছরের চল্লিশ জন শিক্ষার্থী থেকে কমে প্রায় বিশ জনে নেমে আসে অর্থাৎ প্রায় ৫০% শিক্ষার্থী হারিয়ে যায়। ওদের জন্য এতকিছু করার পরও এত কম বাচ্চাদের দেখে স্বাভাবিকভাবেই জাগো টিমের মন খারাপ হয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাদের অনেককেই আর খুজে পাওয়া যায়নি। জাগো টিম অনুসন্ধান করে জানতে পারে এসব বাচ্চাদের বেশিরভাগ অভিভাবকই বাসায় কাজ করে কিংবা রিক্সা চালায়। কাজ হারালে কাজের সন্ধানে এরা শহরের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। তখন প্রতিটা এলাকায় জাগোর স্কুল খোলা সম্ভব ছিলনা তাই  বাচ্চাদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের নিয়েও জাগো টিমকে ভাবতে হলো। ভলান্টিয়ার ও ডোনেটরদের সাহায্যেই সেলাই মেশিন কিনে একটা ট্রেনিং সেন্টার চালু করা হয়, সেখানে বাচ্চাদের মায়েদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। শুরু হলো জাগোর আরেকটা নতুন প্রোজেক্ট। সেই ট্রেনিং সেন্টারটাই এখন একটা বড় ফ্যাশন হাউজে পরিণত হয়েছে যার নাম হলো "বাচ্চারা" । যেহেতু বাচ্চাদের জন্য বাচ্চাদের অভিভাবকরাই এখানে কাজ করছে তাই এর নামও দেয়া হয়েছে বাচ্চারা। এখানে তৈরি পোষাক এখন বিদেশেও রপ্তানি করা হয় ! এরপর থেকে বাচ্চারা আরো স্থায়ী হতে থাকলো।
তবুও ছোটখাটো সমস্যা দেখা দেয়। অনেকের অভিভাবক চোখে ভালো দেখতে পারেনা, এজন্য সুই সুতার কাজ করতে তাদের সমস্যা হয়। এবার জাগো টিমকে আবারো ভাবতে হলো। সেই ভাবনা থেকেই জাগো হাতে নিল আরেকটা প্রোজেক্ট। এমনই সব অভিভাবকদের নিয়ে চালু করা হলো একটি মোমবাতির কারখানা। জাগো স্কুলের বাচ্চাদের মা-বাবারাই এখানে কাজ করে। এর ফলে মোটামুটি অনেক বাচ্চাই স্কুলে স্থায়ী হতে শুরু করে, এভাবেই দিন কাটতে থাকে।
কিন্তু তারপরও অনেকে অনিয়মিত হতে থাকে। বাচ্চাদের অনেকেই প্রায়ই অসুস্থ্য হয়ে পড়তো এজন্য স্কুলে আসতে পারতোনা। ওষুধ কেনা তো দূরের কথা ওদের ডাক্তার দেখানোরও সামর্থ্য নেই। এবার এই সমস্যার সমাধানে শুরু হয় "জাগো ফার্স্ট এইড সেন্টার" । এখানে নিয়মিত একজন ডাক্তার বসেন যিনি জাগোর সকল শিক্ষার্থী ও তার পরিবারের সদস্যদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। তাছাড়া গরিবদের জন্য এখানে সকল প্রকার ওষুধ এখানে ৭% ডিসকাউন্টে বিক্রি করা হয়। পরবর্তিতে এলাকাবাসীর অনুরোধে জাগো ফার্স্ট এইড সেন্টার সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এখন শুধু জাগোর শিক্ষার্থীই নয়, এলাকার যেকোন গরিব/নিম্নবিত্ত পরিবার রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে জাগো ফার্স্ট এইড এর সব ধরনের সুবিধা ভোগ করতে পারে। তাছাড়া বাচ্চাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করত এখন সপ্তাহে একদিন ওদের পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো হয় এবং পেস্ট ও ব্রাশও বিতরণ করা হয়।
এরপর শুরু হয় জাগোর ইনোভেটিভ কার্যক্রম শুরু হয়। শুধু জাগো স্কুলের বাচ্চাদের কেন, সব পথশিশুদের জন্য একদিনের জন্য হলেও যদি কিছু করা যেত তাহলে কেমন হয় ? সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় জাগোর বিশ্ব শিশু দিবসের কার্যক্রম। UN সমর্থিত Universal Children's Day বা বিশ্ব শিশু দিবসের দিনটিতে রাস্তায় কাজ করে খেটে খাওয়া সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের ছুটি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জাগো। বিভিন্ন এলাকায় পথশিশুদের এই ব্যাপারে জানানোর পরই ওদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে কিন্তু একটু পরেই আবার ওদের মন খারাপ হয়ে যায়। কারন ওরা ছুটিতে গেলে ওদের কাজ কারা করবে  কারা এবং পরবর্তি দিন ওরা কী দিয়ে খাবে সেই চিন্তা ওদের পেয়ে বসে। খোজ নিয়ে জানা যায় প্রতিটা এলাকাতেই একজন মহাজন বা Godfather থাকে, তার Under এই এসব পথশিশু কাজ করে ঠিক Slumdog Millionaire এর মত। এখন ওদের নেয়ার জন্য সেইসব মহাজনদের ম্যানেজ করতে হলো, তাদের সাথে আলোচনায় বসতে হলো, আলোচনার পর এসব মহাজনদের টাকাও দেয়া হলো এবং সেসব পথশিশুদের দুশ্চিন্তামুক্ত করতে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো ওদের বদলে জাগোর ভলান্টিয়াররা সেই দিনটা রাস্তায় নামবে। ওদের মতই রাস্তায় ফুল বিক্রি করবে। যে টাকা আসবে সেই টাকা এসব সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্যই ব্যবহার করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঠিকঠিকই পথশিশুদের একটা দিন ছুটি দেয়া হয়, ওদের ফ্যান্টাসি কিংডমে নিয়ে যাওয়া হয়, আর তাদের পরিবর্তে জাগোর ভলান্টিয়াররা পথে নামে। প্রথমবার ১০০০ জন পথশিশুর বদলে ১০০০ জন ভলান্টিয়ার পথে নামে। দুই বছর সফলভাবে আয়োজন করার পর এবছর ১০ টি জেলার ৩০০০ পথশিশুকে ওয়ান্ডারল্যান্ড নিয়ে যাওয়া হয় আর এই ৩০০০ জন পথশিশুর পরিবর্তে আমরা মাঠে নেমেছি ৭০০০ ভলান্টিয়ার ! ৭ জন ভলান্টিয়ার দিয়ে শুরু হবার পর সেটা এখন ৭০০০ এ গিয়ে দাড়িয়েছে, জাগো কতটা সফল সেটা বোঝানোর জন্য এতটুকুই যথেস্ট। আর এসব ভলান্টিয়ার স্বেচ্ছায়ই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, কেউ আমাদের জোর করেনি। আর শেষবারের মত আবারো বলছি আমরা ভলান্টিয়াররা যে টাকা কালেক্ট করি সেটা এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্যই ব্যবহার করা হয়।
আর জাগোর আরেকটা প্রজেক্ট আছে। যে কেউ চাইলে জাগোর একজন শিক্ষার্থীকে Sponsor করতে পারে। মাসে মাত্র ১০০০ টাকা দিতে হবে। সেই টাকা দিয়ে ওই বাচ্চাটার এক মাসে যা কিছু লাগে, শিক্ষা উপকরণ, চাল, বই, খাতা, কলম সবকিছু দেয়া হয়। বাচ্চাটি যতটা ক্লাসে উপস্থিত থাকবে প্রতিটা ক্লাসেই জন্যই তাকে আধা কেজি করে চাল দেয়া হয়।তাছাড়া শীতকালে সব বাচ্চাদেরই সোয়েটার ও কম্বল দেয়া হয়।
পথশিশুদের জন্য যারা এত কাজ করছে, এত সব অভিনব আইডিয়া বের করছে, এত কষ্ট করছে, তাদের নিয়ে এখনো কী আপনাদের সন্দেহ হচ্ছে ? এখনো কী আপনাদের মনে হয় জাগো ফাউন্ডেশন শুধু "শো-অফ"  করা ছাড়া কিছুইনা ? আপনাদের জেনে রাখা ভাল জাগো ও জাগোর ভলান্টিয়াররা শুধু একটা দিনের জন্যই কাজ করেনা, সারা বছরই করে। আর আরেকটা কথা পরিস্কারভাবে বলে রাখা ভাল পুরো জাগো ও জাগো স্কুলের কার্যক্রমই চলছে আমাদের মত ভলান্টিয়ার এবং ডোনেটরদে সহায়তার মাধ্যমেই। সবার সহযোগিতায় এখন জাগোর তিনটি স্কুল গড়ে তোলা হয়েছে, এমনকি বাচ্চাদের জন্য কম্পিউটার ল্যাবেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতি শনিবার বাচ্চাদের জন্য খেলাধুলারও ব্যবস্থা করা হয়, এজন্য স্কুলে Sports Teacher ও রয়েছে। হয়তো এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝ থেকেই বেরিয়ে আসবে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ক্রিকেটার কিংবা ফুটবলার !
এভাবেই চলছে জাগোর পথচলা। তবে সবকিছুরই ভাল খারাপ দুই দিকই আছে কিন্তু সেটা কোন ব্যাপার না। আসল ব্যাপার হলো লোক দেখানোর পরিবর্তে যদি মন থেকে পথ শিশুদের সাহায্যার্থে  কেউ পাচটা মিনিটও কাজ করে তাহলেই সেটা ভাল। আর সেখানে তো জাগো সারাবছরই ওদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে ! আর পুরো ইতিহাস জানানোর পরও কী আপনাদের মনে হয় আমরা মন থেকে কাজ করছিনা ? যদি কারো মনে হয় তাহলে আপনি আমাদের এসে শিখিয়ে দিন কীভাবে মন থেকে কাজ করতে হয়। জাগোর ইতিহাস তো জানানো হলো এবার সেই ব্লগ পোস্টের প্রতিটা পয়েন্টের জবাব দিচ্ছি। পোস্টটার লেখক যেভাবে পয়েন্ট করে দিয়েছেন আমিও সেভাবেই দিচ্ছি:
পয়েন্টগুলোর উত্তর দেয়ার আগে জানিয়ে দেই আপনার শিরোনামেই ভুল ! আপনি লিখেছেন "ইংলিশ মিডিয়াম ছেলেমেয়েদের অ্যাডভেনচার", একটু ভালোমত খোজ নিয়ে দেখেন, বাংলা মিডিয়ামে পরা ছেলেমেয়েদের সংখ্যা কোন অংশে কম ছিলনা ! যাই হোক এবার শুরু করা যাক।
১) সেই ব্লগপোস্টের লেখক বলেছেন. "আপনি এদের কখনও যাত্রাবাড়ী, মৌচাক, বাড্ডা, সায়দাবাদের মত খারাপ এরিয়াতে দেখবেন না। এদের সবসময় গুলশান-উত্তরা-বনানী-ধানমন্ডির সিগানালে দেখা যায়।"
জবাব: এই পয়েন্টের জবাব হৃদয় ভাইয়াই দিয়ে দিয়েছে: ফুল বিক্রি অনেকটাই সিম্বলিক অর্থে এটা কেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে হবে কে জানে! কেউ কেউ হয়তো ১টা ফুল ৫ টাকায় না কিনে ৫০০ টাকায় কিনবে এর উদ্দেশ্য জেনে। আর  এজন্যেই ভলান্টিয়ারদের সংখ্যা গুলশান বনানীতে বেশি। এখন মৌচাকের সামনে দাঁড়ায় থাকলে কে দিবে একটা ফুলের জন্যে ৫০০ টাকা?
আর আপনাদের জানিয়ে রাখা ভাল গতবার একটা ফুল ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল এবং গাড়িতে থাকা একজন মুক্তিযোদ্ধা আমাদের নতুন জেনারেশনের মুক্তিযোদ্ধা বলে তার কাছে যত  টাকা ছিল সব দিয়ে দিয়েছিল। আর এবার তো ভলান্টিয়াররা মিরপুরের মত মধ্য ও নিম্নবিত্তদের এলাকাতেও কাজ করলাম, এখন কী বলবেন আপনি ? 

২) তিনি বলেছেস, "এরা সিগনালের পিচ্চিদের পার্কে ঘুরাতে নিয়ে যায় বিনিময়ে ওদের ফুল/পপকর্নগুলা নিজেরা বিক্রি করে। ওদের দাবী এভাবে নাকি সমাজকে "জাগানো" যায় এসব শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে। আমার মনে হয় না রাস্তায় এভাবে হলুদ গেন্জি পড়ে ফুল বেচলে আসলেই এই শিশুগুলার কষ্ট বুঝা যাবে!"
জবাব: আপনার এই পয়েন্টের উত্তর উপরে জাগোর ইতিহাসের মধ্যেই দেয়া হয়ে গেছে। তবুও আবারো দিচ্ছি। ফুল বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায় সেটা সেসব পথশিশুদের জন্যই ব্যয় করা হয়, আমরা শুধু শুধু ফুল বেচতে পথে নামিনা, ওদের জন্যই নামি। আর এভাবে একটা দিন ওদের মত পথে নেমে সকাল থেকে সন্ধ্যা কাজ করলে যে আসলেই  ওদের কষ্টটা বোঝা যায় সেটা শুধু যারা করেছে তারাই বলতে পারবে। মনে তো হয়না আপনি করেছেন, আপনাদের মত মানুষের করার কথাও না। আপনাদের কাজই তো হলো শুধু বাসায় বসে ল্যাপটপ সামনে নিয়ে বড় বড় কথার বুলি আওড়ানো। পথে নেমে রোদে পুরে সারাদিন কাজ করার সামর্থ্যও আছে কিনা সন্দেহ। আর ফুল বিক্রি করে ফান্ড কালেক্ট করাটাকে যে তাচ্ছিল্য করলেন তাহলে বলুন তো আপনি ব্লগ লিখে "অমুক" কে বাঁচানোর জন্যে ফান্ড কালেক্ট করতে পারলে পথশিশুদের জন্য ফুল বিক্রি করে কেন করা যাবে না? 

৩) তিনি বলেছেন, "ফেসবুকে একজনের কমেন্ট: এক ভলেনটিয়ার আইসা বলে, ভাইয়া ডোনেট করছেন? পোলা কয়, এই ডোনেশনের টাকা কই যায়? ভলেন্টিয়ার কয়: তাতো জানি না!"
জবাব: আমার সন্দেহ হচ্ছে এই পয়েন্টটা লেখার সময় লেখক সৎ ছিল কিনা ! হয় উনি এটা বানিয়ে লিখেছেন নাহয় যে ভলান্টিয়ারের কথা বলা হয়েছে সে জাগোর ওয়ার্কশপে আসেনি। কারন আমাদের কাজ করার আগে একটা ওয়ার্কশপে পুরো জাগো সম্পর্কে ধারনা দিয়ে দেয়া হয়েছে, ওদের কার্যক্রম সম্পর্কে সবকিছু বলা হয়েছে। এই টাকা কই যায় সেই সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। উন্মুক্ত প্রশ্নের-উত্তর পর্বও হয়েছে। এগুলো আমাদের আগেই জানানো হয়েছে যাতে পথে পথে ডোনেশন কালেক্ট করার সময় কেউ প্রশ্ন করলে আমরা সেগুলোর উত্তর দিতে পারি। তবুও সেই ভলান্টিয়ার যদি এমন বলে থাকে তাহলে সত্যিই দুঃখজনক। আর এই টাকা কই যায় সেই সম্পর্কে পুরো বিস্তারিত তো জাগোর ইতিহাসের মাঝেই লিখে দিয়েছি। তবুও আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে সরসরি জাগোর ওয়েবসাইটের এই লিংক এ যেয়ে করতে পারেন: http://jaago.com.bd/who-we-are/frequently-asked-questions.html
এরপরও আপনার কিছু বলার আছে ? 

৪)  তিনি বলেছেন, "আমি ধানমন্ডির মেট্রো প্লাজার সামনে একটা মিনি ট্রাক দেখলাম। ট্রাকের অর্ধেক প্যাকেট করা খাবার আর বাকি অর্ধেকের মত কোল্ড ড্রিংকস দিয়া ভর্তি। ট্রাকে ২ জন হলুদ গেন্জি দাড়ায় আছে। মনে হয় এগুলা ওদের দুপুরের লান্চ। এরকম লান্চ গাড়ি ঢাকায় আরো কয়েকটা থাকার কথা! আমি ভাবতেছিলাম, এত গুলা টাকায় হয়তো আরো ৫০ জন বাচ্চার একমাস চলে যেতো!!"
জবাব: আপনার এই পয়েন্টটা ছিল সবচেয়ে বেশি হাস্যকর আর অযৌক্তিক  পয়েন্ট বাড়ানোর জন্য আর কিছু পাইলেন না মিয়া ! এটার জবাবও হৃদয় ভাইয়া খুব সুন্দরমত দিয়ে দিয়েছেন: আপনারা কি জানেন প্রতিটা ভলান্টিয়ারকে একটা ফি দিয়ে রেজিস্ট্রেশান করতে হয় তাদের এই খাবার আর টি-শার্ট ও আনুসাঙ্গিক খরচের জন্যে? অর্থাৎ তারা নিজের পয়সাতেই খাচ্ছে এবং রাস্তায় ঘুরে ফুল না বেচলেও তারা না খেয়ে থাকতো না, এবং এই টাকাটাও সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুরা পেত না। সঠিক তথ্য না জেনে এত কথা বলেন কেন ভাই ? নিজেকে বোকা প্রমাণ করার চেয়ে চুপ থাকাই কী ভালো না ? আর আমরা যতটুকু খাবার পেয়েছি তার থেকে অনেক গুণ বেশি খাবার এবং সুস্বাদু খাবার ওইদিন ওয়ান্ডারল্যান্ডে যাওয়া ৩০০০ সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের দেয়া হয়। তারপরও কী আপনি এই ব্যাপারে কিছু বলবেন ?

৫) তিনি বলেছেন, "প্রতি ৭/৮ জন গ্রুপের সাথে একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা ম্যান থাকে। যেই এক মেয়ে/ছেলে ফুল বেচতে যায় সেটা ক্যামেরা বন্দী করে রাখা হয়!!"
জবাব: আজব ব্যাপার তো ! আমরা যা করি তাতেই কী আপনাদের সমস্যা? ছবি তুললেও আপনাদের সমস্যা ?? এদিন বিভিন্ন সাংবাদিকরা এসে ছবি তুলেছে। আমরা ভলান্টিয়াররা নিজেরাও ছবি তুলেছি স্মৃতি রেখে দেয়ার জন্য। তাই বলে প্রতিটা গাড়ি কিংবা মানুষের কাছে যাওয়া মাত্রই ছবি তোলা হয়নি। আপনি এমনভাবে বললেন যেন প্রতিটা মূহুর্তের ছবি তোলা হয়েছে ! কমন সেন্স  এর অধিকারী যে কেউ বুঝতে পারবে যে এই লাইনটা বানিয়ে লেখা। আমরা সেখানে কাজ করতে গিয়েছি, ছবি তুলতে না। শুধু মাত্র কিছু মূহুর্তেরই ছবি তোলা হয়েছে আর আমরা ভলান্টিয়াররা নিজেরাই তুলেছি দিনটা স্মরণীয় করে রাখতে। আরেকটা তথ্য আমাকে জানিয়ে দেই যে ফটোগ্রাফী গ্রুপ টিটিএল এই ইভেন্টে জাগো'র সাথে কাজ করেছে। আর তারা ভলান্টিয়ার হিসেবেই কাজ করেছে নিজ থেকেই। আরো প্রশ্ন আছে আপনার ?

৬) তিনি বলেছেন, "আরেকজনের ফেসবুক স্ট্যাটাস: Some girls in yellow came up to me and said they were selling flowers "for poverty" (in shaky Banglish). I told them that I don't support poverty! Learn Bangla, you English medium douche bags!"
জবাব: আবারো বাংলা মিডিয়াম ও ইংলিশ মিডিয়াম নিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি করার একটা চেষ্টা। এই পয়েন্টে যে ঘটনাটা বলা হয়েছে সেটা আসলেই ঘটেছে কিনা জানিনা তবুও ধরে নিলাম মেয়েগুলো বাংলা ঠিকমত জানতোনা। তাই বলে কী আপনারা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য নেয়া এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে কথা বলবেন ? আর ওরা বাংলা ঠিকমত জানেনা মানলাম, কিন্তু ওরা তো পথশিশুদের ভালোর জন্যই মাঠে নেমেছিল। একটু ভাল ব্যবহার কী করা যেত না এজন্য ? ভলান্টিয়ার বাংলা জানেনা দেখে সুবিধাবঞ্চিতদের সাহায্য করবোনা ! কী সুন্দর লজিক ! হাসি পাইলো !  আগে নিজেদের স্বভাব বদলান, ভালো ব্যবহার করতে শিখেন, আর ইংলিশ মিডিয়াম পোলাপানদের যদি আপনার অতি উচু মাত্রার আধুনিক বলে মনে হয় তাইলে আপনার নিজের স্ট্যান্ডার্ডেই প্রব্লেম আছে। আগে নিজের স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করেন। হৃদয় ভাইয়ার আরেকটা কথাও এখানে তুলে ধরলাম: ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া বা "পাঙ্কু" হলে ভলান্টিয়ারী করা যেন পাপ হয়ে যায় ! আনন্দ খুঁজে নিয়ে একটা কাজ করাটাও দোষের?!
(উল্লেখ্য আমি নিজেও ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র না, আমি বাংলা মিডিয়ামেই পড়ি।)

৭) তিনি বলেছেন, "ওদের নেক্সট প্ল্যান নাকি শহরগুলাকে হলুদ রং করা। হয়তো এভাবে পোভার্টী ড়িমুভ ক্ষরা যায়। কে জানে?!! আমি ভাই বাংলা মিডিয়ামের মূর্খ! এতকিছু বুঝি না!"
জবাব: পুরাই লুল ! আপনার লেখা কথাবার্তা দেখে তো মনে হইতেসে নিজের সম্পর্কে খুব ভালই ধারনা আছে (বাংলা মিডিয়ামের. . . . .) আপনার। যাই হোক, যেহেতু আপনি কিছুই বুঝেন না সেহেতু আপনাকে বাচ্চাদের মত সবই বুঝায়ে দেয়া লাগবে। এইটা কোন নেক্সট প্ল্যান না, এইটা একটা প্রতিকী বাক্য। হলুদ রং করা বলতে এখানে জাগো কে পুরো দেশে ছড়িয়ে দেয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করা হয়েছে। ভলান্টিয়াররা দেশের সবগুলো জেলায় ছড়িয়ে যাবে, একদিন সবগুলো জেলায় জাগোর স্কুল গড়ে তোলা হবে, সেখানে সব সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা বিনামূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সবধরনের সেবা পাবে, সেই কথা দিয়ে এমন স্বপ্নের কথাই বুঝানো হয়েছে।

৮) তিনি বলেছেন, "বেশিরভাগ মানুষ বলে এরা নাকি টাকা মারে। আমার এক ফ্রেন্ড এদের সাথে কাজ করছে কয়েক মাস। সে আইসা বলে, তোরা যেই টাকা দেস, সেটার একটা বিরাট অংশ আমাগো বোতলের পিছে যায়গা! আর বাকি কিছু অংশ (এটার পরিমানও কম না!!) দিয়া একটা ধুমধাম করে অনুষ্ঠান করি বাচ্চাদের নিয়া।"
জবাব: হাহাহা! হাসি পাইলো ! ভাই আপনার ভাষাতেই তো ভলান্টিয়াররা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া বড়লোকদের পোলাপান। যদি এমনি হয়ে থাকে তাইলে তারা কোন দুঃখে সেই টাকা মারতে যাবে ?? তাদের তো টাকার অভাব নাই, কেন এই সুবিধাবঞ্চিতদের টাকা মারতে যাবে ? কেনই বা টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে কষ্ট করে মাঠে নামবে ? সারাদিন কাজ করলাম কিন্তু একটা ভলান্টিয়ারকেও দেখলামনা টাকা মারতে। উল্টো অনেক ভলান্টিয়ার নিজের মানিব্যাগের টাকাটাও ফুল দিয়ে পাওয়া টাকার সাথে মিলিয়ে দিয়ে দিয়েছে। ৩ নম্বর পয়েন্টে বলেছিলাম আপনি লেখার সময় সৎ ছিলেন কিনা আমার সন্দেহ আছে। এবার পুরো নিশ্চিৎ হলাম। তবুও যদি সে এমনটা বলে থাকে তাহলে আপনার যে বন্ধু একথা বলেছে জাগো কর্তৃপক্ষের কাছে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করুন। একজন চোরকে আড়ালে রেখে আপনি কেন বাকিদের চুরির দায় দিবেন? আর জেনে শুনে কেনই বা একজন চোরের সাথে বন্ধুত্ব বজায় রাখেন ?

৯) আর সবশেষে তিনি লিখেছেন, "তবে ছেলেবুড়ো সবাই একমতে স্বীকার করবে জাগোর মেয়ে ভলেন্টিয়ার গুলা কিরকম জোস!! টিশার্ট আর টাইট জিন্স পড়া এসব ফর্সা চামড়ার মেয়াগুলা দেখলে মাথা নষ্ট হতে বাধ্য! কে জানে, হয়তো ফর্সা রং বেশি করে চান্দা তুলতে সহায়ক ;)"
জবাব: এই পয়েন্টটা পড়লেই বুঝা যায় ওই পোস্টের লেখক কী পরিমাণ নিচু মানসিকতার মানুষ, অর্থাৎ "থার্ড ক্লাস" বলতে যা বুঝায় আর কী ! যাই হোক, তার চরিত্রের দিকে আর না যাই। এর জবাব দিতে Pavel Mohitul Alam ভাইয়ার স্ট্যাটাসটা দিয়েই আমি আমার নোটটা শেষ করছি:
JAAGO'র আজকের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্লগ-ফেসবুকে যারা লেখালেখি করেতেসে, স্পষ্টতই তাদের গা জ্বলার মূল কারণ হইলো টি-শার্ট-জিন্স পরা মেয়েগুলো। আজকের কার্যক্রমে যদি মেয়েরা অংশ না নিত, শুধু ছেলেরা ফুল বিক্রি করতো, তাহলে অনেকেই এত কথা বলতো না। যেকোন ইস্যুতেই মেয়েদের 'আক্রমণ' করে পৈশাচিক আনন্দ পাওয়ার মানসিকতা তো আমাদের বহুদিনের।
ভালো কাজ, সেটা ইংলিশ বা বাংলা, যে মিডিয়ামের ছেলে-মেয়েরাই করুক না কেন, সবার উচিৎ সহযোগিতা করা। না পারলে অন্তত প্রশংসা করা। তা-ও না করতে পারলে চুপ থাকা। 

হ্যা, আমি আবারো বলছি, ভালো কাজ, সেটা ইংলিশ বা বাংলা, যে মিডিয়ামের ছেলে-মেয়েরাই করুক না কেন, সবার উচিৎ সহযোগিতা করা। না পারলে অন্তত প্রশংসা করুন। তা-ও যদি না পারেন তাহলে চুপ থাকুন। :)


আর জাগো আসলেই সুবিধাবঞ্চিতদের কাজে আসছে কি আসছেনা সেটা জাগোর পুরো ইতিহাসেই উল্লেখ করে দিয়েছি। আশা করি আর কিছু বলতে হবেনা। আর প্রশ্ন থাকলে জাগোর ওয়েবসাইট তো আছেই ! আমরা সবাই স্কুল-কলেজ-ভার্সিটির শিক্ষার্থী, আপনাদের আজাইরা প্যাচাল আর সমালোচনার জবাব দেয়ার মত অঢেল সময় আমাদের নাই। শুধুমাত্র একবার দিলাম কারন বিষয়টা লিমিট ক্রস করতেসিলো আর এটা থামানো জাগোর সকল ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব। এই নোটে কিংবা আবার অন্য কোন পোস্টের রিপ্লাই দেয়া আর আমার পক্ষে সম্ভব না কারন সামনেই এক্সাম। এরপর কোন প্রশ্ন থাকলে সরাসরি ওয়েবসাইটে যেয়ে প্রশ্ন করে উত্তর নিয়ে সঠিক তথ্য জেনে তারপর ব্লগ লিখবেন, তর্ক করার ইচ্ছা থাকলেও সেখানেই করবেন।। আর আরেকটা কথা, হয়তো এমন কিছু ভলান্টিয়ারও ছিল যারা অন্য উদ্দেশ্যে এসেছিল, জাগোর টি শার্ট গায়ে স্মোকিং করেছে কিংবা অন্য খারাপ কাজ করেছে বা কারো ড্রেস আপ দৃষ্টিকটু ছিল কিন্তু তাদের সংখ্যা খুবই কম। হাতে গোনা কয়েকজনের জন্য তো পুরো জাগো টিমকে আপনারা দোষ দিতে পারেননা, আর এজন্য সব ভলান্টিয়ারও খারাপ হয়ে যায়না। মডারেটররাও এ ব্যাপারে আমাদের বারবার সতর্ক করে দিয়েছিল যাতে কেউ স্মোক না করে বা খারাপ কাজ না করে, আর জাগোর টি শার্ট গায়ে তো কখনোই না ! তবুও কিছু ভলান্টিয়ার সেটা শোনেনি। তাদের সম্পর্কে আর কিছু বলার নেই। আবারো বলছি, কয়েকজনের জন্য সবাই খারাপ হয়ে যায় না।

জাগোর সকল ভলান্টিয়ারকে এবং জাগো কে যারা সমর্থন করেন তাদের সবাইকে নোটটা শেয়ার করার জন্য অনুরোধ করছি। সেই ব্লগ পোস্টটা যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তেমনি এই লেখাটাও ছড়িয়ে যাক। সবাই প্রকৃত সত্যটা জানুক। আপনারা চাইলে সোর্স ও লেখকের নাম উল্লেখ করে যেকোন ব্লগে, ফেসবুক পেইজে বা ব্যক্তিগত নোটেও এই লেখাটা পাবলিশ করতে পারেন।

- Saidur Rahman Rahat  (Rahat Rahman)
Volunteer,
JAAGO & Volunteer For Bangladesh.

মূল লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/notes/rahat-rahman/%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%97%E0%A7%87%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%87%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B8-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%97-%E0%A6%8F%E0%A6%AC%E0%A6%82-%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%9C%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%AC/314542441892418
http://www.somewhereinblog.net/blog/imrubdblog/29478227
বিস্তারিত পড়ুন ... »

bdnews24.com - Home

ইরান বাংলা নিউজ

বিবিসি বাংলা

দৈনিক সংগ্রাম